বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চিরকুটটি পেয়েই মিনা চিৎকার দিয়ে তার স্বামীকে ডাক দিল, ও গো, শুনছ?

ওদিক থেকে জবাব এল, কী ব্যাপার মিনা? এই সাত সকালে ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছ কেন?

—তাড়াতাড়ি এদিকে এসো। কাজলি তার রুমে নেই, পালিয়েছে।

—বল কী?

বড় ভাই আবদুল বাকি ছুটে এসে রুমে চিরকুটটি দেখে হতবাক। রাত পোহালেই যার বিয়ে। সব দিকে দাওয়াত করা হয়ে গেছে। বর পক্ষকেই বা কী করে মুখ দেখাব?

—তোমাকে কতবার বলেছি কাজলি লজিং মাস্টার সালামকে ভালো পায়। আমাকে অনেকবার বলেছে, সে মাস্টার ছাড়া আর কাউকে বিয়েই করবে না। ছেলেটা খারাপ না, তোমারও অপছন্দ ছিল না।

—ভালো একটা সম্বন্ধ পেলাম তাই রাজি হয়ে গেলাম।

—এখন বোঝ? ঠ্যালা সামলাও। মাস্টারের বাড়িতে কাউকে পাঠিয়ে একবার খোঁজ তো নিতে পারো?

—বাড়ির ঠিকানা তো জানি না। জানি শুধু রাখালগাছি, বাগেরহাটের রাখালগাছি। এতটুকুন পরিচয়ে কী খোঁজ নেওয়া যায়?

খুলনা নগরের সোনাডাঙ্গা আন্তজেলা বাস টার্মিনাল। এদিক থেকে বাস ঢুকছে তো আরেক দিক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কাজলির কাছে সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবী। বাড়ির বাইরে সে একা একা কোনো দিন যায়নি। সব সময় ভাই বা ভাবির সাথি হয়ে গেছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় কোন বাসে চড়ে সালামের বাড়ি যাবে?

সে দেখল একটা বাসের গায়ে লেখা ‘চৈতি এক্সপ্রেস সোনাডাঙ্গা টু বাগেরহাট’। কন্ডাক্টর ছেলেটাও মুখে বিরামহীন উচ্চ স্বরে ডেকে যাচ্ছে বাগেরহাট, বাগেরহাট। কাটাখালী, ন’পাড়া, ষাটগম্বুজ, বাগেরহাট। এখনই ছেড়ে যাবে, আসেন আসেন।

কাজলি কন্ডাক্টরের কাছে যেতেই সে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবেন আফা? ওডেন, ওডেন।

—এই বাস কি সিঅ্যান্ডবি বাজার যাবে, ভাই।

—জি। ওডেন আফা, ওডেন। আপনেরে সিঅ্যান্ডবি বাজার নামায়ে দিব। ওডেন।

সিঅ্যান্ডবি বাজার বাসস্ট্যান্ডে নেমে পড়ল আরেক মুসিবতে। দুটি ভ্যান রিকশা এবং একটি রিকশা কোনোটাই রাখালগাছি যাবে না। কারও ভাড়া আছে, কেউ অন্যদিকে যাবে। অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর একটি রিকশা সেখানে এসে দাঁড়াল।

—কই যাবেন আপা?

—রাখালগাছি বাজার। যাবেন আপনি?

—না, না।, আমি ওই দিকে যাব না। ওই দিকের রাস্তাঘাট আমার জানা নাই।

—আমি দৌলতপুর থেকে এসেছি। আমার বড় বিপদ, ভাই। আমি আপনাকে রাস্তাঘাট চিনায়ে নিয়ে যাব। চলেন, প্লিজ।

রিকশাওয়ালার মনে একটু দরদ হলো, সুন্দরী মাইয়া বিপদে পড়েছে। বাসস্ট্যান্ডে আবার কোন বিপদে পড়ে! যাই নিয়া।

—ঠিক আছে আপা, ওঠেন। আল্লাহ ভরসা।

রিকশা কিছু দূর যেতেই কাজলি জিজ্ঞেস করল, রাখালগাছি বাজার কত দূর?

—অ্যাঁ, বলেন কি আপা? আপনি না বললেন এলাকা আপনি চেনেন? আমাকে রাস্তাঘাট চিনায়ে নিয়ে যাবেন।

—মিছা কথা। অনেকক্ষণ রিকশা ভ্যানের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম কোনোটাই এদিকে আসতে রাজি ছিল না। তাই এই পথের আশ্রয় নিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করবেন, ভাই।

মাথা ঝুঁকিয়ে সে বলল, আচ্ছা। তা হলে এই কথা। যাক, রিকশায় যখন তুলেছি গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই আমার দায়িত্ব। আপনি নিশ্চিন্তে বসুন। আপনাকে পৌঁছে দিব।

—থ্যাঙ্ক ইয়ু, ভাই। থ্যাঙ্ক ইয়ু।

—আপনাকে ওয়েলকাম।

রিকশাওয়ালার ভদ্রোচিত কথাবার্তা শুনে কাজলি মনে মনে ভাবল, এ রিকশাওয়ালা অন্য আর আট-দশটা রিকশাওয়ালার মতো নয়, ব্যতিক্রম। কোনো ভদ্র ঘরের সন্তান হবে? যাক গে। রিকশাওয়ালার চরিত্র নিয়ে থিসিস করার সময় নেই। তার সঙ্গে কী আমি ইয়ে মানে প্রেম করব নাকি? নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোই এখন মূল লক্ষ্য।

—আর কত দূর? ভাই।

—ধরেন, আর দশ পনেরো মিনিট।

—আপনি কি রাখালগাছির সালামকে চিনেন? তার ছোট ভাইয়ের নাম কালাম।

—না, চিনি না। আমাদের বাড়ি এই দিকে না। দড়াটানার ওই পারে। এই দিকে খুব একটা আসা পড়ে না।

—ও আচ্ছা।

—আপা আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। মোড় ফিরলেই রাখালগাছি বাজার। এ অঞ্চলের মিষ্টি খুবই জনপ্রিয়। যে বাড়িতে যাবেন কিছু মিষ্টি নিবেন নাকি?

একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, না ভাই। আমার গন্তব্য অজানা। কোন বাড়িতে যাব তাই তো জানি না।

—বলেন কী?

—হ্যাঁ, ভাই। সে এক ইতিহাস। দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা আমাদের বাড়ি। তিন ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার, ছোট ভাই ব্যাংকে চাকরি করেন। পরিবার নিয়ে থাকেন কুষ্টিয়া। আমি যখন মহেশ্বরপাশা গার্লস হাইস্কুলে ক্লাস নাইনের ছাত্রী রাখালগাছির আবদুস সালাম আমাদের বাড়িতে লজিং থাকতেন। তিনি তখন সরকারি বিএল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র।

—তারপর?

—অতিমারি করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি যখন বন্ধ রমজানের প্রথম সপ্তাহে তিনি জানালেন, বাকি রমজানটা মা এবং ভাইয়ের সঙ্গে কাটাবেন। ঈদের পরেই আমাদের বাড়ি ফিরে আসবেন। এর মধ্যেই আমার বড় ভাই তার এক বন্ধুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার অসম্মতিতেই বিয়ে ঠিক করে ফেলেন।

—আপনি যে সালাম সাহেবকে ভালোবাসেন আপনার পরিবার জানত না?

—হ্যাঁ, জানত। ভাবি ভাইয়াকে অনেকবার বলেছেন।

—তো ভাইয়া কী বলেছেন?

—তিনি বলছিলেন, ছেলেটা লেখাপড়া শেষ করুক। তারপরে দেখা যাবে।

এমন সময় রিকশাওয়ালার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল, আপা আমি মোবাইলটা রিসিভ করি? পরে আপনার কাহিনি শুনছি।

মোবাইলের ওই প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে, তুমি এখন কোথায়?

—আমি রাখালগাছি।

—রাখালগাছি কেন? তুমি তো ওই দিকে যাও না। আজকে কেন?

—আর বলো না, দৌলতপুর থেকে একটি মেয়ে সিঅ্যান্ডবি বাজার এসেছে। তার অন রিকোয়েস্টে এ দিকে এসেছি।

—দুপুরে কিছু খেয়েছ?

—না, খাইনি। আমি গ্রামের ভেতর, এখানে রেস্টুরেন্ট পাব কই? সামনে রাখালগাছি বাজারে পৌঁছে খেয়ে নেব।

—আচ্ছা খেয়ে নিয়ো। মেয়েটিকে পৌঁছে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে। রাখি, আই লাভ ইউ।

ফোনের সব কথোপকথন কাজলি কান পেতে শুনেছিল। জিজ্ঞেস করল কে?

—আমার ফিয়ন্সে।

—রিকশাওয়ালার মুখে ফিয়ন্সে শব্দটি শুনে চমকে গেল কাজলি। এই শব্দটা ইউরোপ আমেরিকার প্রেমিক প্রেমিকেরা ব্যবহার করে।

কাজলি জিজ্ঞেস করল, ফিয়ন্সে মানে আপনি কি জানেন ভাই?

—জানব না কেন? না জেনেই কী বলেছি।

—সে আমার হবু স্ত্রী। আমার পরিবারের সবাই জানে আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। খুব শিগগির আমাদের বিয়ে হবে।

এবার সে আরও চমকে গেল। জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? আপনার পরিচয়টা কি একটু জানতে পারি, ভাই? আফসোসের সঙ্গে বলল, পরিচয় জেনে আর কী হবে, আপা?

—আমার নাম আবু হানিফ। সুন্দরবন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে সেখানে বিএ পড়েছি এক বছর। সংসারের অভাব অনটনের কথা চিন্তা করে চাকরির জন্য অনেক ইন্টারভিউ ভাইভা দিয়েছি। কোনো চাকরি আমার জীবনে ভর করেনি। বর্তমানে বাংলাদেশে ঘুষ ছাড়া কোথাও চাকরি পাওয়া যায় না। বিদেশে গিয়ে আমাদের দেশের অনেকেই ট্যাক্সি-ক্যাব চালায়। আমি দেশে থেকে চালালে অসুবিধা কোথায়? অবশেষে স্বাধীন পেশায় নেমে পড়লাম।

—এতক্ষণ পাশাপাশি বসে আসলাম আপনার নামটা কিন্তু জানা হলো না।

—আমার নাম কাজলি।

—আপনার নাম তো বলেছেন আবু হানিফ। নাইস টু মিট ইয়ু, ব্রাদার।

থ্যাঙ্ক ইয়ু। তারপরে বলেন আপনি এই সিঅ্যান্ডবি বাজার আসলেন কেন?

—আমার অসম্মতিতে ভাইয়া যখন আমার বিয়ে ঠিক করল বাড়ি ছেড়ে পালানো ছাড়া আমার কাছে দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোলা ছিল না।

—তার মোবাইল নম্বর জানেন না?

—জানি, সেটা বন্ধ।

—হয়তো ইচ্ছা করে বন্ধ রেখেছেন।

—না, না। তিনি এমন করতে পারে না, ভাই। আপনি জানেন, একবার আমার জ্বর হয়েছিল। সাত দিন খাওয়ার রুচি ছিল না। সেই সাত দিনই সে রোজা ছিল। রোজা রেখেই ক্লাস করত। সেই মানুষটি এমন করতে পারে না। আমার মন বলছে সে কোনো বিপদে পড়েছে।

—ঠিকানা জানেন?

—ঠিকানা শুধু, ‘রাখালগাছি।’ এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।

সালামের শেষ কথোপকথনের কথাগুলো এ সময় কাজলির হৃদয় পটে ভেসে উঠল, ‘স্যার শোনেন, দাঁড়ান না। আমার কথাটা একটু শোনেন। আমার কথাটা একটু শুইনা যান। আমারে কিছুই না কইয়া যাচ্ছেন ক্যান? কোথায়, ক্যান যাচ্ছেন? কবে আসবেন কিছুইতো কইয়া গ্যালেন না।

—আরে পাগলি! আমি কী একেবারে চলে যাচ্ছি নাকি? রোজার মধ্যে বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি। ঈদের পরেই ফিরব।

—ঈদের পরে যদি না আসেন তাহলে আপনেরে আমি কোথায় খুঁজব? আমি তো আপনার ঘরবাড়ি কিছুই চিনি না।

—ঘরবাড়ি চেনা লাগবে কেন? আমি ঈদের পরেই ফিরে আসছি।

—যদি না আসেন? যদি কোনো অসুবিধা হয়?

