বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এরপর আরেকটি বাক্য—‘সেকালে বিচক্ষণ বাঙালির জন্য ইউরোপিয়ান থার্ড বলে একটি কামরা ট্রেনে জুড়ে দেওয়া হতো।’ সঙ্গে সঙ্গে পরাধীন ভারতের আবহটি এসে গেল। যেসব সাদা চামড়ার মানুষ আয়ের দিক দিয়ে ততটা সচ্ছল ছিলেন না, তাঁরা থার্ড ক্লাসে চাপলেও যাতে কালো মানুষদের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করতে বাধ্য না হন, সে জন্য এ বিশেষ কামরার ব্যবস্থা। তবে মূল মজাটি এসেছে ‘বিচক্ষণ বাঙালি’ শব্দটির প্রয়োগে। সাদা চামড়ার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, বাঙালির বুদ্ধি যে তাকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহারের কায়দাটি রপ্ত করেছিল, সে কথাটি একটি অনন্যসাধারণ মোচড় দিয়ে লেখক প্রকাশ করেছেন।

এরপর রয়েছে এ কামরার একমাত্র আরোহী অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সাহেবের সঙ্গে লেখকের প্রাথমিক সংঘাত। এ কামরায় চাপতে যেতে সাহেব বাধা দিয়ে বলেছে, ‘এটি ইউরোপীয়দের জন্য।’ লেখক তখন কালো চামড়ার সাহেবকে তাঁর যথাযোগ্য স্থান নির্দেশ দিয়ে বললেন—‘ইউরোপিয়ান এখানে কেউ নেই, চলো তুমি আর আমি গিয়ে এটিকে কাজে লাগাই।’ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা যে নিজেদের সাহেব ভাবে এখানে ব্যঙ্গ রয়েছে তার প্রতি, আর লেখকের স্বাজাত্য অভিমানও এসেছে খুব সূক্ষ্মভাবে। আক্রমণাত্মক শ্লেষ বা ব্যঙ্গ লেখকের রচনার স্থায়ী ভাব নয়, তাই অনতিবিলম্বে সাহেব বন্ধুতে পরিণত হলেন, আর খাবার ভাগ করে খাওয়ার পর্ব শুরু হলো। তখন আরেকটা কৌতুককর ব্যাপার ঘটল। দেখা গেল, সাহেব খাবারগুলোকে ভাবছেন নিজের স্ত্রীর হাতে তৈরি করা সুখাদ্য, সেগুলো আসলে দোকানের কেনা খাবার, কারণ লেখকও ওই খাবারগুলোই এনেছেন, একই ‘অ্যামিনিয়া’ রেস্তোরাঁ থেকে। এমনকি লেখক ফিরিঙ্গি গিন্নির খাবার কেনার দৃশ্যটি মনে করতে পারলেন। এ দুই যাত্রীর ক্ষণিক সম্পর্কের অবকাশে রয়েছে একটি মাধুর্যের আস্বাদন। লেখক ঘুমিয়ে পড়েছেন, উঠে দেখলেন পথে কোথায় যেন সাহেব নেমে গেছেন, খাবারের চুপড়িটি রেখে গেছেন, তাতে একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে সফল যাত্রার জন্য সহযোগীর শুভকামনা। গোটা ঘটনার ওপর একটি অসামান্য মানবিক মাত্রা আরোপ করেছেন লেখক।

এখানে যতটুকু আলোচনা করলাম, তার সবগুলো উপাদান নিয়েছি ‘দেশে বিদেশে’র প্রথম দুই-তিনটি পৃষ্ঠা থেকে। আমার মনে হয়, পরবর্তী রচনার মাধ্যমে তাঁর যেসব গুণাবলি ও দক্ষতা প্রকাশিত ও বিকশিত, যেগুলোর জন্য লেখক হিসেবে তিনি স্বরাজ্যে সম্রাট তাঁর প্রায় সবগুলোর অঙ্কুর এ প্রথম রচনার প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠার মধ্যে বিধৃত। প্রথমে ভাষার কথা আসে। মুজতবা আলী নিজে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন, ‘শোনো, গুরুচণ্ডালী করবি, নইলে ভাষার জোর আসে না।’ গুরুর গুরু দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ নির্দেশ নিশ্চয় মুজতবাকে সাহস জুগিয়েছিল। তাই বইয়ের প্রথম বাক্যে ‘ন-সিকে’, ‘শর্টস’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতে ইতস্তত করেননি। পরবর্তীতে আরবি, ফারসি, জার্মান, ফরাসি, সিলেটি সব ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাতে ভাষার জোর কতখানি বেড়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ধারাবাহিক ‘দেশে-বিদেশে’ পড়ার সময় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ মন্তব্যে। পাঁচমিশেলি এ পদ্য তাকে অভিভূত করেছিল। অথচ শরদিন্দু নিজে ছিলেন তৎসম শব্দ ব্যবহারের নিপুণতম কারিগর। মুজতবার সাহিত্য চর্চার দীক্ষা পর্ব পুরোটা রবীন্দ্রনাথের ছত্রচ্ছায়ায়, অথচ তাঁর গদ্য রবীন্দ্র প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। মহৎ গুরু যে শিষ্যকে বন্দী করেন না, মুক্ত আবহে বিচরণের চাবিকাঠি তুলে দেন, রবির ছায়ায় মুজতবার স্বাধীন বিকাশ তার চূড়ান্ত প্রমাণ।

দ্বিতীয়ত, মুজতবার নিখাদ বাঙালিত্ব। বাঙালির গর্বে তিনি বরাবর গরীয়ান, বাঙালির ব্যর্থতা পরাভবে তিনি মুহ্যমান। পেশোয়ারের পর্যুদস্ত পাঠানদের আড্ডায় তিনি বাঙালির বীরত্ব নিয়ে দাপট দেখাতে ছাড়েন না, কারণ বাঙালি বন্দুক পিস্তল নিয়ে ইংরেজকে দেশ থেকে তাড়াতে তৎপর। আবার বাণিজ্যে বাঙালির আলস্যজনিত ব্যর্থতার বেদনা তাঁর কলমে ঝরে পড়ে যখন তিনি ‘এ-সাবান বিককিরির নয়’ সম্পর্কিত গল্পটি বলেন। বাঙালির রান্না নিয়ে তাঁর গর্ব, এমনকি বাঙালি যে কাটা চামচের বদলে হাত দিয়ে খায়, বিদেশিদের কাছে তা নিয়ে গর্ব করতে তিনি ছাড়েন না। ‘প তন্ত্র’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’তে এমন বিবরণ অনেক রয়েছে।

অতঃপর তাঁর জাতীয়তাবোধ। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানের সাহেবদের দাবি যেমন তিনি মানেন না, তেমনি নিজের দাবি তিনি ছাড়েন না। পরবর্তী রচনায় সেটি ফুলে-ফলে বিকশিত হয়েছে। মদ খাওয়ার পাল্লায় জার্মান পাড় মাতালকে পরাজিত করে শিখ ভদ্রলোক যখন বিজয় গর্বে উঠে যান, তাঁর গর্বে মুজতবা গর্বিত। আবার জার্মান দার্শনিক অধ্যাপক যখন দেশীয় দর্শনের অন্তর্বস্তুর সন্ধান না পেয়ে আবার দেশে জন্ম নেওয়ার বাসনা প্রকাশ করেন, তখনো মুজতবা আলীর আনন্দ বাধাবন্ধহীন। সবচেয়ে উল্লসিত হন যখন ধ্বনিতত্ত্বের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানুষের কণ্ঠস্বরের উদাত্ত ব্যঞ্জনা বোঝানোর জন্য জার্মান ধ্বনি বিজ্ঞানের অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার রেকর্ড বাজিয়ে দেন। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয়ের উপাসক মুজতবা চীন আক্রমণের পটভূমিতে তাই অবলীলায় মহাভারতের ‘ভীষ্মপর্ব’ থেকে আপৎকালীন কর্তব্য নিরূপণের প্রাচীন নজির সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেন।

সর্বোপরি মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। এ ভালোবাসার জোরে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সাহেব তাঁর কাছে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মানবিক রূপে উন্মোচিত। করুণায় বিগলিত হয়ে তাই তিনি সে পণ্ডিত মশাইর দারিদ্র্য নিপীড়িত বেদনার কথা বলেন, যিনি লাটসাহেবের কুকুরের একটি ঠ্যাংয়ের সঙ্গে নিজের তুলনা করেছিলেন। আবার বিদেশি ইহুদি বালক যে নিয়ত বিড়ম্বিত হতো সহপাঠীদের কাছে, যেহেতু সে ছিল অবৈধ সন্তান, সে কথা বলতে গিয়ে লেখকের মমত্ববোধ এক অতলান্ত গভীরতাকে স্পর্শ করে। সমস্ত হাসিঠাট্টা রসিকতার অন্তরালে করুণা ঘন যে নির্ঝর তাঁর রচনায় নিয়ত প্রবাহিত, তার মর্মমূলে রয়েছে এক সর্বব্যাপ্ত মানবিকতার বিচ্ছুরণ।

‘দেশে-বিদেশে’র প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা তাই অয়স্কান্তমণির মতো, মুজতবা এখানে অনায়ত্ত, সংহত, ভবিষ্যতের সমস্ত সম্ভাবনার নির্যাসরূপে অধিষ্ঠিত। মুজতবার প্রথম পাঠ তাই বই দিয়ে শুরু হওয়া ভালো। বিন্দুতে সিন্ধুর দর্শন তাতে অনায়াসলভ্য হওয়া সম্ভব।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন