default-image

বিশাল এই মরুভূমির বুকে সারি সারি সাজানো তাঁবু। শীতকাল পড়ে গেছে। সময় এখন প্রায় রাতদুপুর। ইস্, কি কনকনে ঠান্ডা রে বাবা! যেন কারা আমাদের সবাইকে জোর করে ধরে এনে বরফের ছাইয়ের ওপর শুইয়ে দিয়ে গেছে। কোনো কিছুর সাড়া নেই। চারদিকটা নিথর নীরবতায় মোড়া, কেমন যেন মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। একেবারে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা। কারা যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে গেছে। নিশ্বাস আটকানো এই নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল একমাত্র ব্যতিক্রম, মাঝে মাঝে মরু বাতাসের ঝিরঝিরানি আওয়াজ।

ঠান্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ফাতেমা চোখ তুলে একবার আকাশের দিকে তাকায়। আবছা জ্যোৎস্না। ভালো করে সবকিছু দেখা যায় না। কুণ্ডলী পাকানো রাশি রাশি মেঘ, স্বচ্ছ-সুন্দর চাঁদটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। কেমন যেন একটা অলক্ষুনে ইঙ্গিতের আভাস। এমন পরিবেশে পড়ে ফাতেমার হঠাৎ ভীষণ ভয় পায়। তার হৃৎপিণ্ডটা বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করে ধাক্কা মারা শুরু করে। ফাতেমার মনে হয়, নিশ্চয়ই এখন সেই শয়তানটা আবার আসছে। কারণ, মেঘে ঢাকা প্রায় অন্ধকারে তাকে দেখা না গেলেও, বাতাসে তার গায়ের বিশ্রী গন্ধ সে কথাই জানান দিচ্ছে।

শয়তানটা মেয়েদের দঙ্গলের মধ্যে এসেই, পুরো এক বালতি পানি একটা মেয়ের গায়ে ঢেলে দিল। নচ্ছারটা জানে যে, এখন মেয়েটা বাপরে–মা’রে করে চিৎকার করে উঠবে আর সেই শব্দে বাকি সবাই জেগে যাবে। গেলও তাই। সেই সঙ্গে ওই হারামির বাচ্চাকে দেখতে পেয়ে সবাই চিৎকার করা শুরু করল। লোকটি একটু এগিয়ে একটা কিশোরীর হাত পাকড়াও করতে গেল। কিন্তু কিশোরীটি ওর হাত ফসকে বেরিয়ে তার মায়ের পেছনে গিয়ে লুকাতে চেষ্টা করল। মা তার ছোট মেয়েকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য লোকটার হাতে–পায়ে ধরে অনেক কাকুতি–মিনতি করতে থাকল। কিন্তু ফল হলো উল্টো। শিকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে বদমায়েশটা ভীষণ রেগে গেল। মায়ের মিনতিকে গ্রাহ্য না করে, আর কথা বলে সময় নষ্ট না করে, সে প্রথমে মাকে, তারপর মায়ের পেছনে লুকানো কিশোরীটির মাথা তার রাইফেলের বাঁট দিয়ে দড়াম–দড়াম করে কয়েক ঘা বসিয়ে মাথা দুটি ফাটিয়ে দিল। তারপর একে একে অন্য মেয়েদের মাথা ফাটানোর তাণ্ডব চালাতে থাকল। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্ত দেখে অনেকে মূর্ছা গেল, বাকিরা তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল। কিন্তু ওই সেনা হারামজাদার তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ওদের মধ্যে যাদের মাথায় এখনো বেয়োনেটের ঘা পড়েনি, তাদের মধ্যের একজন তরুণীকে হ্যাঁচকা এক টানে বগলদাবা করে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল।

যতক্ষণ পর্যন্ত তারা দৃষ্টির গোচরের মধ্যে ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত যেন তাঁবুর মেয়েগুলো নিশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল। ওরা দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে, তারা যেন প্রথমবারের মতো দম ফেলতে পারল। এর মধ্যে যখন ফাতেমা নিজের বড় বোনকে তন্ন তন্ন করে কোথাও খুঁজে পেল না, তখন সে নিশ্চিত হলো, যাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে আর কেউ নয়, তারই বড়বোন।

হতভাগী বোনটা ঘণ্টা খানিক পরে ফিরে এল। তার নাইটির পুরো জায়গাটা যত্রতত্র ছেঁড়া, পোশাকটার সর্বত্র রক্তের ছাপ। তার মাথাটা হেঁট করা, পুরো শরীরটা ঠক ঠক করে কাঁপছে। মনে হয়, সে যে সব কাজ করে এসেছে, তার জন্য সে লজ্জায় ও গুরুতর অপরাধবোধে নিজের বিবেকের কাছে মরে যাচ্ছে। ওর দিকে তাকালে মনে হয়, লোকটির সঙ্গে ওর অনেক ধস্তাধস্তি হয়েছে। আরও মনে হয়, সে নিদারুণ ক্লান্ত, এখনই বুঝি ‘ফিট’ হয়ে যাবে। সবাই মিলে ধরে তাকে তোশকের ওপর বসাল। গায়ে হাত দিয়ে দেখা গেল, তার শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে। বুঝতে কষ্ট হয় না, লোকটা তার শরীর-মন-জীবন একেবারে ছারখার করে দিয়েছে। ফাতেমার মনে এখন বড় শঙ্কা, শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে বিধ্বস্ত তার বোন জীবনে আর কখনো সুস্থ সাবলীলভাবে বেঁচে থাকতে পারবে তো? একটা কথা মনে হলে ফাতেমার হাসি পায়, ওই শয়তানগুলোর নেতা যে দানব, তার একনায়কতন্ত্র, তার মান্ধাতা আমলের বস্তাপচা নিয়মকানুনই নাকি সবার জন্য আরও ভালো, আরও সুখী জীবন এনে দেবে।

বিজ্ঞাপন

পরের রাতে ফাতেমা আর ঘুমাতে যায়নি, জেগেই ছিল। লোকটা যখন আবার এল, তখন ফাতেমাকে একটুও ইতস্তত করতে বা অখুশি হতে দেখা যায়নি। বরং সে বেশ হাসতে হাসতে লোকটার একটা হাত বগলদাবা করে, প্রায় নাচতে নাচতে বেরিয়ে সেনার তাঁবুতে চলে গেল। সেখানে লোকটা ফাতেমাকে নানা ভঙ্গিতে আদর করার ফাঁকে যেই পাস ফিরে একটু অন্যদিকে তাকিয়েছে, অমনি ক্ষিপ্র হাতে সেনার লোডেড রাইফেলটা তুলে, তার কপালে ঠেকিয়েই সোজা দুড়ুম। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা এক পাশে ছিটকে পড়ে অল্পক্ষণ পরে একেবারে অবশ হয়ে গেল।

ফাতেমার মনে হলো, তার মতো শত শত মেয়ে, যাদের দিনের পর দিন গতকাল এবং আজ রাতের মতো এক অবর্ণনীয় অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে অথচ কিছুতেই কিছু করতে পারছে না, তাদের হয়ে সে অন্তত কিছুটা প্রতিশোধ নিতে পেরেছে। এই স্বস্তিটুকু টিকল মাত্র অল্প কিছুক্ষণ। পর মুহূর্তে তার আবার একটা দারুণ ভয় এসে চেপে ধরল। সে ভাবল, সকাল হলে লোকটির বন্ধুরা যদি ঘটনাটা জানতে পারে, তাহলে তো তারা ওকে হায়েনার মতো টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খাবে। চিত্রটা চোখের সামনে ভেসে উঠতে সে একপ্রকার শিউরে উঠল।

অনেকক্ষণ ধরে, অনেক গভীর চিন্তা করে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পেরে ফাতেমার মুখে একটা তৃপ্তির হাসি খেলে গেল। তার মনে হলো, সে তো ইতিমধ্যেই আজ একটা ভালো কাজ করে ফেলেছে। সেটার জন্য তার নেকি বা পুণ্য লাভ হয়েছে। এখন অন্য হায়েনাদের হাত থেকে যদি সে নিজের শরীরকে বাঁচাতে পারে, তাহলে তার আরও পুণ্য জমা হবে। দুটি একত্র হলে পরের দিন সে বেহেশতে যেতে পারবে। এই ভেবে সে বন্দুকের নলটা এবার নিজের কপালে ঠেকিয়ে, ‘আল্লাহু আকবর’ বলে ট্রিগার চেপে দিল।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন