default-image

যখন জেএফকে পৌঁছালাম, তখন পৌনে ১০টা। নিউইয়র্কের সন্ধ্যারাত। প্লেন ছাড়বে ১০টা ৪০ মিনিটে। টার্কিশ এয়ারের কাউন্টারে বোর্ডিংয়ের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। সবার মুখেই মাস্ক। দাঁড়িয়েছেনও সবাই নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে, হলুদ রঙে মার্কিং করা ছয় ফুট শারীরিক দূরত্ব সীমায়। ব্যাপারটা দেখভাল করছেন ওয়াকিটকি হাতে দুজন সিকিউরিটি অ্যান্ড সেফটি গার্ড।

টার্কিশ এয়ারলাইনসের কাউন্টার পড়েছে এক নম্বর টার্মিনালে। টার্মিনাল ভবনে টার্কিশ কাউন্টারের কাছে পিঠে অন্য এয়ারলাইনসের যাত্রী সমাগম বা জনচলাচল চোখে পড়ল না। এয়ার ফ্রান্স, লুফথানসা, কেএলএম, কোরিয়ান এয়ারলাইনসের বিমানযাত্রীদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় এখানেই। অথচ ভবনজুড়ে অস্বস্তিকর নীরবতা। বিমান চলাচল যে এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি, তাই নির্দেশ করছে আশপাশের অস্বাভাবিকতা।

টার্মিনালে আসার পথে বিমানবন্দর চত্বরে খুব একটা গাড়ি চলাচলও চোখে পড়েনি। অথচ আমেরিকা, তথা পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর এটি। স্বাভাবিক সময়ে প্রতি ছয় মিনিটে একটি উড়োজাহাজের ওঠানামা হয় এই জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে।

জোসেফ শুকনো গলায় বলল, ‘ভাইয়া, করোনা কেমন থমকে দিয়েছে সবকিছু খেয়াল করেছেন!’ জোসেফ আমার কনিষ্ঠ সহোদর জাহেদীনের বন্ধু। আমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে এসেছে সি-অফ করতে। নিউইয়র্কে আমাদের জন্ম-জেলার যে কয়েকজন লোকের সঙ্গে ওঠাবসার সুযোগ হয়েছে, সবাই যার যার সাধ্য ও সময় অনুযায়ী ভীষণ আন্তরিকতা দেখিয়েছে। তবু সুনামগঞ্জ জনকল্যাণ সমিতি, ইউএসএর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মারুফ চৌধুরী ও যুগ্ম সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী ব্যতিক্রম বিশেষ। এই ব্যতিব্যস্ত বিশ্বনগরে নবাগত অভিবাসীদের ধাতস্থকালীন কঠিন সময়ে একডাকে পাওয়া যায় বলে নিজ জেলার স্বজনদের কাছে তাঁরা ‘হ্যালো, মারুফ ভাই’, ‘হ্যালো, জোসেফ’ নামে পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

বোর্ডিং পাস ও লাগেজ ট্যাগ নেওয়ার অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইনে আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত বোধ করছি। শেষতক তিন নম্বর কাউন্টারের সামনে এসে আটকা পড়লাম। সামনের শ্বেতাঙ্গ ভদ্রমহিলার লাগেজ খুলে ওজন কমাতে হচ্ছে। ব্যাগ খুলে জিনিসপাতি বের করার বহর দেখে মনে হলো ২৩ কেজির বাড়তি মালপত্রের ব্যাপারে অথোরিটি এ যাত্রা কড়া। আমার দুটি ব্যাগই ওজনে ২৫ কেজির কিছু বেশি। খানিকটা উদ্বিগ্ন বোধ করছি। ডান-বামের কাউন্টারগুলোতে থাকা অফিসারদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছি, কে বেশি উদার হতে পারেন!

এক নম্বর কাউন্টারের ডিউটি অফিসার হাত ইশারায় তাঁর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। ভদ্রলোককে দেখে মনে হচ্ছে অ্যারাবিয়ান। বাড়িয়ে দেওয়া পাসপোর্টটি তিনি হাতে নিয়ে পরিষ্কার বাংলায় কুশলাদি জিজ্ঞেস করে যারপরনাই চমকে দিলেন। তারপর যা হওয়ার তাই হলো, সুযোগ থাকলে বাঙালিরা একে অন্যের জন্য যা করে, তিনিও তাই করলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

বিমানবন্দরে শারীরিক দূরত্বের সতর্কতা, সাবধান বাণী, ছয় ফুট পরপর ইয়েলো মার্কিং করা ফুটপ্রিন্টে শারীরিক দূরত্ব রক্ষার তাগিদ ইত্যাদি মেনে উড়োজাহাজে চড়লাম এবং বিশাল ধাক্কা খেলাম। এ যেন ‘সকলই গরল ভেল’! উপচে পড়া যাত্রীতে দমবন্ধ অবস্থা! ‘ছয় ইঞ্চি’ শারীরিক দূরত্বে বসে আছেন সবাই! স্বাভাবিক অবস্থার মতো প্রতিটি আসনই পরিপূর্ণ যাত্রীতে। তবে মুখে যথারীতি মাস্ক আছে সবার। ছয় ফুটের বদলে, ছয় ইঞ্চি শারীরিক দূরত্বে গাদাগাদি করে প্রায় পৌনে ১০ ঘণ্টার যাত্রা শুরু হলো।

আমার সিট পড়েছে উড়োজাহাজের তিন আসনবিশিষ্ট মাঝ সারির ঠিক মধ্যবর্তী আসনে। বেকায়দা অবস্থা। তার মধ্যে বাম পাশের লালমুখো যাত্রীটি কতক্ষণ পরপরই খুকখুক করছেন। অবশ্য ডান পাশের আসনে বসা মঙ্গোলয়েড মেয়েটি অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ যাত্রাপথে বাম আসনের শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোক অনেকবার রেস্ট রুমে গেলেন, এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করলেন। একবার বিমানবালাকে বেশ ধমকেও দিলেন। ভদ্রলোককে অস্থির ও বদরাগী মনে হলো। মোবাইলের গুগল ডকে ভ্রমণ কথা লিখতে লিখতে ভাবছিলাম, করোনা যে বেশুমার মানুষের শারীরিক মৃত্যু ঘটিয়েছে, তা শুধু নয়, বোধ হয় তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে মানুষের মনোজগতের। আশপাশের অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে অবশেষে ইস্তাম্বুলে পৌঁছালাম সহি-সালামতে। হাতঘড়িতে বেলা সাড়ে ৩টা তখন।

এ যাত্রায় আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, যাত্রাপথে এবার আর গতবারের মতো তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খাবার সরবরাহ করা হলো না। বরং সাপ্লাই ছিল সাবওয়ে, ম্যাকডোনাল্ড জাতীয় ফাস্ট ফুডের। খাবারে এ ধরনের পরিবর্তনের হেতু করোনাকাল কিনা, কে জানে!

ইস্তাম্বুলে আগেও একবার যাত্রাবিরতি করেছি; ২০১৮ সালে। তবে এবারের ইস্তাম্বুলকে মনে হলো অনেক বেশি কারুকার্যখচিত, উজ্জ্বল। ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি ছিল পৌনে চার ঘণ্টার মতো। যতটা সম্ভব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। হালাল খাবারের সিম্বল সাঁটানো ফুড স্টোর থেকে চিকেন প্যাটিস জাতীয় এক ধরনের খাবারও খেলাম। শুধু খাবার দোকান নয়, বিমানবন্দরটির যেদিকেই হেঁটেছি খেয়াল করেছি প্রতিটি দোকানেরই প্রবেশমুখে দৃশ্যমানভাবে স্থাপিত রয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কৌটা। মাস্ক ছাড়া ঢোকার ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞার নোটিশও টানানো আছে স্টোর ডোরে। অবশ্য ট্রানজিটের জন্য অপেক্ষা প্রস্তুতিরত যাত্রীদের মধ্যে কাউকেই মাস্ক ছাড়া চোখে পড়ল না। বুঝলাম বিশ্বব্যাপী লাখে লাখে মৃত্যু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে না পারলেও যথেষ্ট ভীত, আতঙ্কিত, সতর্ক করেছে সাধারণ মানুষকে।

ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের রেস্ট রুমগুলোর ক্লিনিং পারসনদের দায়িত্বশীলতার তারিফ না করলে নয়। সবকিছু এত পরিচ্ছন্ন, পরিষ্কার! বিমানবন্দরের এদিকে-ওদিকে ইতস্তত ঘোরাঘুরির সময় চার/পাঁচজন বাঙালি ভাইয়ের সঙ্গেও কথা হলো। তাঁদের কেউ থাকেন ইতালি, কানাডা, একজন খোদ তুরস্কে। ইতালিগামী বাঙালি ভাইটি জানালেন, বিমানবন্দরের দৃষ্টিনন্দন, সৌন্দর্যবর্ধক কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে এই করোনাকালে স্থবিরতার সময়ে। তুরস্কের নবজাগৃতিতে ভূমিকা রাখার প্রসঙ্গ তুলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রশংসাও করলেন তিনি।

ইস্তাম্বুল থেকে ঢাকামুখী ফ্লাইট ছাড়তে খানিকটা বিলম্ব হলো। শুনেছি এই করোনাকালে ফ্লাইট শিডিউল রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো। ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, রিশিডিউলিং হচ্ছে প্রায়ই। অবশ্য আমাদের তেমন কিছুতে পড়তে হলো না। বিমান টেকঅফ করার কথা ছিল সাড়ে ৬টার দিকে, টেকঅফ করল ৭টার পর, অর্থাৎ আধঘণ্টা এদিক-ওদিক।

বিজ্ঞাপন

স্পিকারে ঢাকাগামী ফ্লাইটে চড়ার অ্যানাউন্সমেন্ট শুনে যথারীতি লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সামনে চেক ডেস্ক। বোর্ডিং কার্ড এগিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কার্ডে সিল মারার আগে কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ রেখে ডিউটি অফিসার কলম দিয়ে কী যেন কারেকশন করলেন। তারপর কার্ডের একাংশ ছিঁড়ে অন্য অংশ ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, নতুন আসন ফোর-ডি। তার মানে বিজনেস ক্লাস। নিউইয়র্ক-ইস্তাম্বুল যাত্রাপথে ইকোনমির তিন আসনবিশিষ্ট মাঝ সারির মধ্যবর্তী সিটের পৌনে ১০ ঘণ্টার হাঁটু মুড়ে বসা সময়কে স্মরণ করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করলাম।

বিজনেস ক্লাস একদমই ফাঁকা। শিকে ছেঁড়া আমাকে নিয়ে সাকল্য যাত্রী সাত। সুপ্রশস্ত আসনে পা ছড়িয়ে শুয়ে, বসে, ঘুমিয়ে কাটল সাত ঘণ্টার ইস্তাম্বুল-ঢাকা ৩ হাজার ৭০১ মাইলের দীর্ঘ পথযাত্রা।

ঢাকা বিমানবন্দরে যখন পৌঁছালাম, তখন ভোর সাড়ে ৪টার মতো। মনে হলো নির্ধারিত সময়ের আধ ঘণ্টা আগেই পৌঁছাতে পেরেছি। উড়োজাহাজ থেকে নেমে আনুষঙ্গিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলাম যথারীতি ছয় ফুট শারীরিক দূরত্ব মেনে। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের সময় নিউইয়র্ক থেকে সঙ্গে আনা কোভিড-নাইনটিন নেগেটিভ সাবমিট করতে হলো। অ্যান্টিবডি রিপোর্টও নিয়ে এসেছিলাম। প্রয়োজন পড়ল না। ডিউটি অফিসার নিলেন না। কোভিড-নাইনটিন-এর টেস্ট রিপোর্টগুলো বিমানে চড়ার ৭২ ঘণ্টা সময়কালের মধ্যে সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তবে একটু উনিশবিশ হলেও তুলকালাম হবে বলে মনে হলো না।

বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে প্রায় বছর দুই আগে ফেলে যাওয়া আমার হারানো পৃথিবী ফিরে পেলাম। ‘হায় রে আমার মন মাতানো দেশ, হায় রে আমার সোনা ফলা মাটি।’ চোখ জ্বালা করে উঠল। বুকটা ধক করে উঠল। শতকরা পঁচানব্বই ভাগ মানুষের মুখে নেই মাস্ক। করোনাকালে সতর্কতা বিধি পরিপালনের পরোয়া নেই। বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যেন বিপরীত যাত্রা, বড় বেপরোয়া জীবনযাপন!

লেখক: বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (লিয়েন), শিক্ষা মন্ত্রণালয়

মন্তব্য পড়ুন 0