বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

—আরে, সে জন্যই তো যখন মকবুল সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো এবং কথাটা আমাকে বললেন, তখন তোর কথাই মনে পরে গেল। আমার সময় হবে না বলে তোর কথাটা বললাম। তিনিও রাজি হয়ে গেলেন। তুই রাজি আছিস তো?

মোর্শেদের উত্তর—কী যে বলিস, রাজি না হয়ে যাই কোথায়।

পরদিনই মোর্শেদ ও সালাম বেড়িয়ে পড়ল মকবুল সাহেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য। টিউব স্টেশন থেকে কয়েক মিনিট পথ হাঁটলেই চোখে পড়ল ‘আলেয়া ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট’। সদর দরজা দিয়ে দুজনে ঢুকে পড়ল রেস্টুরেন্টের ভেতর। কাস্টমার ছিল না। এক কোণে একজন ভদ্রলোক কাঁচা-পাকা চুল, বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে, ঢক ঢক করে বিয়ার গিলে যাচ্ছেন। তিনিই মকবুল সাহেব। এবার পরিচয় করার পালা। সালাম মকবুল সাহেবকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মকবুল সাহেব, এ হলো আমার বন্ধু মোর্শেদ, যার কথা আপনাকে বলেছিলাম। আর মোর্শেদ, ইনি হলেন মকবুল মিয়া। সাহেবরা ডাকে মিস্টার মিয়া।

একটু রসিকতা করে সালাম বলল, সাহেবরা মকবুল সাহেবের ভাইঝিকে ডাকে ‘মিস মিয়া’। মোর্শেদ অবাক হয়ে বলে, ‘দেখুন সাহেবদের কাণ্ড! মিয়া মানেই তো পুরুষের নাম। কিন্তু বাবা বা চাচার শেষ নাম ‘মিয়া’ থাকার ফলে ভাইজির নাম ‘মিয়া’ হয়ে গেছে। এ কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

এরপর মকবুল সাহেব আসল কথায় আসলেন। তিনি বললেন, ‘মোর্শেদ সাহেব, আপনার সম্পর্কে সালাম সাহেবের কাছ থেকে সব জেনেছি। আমার ভাইয়ের তিন ছেলে-মেয়ে আছে। বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। ওদের আপনি বাংলা পড়াবেন, লেখা শেখাবেন। রেস্টুরেন্টের ওপর তলায় আপনার থাকার ব্যবস্থা। ছেলে-মেয়েরাও ওখানে লেখাপড়া করবে। আপনার খিদে পেলে নিচে এসে খেয়ে যাবেন, সবকিছুই রেডি থাকবে। তা কবে থেকে আসছেন?’

যদি বলেন, তাহলে কাল থেকেই আসতে পারি—মোর্শেদ উত্তর দিল।

—ঠিক আছে, তবে কালই চলে আসুন।

আস্তে আস্তে মোর্শেদ মকবুল সাহেব ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিল। আর মকবুল সাহেবও মোর্শেদের যত্নের দিকে সব সময়ে সজাগ দৃষ্টি রাখার চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। অবসর সময়ে দুজনেই নানা বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে।

মকবুল সাহেব বলেন, ‘জীবনে অনেক পয়সা দেখলাম, কিন্তু দুঃখ, লেখাপড়াটা হলো না। তাই শিক্ষিত লোক দেখলেই মনে হয় তাদের জীবনটা ধন্য। যেমন ধরুন, আপনার কথা। এখন আপনি ছাত্র মানুষ, বর্তমানে বিশেষ কোনো টাকা পয়সা নেই। তবে ভবিষ্যতে আপনি চেষ্টা করলে অগাধ রোজগার করতে পারবেন। আজ আমি চেষ্টা করলেও আপনার মতো ডিগ্রি নিতে পারব না। সে জন্যই আপনাদের মতো লোক দেখলে শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা জাগে।’

মোর্শেদ বলে, ‘শুধু শিক্ষিত হলেই তো আর পেট ভরে না, বউকে সামলানো যায় না। তার জন্য দরকার টাকার।’

—তা কিছুটা সত্যি। বেঁচে থাকার জন্য টাকার প্রয়োজন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেটাই জীবনের পরম পাওয়া নয়। শুধু টাকা-পয়সার মাঝে একটা শূন্যতা থেকে যায়, আর সে শূন্যতা হলো নিবিড় প্রাণের সুখ-শান্তি।

হয়তো—মোর্শেদের হালকা জবাব।

মোর্শেদ একদিন সুযোগ বুঝে মকবুল সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আপনাকে একটা প্রশ্ন করব?’

‘হ্যাঁ, স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারেন’—মকবুল সাহেব অনুমতি দিলেন।

—প্রায়ই দেখি আপনার হাতে গ্লাস ভর্তি মদ। আপনি এত মদ খান, এটা তো শরীরের জন্য ভালো নয়।

—সেটা জানি এবং বুঝি, তবুও খাই। একটা বিপর্যস্ত অতীত কিংবা একটা চলমান জীবন থেকে নিজেকে ভুলে থাকতে চাই বা চেষ্টা করি।

—আপনাকে দেখলে তো তা মনে হয় না।

—অবশ্য বাইরে থেকে তা হয়তো মনে হয় না। আমার মনের গহিনে সব সময়ে দুঃখের আগুন জ্বলে-পুড়ে আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে চলছে। যদি ইচ্ছা করেন তাহলে আমার মনের কথা, আমার অতীত জীবনের কথা আপনাকে শোনাতে পারি।

‘বলুন, শুনি’—এই বলে মকবুল সাহেবের অজানা জীবনের গল্প শোনার জন্য মোর্শেদ উদ্‌গ্রীব হয়ে রইল।

মকবুল সাহেব শুরু করলেন, ‘বাপ-মায়ের সঙ্গে খুব কম বয়সে বিলেতে এসেছিলাম। লেখাপড়ার দিকে মন ছিল না। বাবা-মা সে ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। তাই ১৬ বছর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়ি। কাঁচা বয়সে হাতে টাকা-পয়সা থাকলে যা হয়। জুয়া, মদ, ব্যভিচার আর উচ্ছৃঙ্খলতায় মেতে উঠলাম। এসবের পরিণাম সবই বুঝতাম। মনে মনে ভাবতাম, এক সময়ে একটি দেশের মেয়ে বিয়ে করে নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘটনাক্রমে এক সাদা মেয়ের প্রেমের ফাঁদে পড়ে গেলাম। আমি সত্যি মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেললাম। নাম ছিল ক্যাথেরিন। আমি তাকে ক্যাথি বলে ডাকতাম। আমি ক্যাথিকে বিয়ে করলাম। সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। আর পাঁচজনের মতো আমাদের সংসার জীবনও চলে যাচ্ছিল। ঝগড়া, মান-অভিমান, সবই হতো।

আমাদের প্রথম মেয়ে হলো, নাম রাখলাম ঝর্ণা। ওর মা ওকে ডাকত ‘জিনা’ বলে। এরপর একটা ছেলে হলো, নাম রাখলাম জনি। জিনার যখন সাত বছর তখন আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেল। কোর্টের রায়ে ক্যাথি ছেলে-মেয়েদের তদারকি করার অনুমতি পেয়ে গেল, আর আমি শূন্য সাগরে ভেসে গেলাম।’

এরপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। বিয়ারের গ্লাসে আরও কয়েকটা চুমুক দিয়ে আবার তিনি শুরু করলেন—বাচ্চাদের মধ্যে জিনা আমার সঙ্গে মাঝে মধ্যে দেখা করতে আসত। কিন্তু জনি একেবারেই আসে না। সে আমাকে বলত, আনকালচারড ব্ল্যাকম্যান, চাষা কালো লোক কিছুতেই আমার বাবা হতে পারে না। ছেলের কথা শুনে রাগে থর থর করে গা কাঁপত। আমার ছেলে আমাকেই বলে কিনা চাষা-কালো। জুতাপেটা করতে ইচ্ছা হতো। কিন্তু মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো কিছুই করার ছিল না। মেয়েটার জন্য স্বভাবতই আমার অফুরন্ত মায়া ছিল। ভাবতাম ওকে একটা ভদ্র, শিক্ষিত বাঙালি ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেব। আমার ভাবা ওই পর্যন্তই। একদিন জিনা সঙ্গে করে এক সাদা ছেলেকে নিয়ে এসে বলল, ড্যাডি, এ হলো নিকি, আমার হাসবেন্ড। আজ সকালেই আমরা রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করেছি। জিনার কথা শেষ হলে নিকিকে জিজ্ঞেস করলাম, তা, নিকি তুমি করো কী?

নিকির জবাব এল—লোকাল কাউন্সিলের হয়ে ‘ট্রাস ব্যাগ’ কালেক্ট করতাম স্থানীয় বাসিন্দাদের বাসা থেকে। এখন চাকরি নেই।

একদিন শুনলাম, ক্যাথি আবার বিয়ে করেছে। আমার ছেলে জনির যখন নয় বছর ছিল, তখন ওকে শেষ দেখা দেখেছি। এ ছাড়া ওকে আর দেখার ইচ্ছা কখনো জাগে না। আগেই বলেছি মেয়েটার জন্য সব সময় মায়া হয়। এক সময় জিনার কোলে এক ফুটফুটে ছেলের জন্ম হলো। আমার নাতি। নিজেকে গ্র্যান্ডফাদার ভাবার সুযোগ পেয়ে গর্ববোধ করলাম। হাজার হলেও আমারই তো বংশধর। পরে কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, সত্যিই কি বাচ্চাটি আমার বংশধর? মনে কোনো সদুত্তর পাইনি।

কিছুক্ষণ আবার নীরব থেকে হতাশার সুরে বললেন, একদিন জিনা আমার রেস্টুরেন্টে এসে হাজির। ওর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ভাবলাম সবই আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। তা না হলে আমার জীবনে এত দুঃখ হবে কেন? জিনা এখন পাগলের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। লোকদের কাছ থেকে হাত পেতে পয়সা চায়। পাড়ার বখাটে ছেলেদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মদ খায়।

এ কারণেই মোর্শেদ সাহেব, মদ খেয়ে জীবনের দুঃখ কষ্টটাকে ভুলতে চাই। খেলে মনে হয় কিছুটা বুঝি শান্তি পেলাম। আসল কথাটা কি মোর্শেদ সাহেব, জীবনের এই যে ঘটনাগুলো ঘটে চলছে এগুলো হলো, নিজের ভুলের মাশুল। এখন খুব দেরি হয়ে গেছে। সংশোধন করার আর কোনো সুযোগ নেই।

এসব বলে মকবুল সাহেব খোলা আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন। মোর্শেদ লক্ষ্য করল, মকবুল সাহেবের চোখ ছল ছল করছে। সেই সঙ্গে মকবুল সাহেবের দীর্ঘ নিশ্বাসের তপ্ত হাওয়া যেন মোর্শেদকে ছুঁয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেল ক্ষণিকের জন্য।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন