default-image

জীবনানন্দ দাসের বিখ্যাত কবিতা বনলতা সেন পড়ে আমার মনে কখনোই কোনো রোমান্টিক অনুভূতি আসেনি বা মনে হয়নি যে, এটা একটা মানব-মানবীর প্রেমের কবিতা। কেন আসেনি? এই প্রশ্ন আমি বারবার নিজেকে করেছি। প্রথম বর্ষে ওঠার পর সম্ভবত এ কবিতা পড়েছিলাম। সব সময় মনে হয়েছে এই কবিতা আমাকে ভাবিয়েছে এবং দূর কোথাও নিয়ে গেছে। সে দূরের জবাব আমার জানা ছিল না। কিন্তু এখন মনে হয় আমি সে দূরের খোঁজ পেয়েছি।

যে কবিতাকে যুগে যুগে মানব-মানবীর প্রেমের কবিতা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাকে আমি হঠাৎ অন্যভাবে ভাবলে বা রূপ দিলে একটু খটকা লাগতেই পারে। আমাকে মূর্খও মনে হতে পারে। এই মনে হওয়া এক প্রকার সত্যও। নতুন জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করি; কতটা পারি তা জানি না। কবিতার মূল উপজীব্য প্রেম, শান্তি, ক্লান্তি ও এর মধ্যে ফিরে দেখা। এটা ঠিকই আছে। মানব আত্মার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শান্তি। সেই শান্তিকে দেখতে হয় অপ্রেম, দুঃখ, কষ্ট, ক্লান্তি—এগুলোকে সরিয়ে। যা দেখার জন্য সত্য বলতে নিজের মধ্যে ডুব দিতে হয়। কিন্তু জীবনানন্দ বলছেন নাটোরের বনলতা সেনের কথা, যার অস্তিত্ব তাঁর বাস্তব জীবনে নেই। এমনকি তিনি নাকি কখনো নাটোরেই যাননি।

বিজ্ঞাপন

মানব সৃষ্টির আরেক মূল সূত্র হচ্ছে প্রেম। সে প্রেমে আনন্দ আছে, বেদনাও আছে। সেটা আমরা আদি মানব আদম-হাওয়া বা অ্যাডাম-ইভের জীবন বিশ্লেষণ করলেও দেখতে পাই। কোনো মানবীর নাম যদি বনলতা হয়, সে হতে পারে প্রেমের প্রতীক, শান্তির প্রতীক কবির জীবন বা কল্পনায়। এ প্রেমের পরম পর্বও মানুষের নিজের মধ্যে। কবি শান্তির সঙ্গে একজন মানবীর নাম ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কেউ জানে না, তিনি কে? বাস্তব সত্যের ভিত্তিতে যদি আমরা ব্যাপারটা দেখি, দেখা যায় যে মানবী শান্তি দেয়, সে আবার ব্যথাও দেয়। তাই নারীর মন ঈশ্বরও বোঝেন না বলে কথা প্রচলিত আছে। সত্যি শান্তি দিলে এমন কথা কি হতো?

বনলতা সেন কবিতায় আমি জীবনানন্দ বা বনলতাকে নয় আমি খুঁজে পেয়েছি তৃতীয় একজনকে, যাকে এই দুজনই ধারণ করছেন। এই তৃতীয় রূপ একই সঙ্গে নারী ও পুরুষ। সেই তৃতীয়জন হচ্ছে আত্মা। আত্মায় বা স্পিরিচুয়ালিটিতে নারী বা পুরুষত্ব আরোপ করা যায় না। এই জন্মে যে আত্মা নারী রূপে আছে, পরের জন্মে সে-ই হয়তো পুরুষ হবে। কস্টিউম বদল হতে পারে। কথার গভীরে যাওয়ার আগে আমি কিছু কথা বলে নিতে চাই। হাজার বছর ধরে একমাত্র আত্মাই পৃথিবীতে যাত্রা করতে পারে; আর কিছু নয়।

কোনো বিষয়কে কে কীভাবে প্রত্যক্ষ করছে? বোঝা যায় না—এমন একটি ছবির বা কাহিনির অনেক ব্যাখ্যা হতে পারে ব্যক্তির দেখার ক্ষমতার কারণে। যার ওপর ভিত্তি করে আসলে ওই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়। অতি প্রিয় বনলতা সেন কবিতা নিয়েও অনেক মতবাদ আছে। সবাই প্রেমিক-প্রেমিকার রোমান্টিসিজমের ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ কেউ কবির দুঃখ-দুর্দশার জীবন ও সেখানে একজন রমণীর ছায়াকে দেখছেন, যাকে অনেকে নাটোরের পতিতা পল্লির কেউ বলেও ব্যাখ্যা করেছেন। আমার ক্ষেত্রেও তা অবশ্যই আমার দেখার ক্ষমতা অনুসারেই হবে; এর বাইরে নয়। আমার অর্জিত জ্ঞানের প্রতিফলনই এখানে হবে।

‘আপনার মাথার ভেতর স্বপ্ন নয় প্রেম নয় কোনো এক বোধ কাজ করতে থাকবে, আপনাকে ঘুরে ঘুরে কথা বলবে...আপনাকে ক্লান্ত ক্লান্ত করে তুলবে আরও এক বিপন্ন বিস্ময়, তবু আপনাকে একদিন দুদণ্ডের জন্য হলেও শান্তি দেবে রূপকথার অপার্থিব নারী নয়, ইতিহাসের ব্যাবিলনের মিসরের কেউ নয়, একেবারেই বাংলার একটা ছোট্ট শহরের এক অখ্যাত নারী—বনলতা সেন।’

উপরিউক্ত লাইনটুকু কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’ বইয়ের। তাঁর লেখাটা বেশ কয়েকবার পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, তিনি যখন এই লেখাটা লেখেন, তিনি নিজে গভীর কোনো প্রেমের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে প্রেম হতে পারে তাঁর লেখার প্রতি। সেখানে সাফল্যের পাশাপাশি অনেক গ্লানি ছিল, কষ্ট ছিল। এই বই পড়লে বোঝা যায় কবিতার চেয়েও তাঁর বেশি একাত্মতা ছিল জীবনানন্দের সঙ্গে, যেখানে জীবনানন্দের প্রেম-ব্যর্থতার মধ্যে তিনি নিজের প্রতিফলন দেখছিলেন।

এখন লেখকের কথা অনুযায়ী আমি বলতে পারি, আপনাকে শুধু বাংলার নারীর প্রেম কেন, পৃথিবীর সব নারীর প্রেমই শান্তি দেবে? কিন্তু সেই শান্তির পাশাপাশি আবার অশান্তিও দেয়। তাঁর কথা ধরেই বলি, ‘আপনি বিষণ্ন বোধ করতে পারেন। হয়তো বলতে পারেন, বনলতা নামে তো সত্যি সত্যি কেউ ছিল না।’ এটাও সত্য—আসলেই কেউ ছিলেন না।

একজন মানুষ ভেতর থেকে যতটা সুন্দর এবং নিজেকে যেভাবে সাজিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি তার মনটাও সুন্দর। তাঁর ক্লান্তি যদি সে নিজে সরাতে পারে, তবে তাঁর মনের শান্তি আপনা-আপনি ফুটে ওঠে, যার নাগাল সবাই পায় না। নিজের ভেতরের দেখা সবাই দেখতে পারে না। জীবনানন্দ পেয়েছিলেন। মানুষ যখন নিজের ভেতরের শান্তির মুখোমুখি হয়, তখন অন্যরকম বোধ কাজ করে। কবি বারবার সে শান্তির কথাই বলেছেন।

বিজ্ঞাপন

জীবনানন্দের সব সময় একটা আকাঙ্ক্ষা—যে আবার জন্ম নেবেন। ‘আবার আসিবো ফিরে’ কবিতায় তিনি বারবার বিভিন্ন রূপে ফিরে আসার কথা বলেছেন। এ থেকে এটা সহজে অনুমান করা যায়, পুনর্জন্মের প্রতি তাঁর একটা অভ্যন্তরীণ টান ছিল। মানুষ যখন নিজেকে জানতে শেখে, বুঝতে শেখে, তখন তার সমস্ত জীবনের হিসেব-নিকেশ ব্যালেন্স শিটের মতো সামনে আসে। জন্ম থেকে জন্মান্তরের রহস্য, আনন্দ-বেদনা, লেনদেন সব বুঝতে পারে। আত্ম আবিষ্কারের যে রহস্য, সেটার ক্লান্তি দূর হয় এ জানার মাঝে। নতুবা মানুষ ঘুরতেই থাকে পৃথিবীর যাত্রা পথে অনন্তকাল ক্লান্তি, শ্রান্তি নিয়ে।

‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’—হাজার হাজার বছর ধরে কোনো মানুষ হাঁটতে পারে না, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু মানুষের আত্মা হাজার বছর ধরে যাত্রা করছে। আজ এ দেশে তো, শত বছর আগে বা পরে অন্য কোথাও, অন্য কোনো দেশে। ‘বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি’—বিম্বিসার মগধের রাজ ছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় উত্তর ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার সম্ভব হয়েছিল। গৌতম বুদ্ধই মানুষকে প্রকৃত শান্তির স্থান যে নিজের ভেতরে, তা দেখিয়ে ছিলেন। মানব জন্মের নানা ঘাত-প্রতিঘাত তার সঙ্গে যাওয়া-আসা করে। মনের এ হাজার আঘাতের স্বরূপ উন্মোচন হয় না, সে যদি নিজেকে না জানে। কারণ, সে ক্ষেত্রে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার আঘাতগুলোও ফিরে আসে। যাকে কবি জীবনের ‘সমুদ্র সফেন’ বলে তুলে ধরেছেন। কিন্তু মানুষের গ্লানির বোঝা তখন শেষ হয়, সে যখন নিজেকে বোঝে, দেখে। সে তার নিজের মধ্যেই সে শান্তি খুঁজে পায় এবং তারপর তার সে জন্মই হয় তার শান্তির জন্ম। কিছু রহস্যঘেরা শব্দ এবং কবির বারবার ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা আমাকে বলছে, কবি এখানে আত্মার কথাই বলছেন। কবি যখন নিজেকে জেনেছেন, নিজেকেই যেন তিনি বলছেন, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’

১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর মাত্র ৫৫ বছর বয়সে কবি চলে যান এ পৃথিবী ছেড়ে। কিন্তু পুনরায় আত্মার শান্তির নিয়ে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাতেই জীবনের সব লেনদেন শেষ করেছেন। বনলতা সেন কবির ভেতরের সে সুন্দর নির্মল আত্মা, যার মুখোমুখি হতে চেয়েছেন তিনি। ‘সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন/ থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

মন্তব্য পড়ুন 0