—মোবাইল নম্বর আছে না?

—মোবাইলের কোনো ভরসা নেই। আপনি আপনার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে যান।

—রাখালগাছি। সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে বাগেরহাটগামী যেকোনো বাসে সিঅ্যান্ডবি বাজারে নাইমা আমাদের বাড়ি রিকশা অথবা ভ্যানে যেতে মাত্র সোয়া এক ঘণ্টার পথ। আমার ছোট ভাইয়ের নাম আবুল কালাম। এলাকার সবাই আমাদের চিনে। যাও বাড়ি যাও। মাইনসে দেখলে খারাপ ভাববে। আমি ঈদের পরেই ফিরে আসব।

রিকশাওয়ালা আবু হানিফের ডাকে সংবিৎ ফিরে এল কাজলির।

—আপা নামেন আমরা এখন রাখালগাছি বাজার। আপনি কোথায় খুঁজবেন সালাম সাহেবকে? আপনি রিকশায় বসেন। আমি মানুষজনের কাছে জিজ্ঞেস করি কেউ সালাম নামে কাউকে চিনে কিনা?

সে আশপাশের দোকানদার, মানুষজনের কাছে জিজ্ঞেস করল কেউই সন্ধান দিতে পারল না। ফিরে এসে জানাল, না আপা কেউ সঠিক সন্ধান দিতে পারল না। এক ব্যক্তি পরামর্শ দিল, সামনে রাখালগাছি ইউনিয়ন পরিষদ অফিস। সেখানে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন?

—আচ্ছা চলেন।

পরিষদের চেয়ারম্যান স্থানীয় মেম্বারদের নিয়ে একটি সভায় ব্যস্ত ছিলেন। লক্ষ্য করলেন রিকশায় থেকে নেমে একটি অপরিচিত মেয়ে অফিসের বারান্দায় পায়চারি করছে। চেয়ারম্যান চৌকিদার পাঠিয়ে খোঁজ নিলেন। চৌকিদার এসে জানাল, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

চেয়ারম্যান তাঁকে ভেতরে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী নাম তোমার, বারান্দায় পায়চারি করছিলে কেন?

—আমার নাম কাজলি। দৌলতপুর থেকে এসেছি। আপনাদের ইউনিয়নে আবদুস সালাম নামে কোনো যুবক আছেন? তিনি দৌলতপুর বিএল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তাঁরা দুই ভাই। ছোট ভাইয়ের নাম আবুল কালাম।

—কেন?

—তাঁর সঙ্গে দেখা করা আমার খুবই জরুরি।

—বাবার নাম কী? কোন গ্রাম?

—বিস্তারিত কিছু জানা নাই।

—আমাদের ইউনিয়নে ১০টা গ্রাম। প্রায় ১৮ হাজার মানুষের বাস। বিস্তারিত না পেলে শুধু সালাম-কালাম বলে তো কাউকে খুঁজে বের করা সম্ভব না।

তুমি এক কাজ করো, বেটি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বের হয়ে ডান দিকে কিছু দূর গেলে পল্লী মঙ্গল গার্লস হাইস্কুল। ওই স্কুলের পাশের বাড়ির একটা ছেলে বিএল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। করোনার কারণে সে এখন বাড়িতে। তার কাছে খোঁজ নিতে পারো?

সভা থেকে এক লোক বলে উঠলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ তার নামও সালাম। তার কোনো ছোট ভাই আছে কি না জানি না। তবে একটা বোন আছে।

পরিষদ থেকে বেরিয়ে হানিফ কাজলির দিকে তাকিয়ে বললেন, কি করবেন, যাবেন? আমি কি আপনার সঙ্গে থাকব নাকি চলে যাব? না পেলে তো আবার ফিরে যেতে হবে।

—আমার তো ফেরার আর কায়দা নেই। বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছি। ভাই ভাবি কি আর বাড়িতে উঠতে দেবেন?

—থাকি।

কাজলি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল থাকলে তো ভালোই হয়।

—তা হলে এক কাজ করি। রিকশাটা ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে কোথাও নিরাপদে রেখে আসি।

—ঠিক আছে। তাই করেন।

—নামের সঙ্গে মিল আছে। বাকি পরিচয়ের সঙ্গে তো মিল নেই। সালামের ছোট ভাই কালাম। কেউ তো বলল না কালাম নামে ভাই আছে। আবার বোনও আছে। চলেন, দেখে আসা যাক।

বাড়ির আঙিনায় এক কিশোরী ভেজা কাপড় নাড়ছিল। আবু হানিফ তাঁকে জিজ্ঞেস করল, সালাম ভাই কি বাড়িত আছেন?

—আছেন।

—কই?

—তিনি মাছের ঘেরে।

এমন সময় কাজলি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি তার বইন? আমার কথা কিছু বলে নাই।

—আপনি, আপনি কে? আপনার কথা কিছু বলবেন?

হাসি হাসি মুখে বলল, আমি কাজলি। তোমার ভাইয়াকে গিয়ে বল কাজলি এসেছে।

—আপনারা দাঁড়ান। আমি ভাইয়াকে ডেকে নিয়ে আসছি।

একজন যুবকসহ ফিরে এল কিশোরী।

কাজলি তার মুখের দিকে তাকিয়ে হতাশ হলো। তারপরেও জিজ্ঞেস করল, কই, কই সে?

যুবকটি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, কে? আপনারা কাকে চান?

—সালাম। মানে আবদুস সালাম। সে বিএল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

যুবকটি জবাব দিল, আমিই আবদুস সালাম। বিএলে পড়ি।

কাজলি মুখ ঘুরিয়ে বলল, না না। ভুল। আমি যে সালামকে খুঁজি এ তো সে নয়। দ্রুত পায়ে রাস্তার দিকে ছুটে গেল।

কিশোরীটি তখন ভেংচি কেটে বলল, চিন্তা কর ভাইয়া, ক্যামন আজাইরা মাইয়া গেরামে গেরামে ঘুইরা জামাই বিচরায়।

—ধ্যাত, দিলি আজকের দিনটা মাটি কইরা। যাই। ঘেরে লোকজন আবার বাগদা ধইরচে।

গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে কোথাও সালামের সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে আবু হানিফ বলল, দিন তো শেষ এখন কী করবেন? ফিরে যাওয়াই ভালো।

দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কাজলি বলল, ফেরার তো কোনো পথ নাই আমার।

—কম তো খুঁজলেন না। পাওয়া তো দূরের কথা। তার কোনো ছায়াও মিলছে না।

—আমি আপনারে খুব অসুবিধায় ফাল্যায়ে দিলাম?

—আমি কী কইছি আমার খুব অসুবিধা হইতাছে?

—সামনে ক্ষুদ্র চাকশ্রী গ্রাম। এই গ্রামটাই বাকি, খুঁইজা যাই।

—দেখেন ভাই, আল্লাহ যখন আপনার মতো একজন ভালো মনের মানুষ মিলাইয়া দিছে। দেইখেন তারেও ঠিক ঠিক মিলাইয়া দেব।

আবু হানিফ একটু নীরব থেকে বলল, চলেন।

হাঁটতে হাঁটতে সামনে দেখা যাচ্ছিল ক্ষুদ্র চাকশ্রী প্রাইমারি স্কুল। এমন সময় স্থানীয় এক পথিকের সঙ্গে দেখা। তাঁকে দেখা মাত্র আবু হানিফ সম্ভাষণ জানালেন।

—আপনাকে তো চিনলাম না?

—আমার নাম আবু হানিফ। বাড়ি বাগেরহাট।

—কোন বাড়ি যাইবেন?

পথিকের কথা শেষ না হতেই কাজলি জিজ্ঞেস করল, আপনাদের গ্রামে সালাম, সালাম নামের কোনো যুবক আছে? তার ছোট ভাইয়ের নাম কালাম।

—হ, সালাম কালাম। তারা তো দুই ভাই ছিল। বেশি দূর না। প্রাইমারি স্কুলটা দেখছেন তার পেছনের বাড়িটাই।

কাজলি ও আবু হানিফ দ্রুত সেদিকে ছুটে গেল। সারি সারি দুটো কুঁড়েঘর। সামনে খড়ের পালা। বাড়িতে ঢুকতেই অপরিচিত মানুষের সাড়া পেয়ে একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল। ঘরের ভেতর থেকে নারী কণ্ঠে শোনা গেল, কালাম দেখত বাবা, কে এল?

কালাম নামটা শুনে কাজলি ও আবু হানিফ এ-ওর মুখোমুখি হাসিমুখে তাকাল। ঘর থেকে ১২-১৪ বছরের এক কিশোর বেড়িয়ে এল। পেছনে মধ্যবয়সী এক নারীও।

পুত্র শোকে কাতর নারী মলিন কণ্ঠে আবু হানিফের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কারে চাও বাবা! ঠিক একই সময়ে নজর গেল কাজলির দিকে। চেয়ে থাকলেন অপলক নেত্রে। তারপরে করুণ স্বরে বললেন, মাইয়াডা কেডা? খুব চেনা চেনা লাইগছে।

আস্তে আস্তে কাজলির কাছে গেলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তোমারে তো আমি দেখছি? কই দেখেছি, কই দেখছি বলতে বলতে পরক্ষণে বললেন, দাঁড়াও দাঁড়াও বলে ঘরে ফিরে গেলেন।

এ সময় আবু হানিফ বলল, এ আবার কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম। আল্লায় জানেন।

ঘর থেকে একটি মোবাইল ফোন হাতে ফিরে এসে মোবাইলে ফটো গ্যালারি সার্চ করে বললেন এই যে। পরিচিত মোবাইল ফোন দেখতে পেয়ে এ সময়ে কাজলি হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, এইডা, এইডা সালাম ভাইয়ের মোবাইল না?

নারী চোখ মুছতে মুছতে বললেন, হ, এইডা আমার বাবার মোবাইল। এই মোবাইলের মধ্যে আমি তোমারে কত দেখছি। তোমার কত ছবি তুলছে। তার কোনো শ্যাষ নাই। একটা কইরা দ্যাহাইছে আর কইছে, এই মাইয়াডারে তোমার পছন্দ হয়, মা? পাগল। মায়েরে কেউ এই কথা জিগায়।

কাজলি হেসে হেসে জিজ্ঞেস করল, কই, হ্যায় কই?

—তুমি তার সঙ্গে দেখা করতে আইছ?

—মাথা নেড়ে জবাব দিল, জি।

চোখের জল মুছতে মুছতে আসো বলে বাড়ির পেছনের দিকে আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে বাগানে নতুন একটা কবরে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ওই যে, ওই যে আমার বাবা কবরে ঘুমায় বলে কাজলিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

কাজলিও নারীকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার দিয়ে মূর্ছা গেল। এতক্ষণ ধরে তার চোখে মুখে যে সামান্য আশা ছিল সেটা মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেল।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছেলে কালামকে বললেন, তাড়াতাড়ি এক বালতি পানি নিয়ে আয়, বাবা। নাকে মুখে পানি ছিটাইয়া দে। এ সময় আবু হানিফ কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, কি করে কী হলো?

—দৌলতপুর থেকে বাড়ি ফিরে সালাম বলল, ঢাকায় যাবে। ওদের ছোট মামা ঢাকায় থাকেন। আমি বললাম, একা যাবি কেন কালামকেও সঙ্গে নিয়ে যা। বাবা আমার ইউনিভার্সিটিতে পড়লে কী হবে? নিয়মিত নামাজ পড়ত। মামার বাসা থেকে বায়তুল মোকাররম ঢিল ছোড়া দূরত্বের পথ। শুক্রবার। দুই ভাই এক সঙ্গে জুমার নামাজ পড়তে গেল। সেদিন এক দল মুসল্লির সঙ্গে বিভিন্ন দাবিতে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালায়। এ সময় একটি গুলি এসে সালামের বুকে লাগে। ব্যাস, সব শ্যাষ।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন