default-image

ফাইনাল পরীক্ষা শেষে হল থেকে বেরিয়ে জেনেভা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের বাগানে বসে জসিম ভাবছিল, এই লম্বা দুই মাসের ছুটিতে কী করা যায়। ভাবনায় ছেদ পড়ল সুইস সহপাঠিনী এডিথ মুলারের পায়ের আওয়াজে। জসিমের সামনে মুখোমুখি বসতে বসতে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘হেই, জসিম, ছুটিতে দেশে যাচ্ছ নাকি?’

-ফাইনাল রেজাল্ট বের না হওয়া পর্যন্ত দেশে যাওয়ার কথা ভাবছি না।

-তাহলে সামার হলিডের প্রোগ্রাম এখনো করোনি?

-ঠিক তাই, জসিম হেসে বলল।

-তাহলে, চলো একদিন আমার গ্রাম বাসেল থেকে ঘুরে আসি। এই জেনেভা শহর থেকে মোটর গাড়িতে করে মাত্র তিন ঘণ্টার পথ। সেখানে তুমি সুইজারল্যান্ডের আসল সৌন্দর্য দেখতে পাবে। বৈচিত্র্যে ভরা। বন, উপবন, আঙুর আর আপেলের ক্ষেত। একদিকে ঐতিহ্যবাহী গির্জা, অন্যদিকে গ্রামের কোলাহলময় ‘গার্ডেন মার্কেট’ তোমাকে সত্যিই আনন্দ দেবে।

-মুলার, তোমার প্রস্তাবটা লোভনীয়। কিন্তু এ মুহূর্তে তোমাকে কিছু বলতে পারছি না। পরে জানাব।

-ঠিক আছে। এখন চলো ক্যানটিনে গিয়ে কফি খাই। ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে।

-তাই হোক।

ক্যানটিনে এডিথের সঙ্গে কফি শেষ করে জসিম তার ইউনিভার্সিটি হোস্টেলে ফিরে গেল। হোস্টেলে ঢোকার পরপরই তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। লন্ডন থেকে বন্ধু হান্নান ফোন করেছে। জসিমকে অনেকবারই ওর ওখানে যেতে বলেছে। যাব যাব করে আর যাওয়া হয়নি। সে ভাবল, এবার তাহলে লন্ডন থেকে বেড়িয়ে আসা যাবে। কিন্তু ফোন রিসিভের পর ব্যাপারটা অন্য রকম হয়ে দাঁড়াল। হান্নান বলল, ও জেনেভায় আসছে। সঙ্গে তার দুই বন্ধু। জসিমকে আগামী সোমবার জেনেভার ক্যারোলাইনা হোটেলে সন্ধ্যা ৭টায় দেখা করতে বলল। সে তার বন্ধুদের নিয়ে একটা মাইক্রোবাসে করে দক্ষিণ ফ্রান্স হয়ে জেনেভায় আসছে। তারপর ফেরার পথে প্যারিস হয়ে লন্ডন। এদিকে ওদের সঙ্গে প্যারিস যাওয়ার জন্য জসিমকে তৈরি থাকতে বলল। জসিম তো আনন্দে আটখানা। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারা যাবে, সেই সঙ্গে প্যারিস ভ্রমণের আনন্দ ও উপভোগ করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার ক্যারোলাইনা হোটেলে যথারীতি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। তবে সন্ধ্যা ৭টায় নয়, রাত ১০টায়। পথের মধ্যে বৃষ্টিতে আটকা পড়েছিল তারা। অন্য দুই আরোহীর সঙ্গে জসিমের আগে পরিচয় ছিল না। কিন্তু ওদের অমায়িক ব্যবহারে খুব সহজেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। বুধবার ওদের জেনেভা ছাড়ার কথা। যাওয়ার দিন গোল বাধল জসিমকে নিয়ে। ওদের সবারই ব্রিটিশ পাসপোর্ট, আর জসিমের বাংলাদেশি পাসপোর্ট। অর্থাৎ, প্যারিস যেতে হলে জসিমকে ফ্রান্সের ভিসা নিতে হবে। কী আর করা! ওরা জসিমের জন্য আরও একদিন জেনেভায় থাকতে রাজি হলো।

ফ্রেঞ্চ দূতাবাস জেনেভা ইউনিভার্সিটির অদূরেই। সবাই মিলে বৃহস্পতিবার দিন সকালেই ফ্রান্সের দূতাবাসে গিয়ে হাজির। সেখানে ঢোকার সময় ওরা দেখল গেটের কাছে তিনজন ভারতীয়, দুজন নারী ও অন্যজন পুরুষ ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে। এই জেনেভা শহরে ভারতীয় একেবারেই চোখে পড়ে না; একমাত্র টুরিস্ট ছাড়া। তাই জসিমের কাছে ব্যাপারখানা আচমকা মনে হলো। কিছুটা উৎসুক তো বটেই।

গ্রীষ্মের সময়। এ কারণে হলরুমে ভিসার জন্য লম্বা লাইন। প্রায় আধঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর জসিমের ডাক পড়ল। সুন্দরী তরুণী জসিমের পাসপোর্ট ও ফরম নিয়ে বলল, বিকেল ৪টায় আসতে। জসিম জানতে চাইল, ব্যাপারখানা কী? তরুণীর উত্তর, ‘নানা রকম ফর্মালিটি আছে, তাই।’ ‘ঠিক আছে, বিকেলে আসছি’, বলে জসিমরা সবাই অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে এসে দেখে, ওই তিন ভারতীয় তখনো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। এবার জসিমদের ঔৎসুক্য আরও বেড়ে গেল। জসিম কোথায় যেন পড়েছিল, বিদেশে অনেক সময় পরও নাকি আপন হয়ে যায়। জসিম ওদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গেল। সে ভদ্রলোককে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার, আপনারা কি এই অফিসে কোনো কাজে এসেছেন?’ জসিমের কথা শেষ হতে না হতেই মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলাটি কেঁদে উঠলেন। ভদ্রলোকটি, ভদ্রমহিলাকে সান্ত্বনা দিয়ে বাংলায় বললেন, ‘কেঁদো না; মাধবী।’ আর জসিমদের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা ভীষণ বিপদে পড়েছি।’ ওদের মুখে বাংলায় কথা শুনে জসিমরা সমস্বরে প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘আরে আপনারা যে বাঙালি!’

তারপর ওদের কাছ থেকে তারা যা শুনল, তা অবর্ণনীয়। মা-বাবা ও মেয়ে—তিনজন মিলে প্যাকেজ ট্যুরে হুগলি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন বেড়াতে। দেশে ফেরার পথে লন্ডনে ওঠেন এক বন্ধুর বাসায়। ভদ্রলোকের নাম আখতারুজ্জামান; ভারতের হুগলি জেলার অবসরপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার। হঠাৎ করে মাথায় চাপল ইউরোপ ঘুরে যাবেন। আবার এই সুযোগ কবে আসে কে জানে। তা ছাড়া বয়সও তো অনেক হলো। তাই ভাবনাটা কাজে লাগালেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক মাসিক ভারতীয় পত্রিকায় একটা ‘ইউরোপিয়ান ট্যুর’-এর বিজ্ঞাপন দেখে তাঁরা আগ্রহী হন। ট্যুর পরিচালনায় রয়েছেন এক গুজরাটি ভদ্রলোক। আখতারুজ্জামান ভাবলেন, ব্যবস্থাপনায় যখন ভারতীয় রয়েছেন, তখন তাঁদের কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তাই আর কোনো চিন্তা না করে প্যাকেজটি বুক করেন তাঁরা।

তাঁদের সঙ্গে প্রায় ২৭/২৮ জন যাত্রী ছিল। কয়েকজন ছাড়া সবাই ভারতীয়। দেশ ভ্রমণ ভালোই হচ্ছিল। মুশকিল হলো সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের সীমান্তে এসে। সীমান্তের পুলিশ ওদের বাধা দিল। কারণ, ওদের ভারতীয় পাসপোর্টে ‘ডাবল অ্যান্ট্রি’ ভিসা ছিল না। জেনেভাতে আসার সময় দক্ষিণ ফ্রান্স হয়ে এসেছিলেন, তাই সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা ওখানেই শেষ। ফ্রান্সে আবার ঢুকতে হলে নতুন করে ভিসা নিতে হবে। কিন্তু কী আশ্চর্য ট্যুরের ব্যবস্থাপনায় যারা জড়িত, তারা ডাক্তার জামানকে আগে থেকে এ ব্যাপারে কোনো কিছুই জানায়নি। মনে করেছিল একবার ভিসা করলেই কাজ শেষ। ট্যুরের পরিচালক তাদের ফ্রেঞ্চ দূতাবাসের সামনে ছেড়ে দিয়ে বলেছে, ওদের জন্য অন্য সবাইকে কষ্ট দিতে পারে না। তাই তারা আজই প্যারিসে চলে যাচ্ছে। আর একটা কাগজে প্যারিসের হোটেলের নাম-ঠিকানা দিয়ে আগামীকাল সেখানে ওদেরকে দেখা করতে বলেছে।

কথাগুলো শুনে জসিম ও তার বন্ধুদের সবার রক্ত গরম হয়ে গেল। চেনা নেই, জানা নেই এ প্রবীণ দম্পতি ও তাঁদের সুন্দরী মেয়েকে পথের মধ্যে ফেলে ওরা কী করে চলে যেতে পারল? জসিম জানতে চাইল, ‘যাত্রীদের কেউ একটুও প্রতিবাদ করল না?’ এতক্ষণ পর তরুণী মেয়েটি মুখ খুলল, ‘যাত্রীদের মধ্যে আমরা সবাই ভারতীয় হলেও বাঙালি আর কেউ ছিল না। তা ছাড়া ওরা ভারতীয় হলেও বিলেতপ্রবাসী, নামমাত্র ভারতীয়। আমাদের অসুবিধার কথা কেউ কোনো মূল্যই দিল না। ট্যুর পরিচালক আমাদের অজ্ঞতার জন্য শুধু ভর্ৎসনা করে গেলেন।’ মেয়েটি একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘এই ট্যুর পরিচালক যদি আমাদের আগে থেকে জানিয়ে দিতেন, তাহলে আমরা ভিসা করে নিতাম। এ ব্যাপারে আমাদের তো কিছুই জানা ছিল না। এখন বলুন আমাদের দোষটা কোথায়?’

জসিম কথার মোড় ঘুরিয়ে ডাক্তার জামানকে বলল, ‘দেখুন স্যার, যদি আপনাদের কোনো অসুবিধা না হয়, তাহলে আজ সন্ধ্যায় আমাদের সঙ্গে এই মাইক্রোবাসে করে প্যারিস যেতে পারেন। আমরাও ভিসার জন্য এখানে এসেছি। বিকেলে পাসপোর্ট ফেরত পাব। তারপরই প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা হব।’

-এ যে দেখছি মিরাকল! ডাক্তার জামান অস্ফুট স্বরে উত্তর দিলেন।

বিজ্ঞাপন

তারপর জসিমরা ওদেরকে নিয়ে দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে বেড়াল। সবাই মিলে দুপুরে এক স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় কাঁচা-পাকা সিদ্ধ করা ভাতের সঙ্গে চিকেন কারি খেয়ে নিল। ইতিমধ্যে ডাক্তার জামান ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হলো। তাঁদের এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ের নাম ওয়াহিদা; এ বছরই হুগলি ল কলেজ থেকে এলএলবি পাস করেছে। বাবা-মার সঙ্গে দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছে। ভাবছে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে আসবে কিনা। ওয়াহিদা জানল, জসিম জেনেভা ইউনিভার্সিটি থেকে ল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে এবং সেও লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার কথা চিন্তা করছে। তাদের ছেলেটি বিহারের এক মফস্বল শহরে সাব ডিভিশনাল অফিসার। মোট কথা সুখী পরিবার।

বিকেলে ৪টা নাগাদ ফ্রেঞ্চ দূতাবাসে এসে সবার পাসপোর্ট ফেরত নিল। তারপর ছোট এক রেস্তোরাঁয় সান্ধ্যভোজ শেষে ফ্রান্সের পথে পাড়ি জমাল তারা। পালাক্রমে সবাই সারা রাত গাড়ি চালিয়ে সকাল ৯টার দিকে প্যারিসের ‘রু দ্য পিগালেতে’ অবস্থিত হলিডে ইন হোটেলে পৌঁছাল তারা। সেখানে অন্য পর্যটক সহযাত্রীদের সঙ্গে ডাক্তার জামানদের থাকার ব্যবস্থা হলো। হোটেলে পৌঁছাতেই দেখল, ট্যুর পরিচালক তাঁর দল নিয়ে প্যারিস দর্শনের জন্য প্রস্তুত। ডাক্তার জামান, মিসেস জামান ও তাঁদের মেয়েকে দেখে ট্যুর পরিচালক হাসিমুখে বললেন, ‘ভালোই হলো ডাক্তার জামান। ঠিক সময় মতো পৌঁছেছেন।’

এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু হান্নান পরিচালকের শার্টের কলার চেপে ধরল। আর রাগে গজরাতে গজরাতে ইংরেজিতে বলা শুরু করল, ‘বাছাধন ব্যবসা করার জায়গা পাও না। তোমাদের কী এমন ক্ষতি হতো, যদি ওদের জন্য জেনেভাতে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে? তোমাদের কি মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয়ে যেত? বেচারাদের পথের মধ্যে ফেলে একেবারে পগার পার। লোভী, নির্দয়, কাপুরুষ।’ আরও কিছু ঘটার আগে ডাক্তার জামান তাড়াতাড়ি এসে হান্নানকে নিরস্ত করলেন, ‘ছেড়ে দাও বাবা হান্নান। যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে।’ ওকে একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলাম, ‘ও যেন ভবিষ্যতে এমন নির্দয় ব্যবহার আর কারও সঙ্গে যেন না করে’, ট্যুর পরিচালকের শার্টের কলার থেকে হাত ছেড়ে হান্নান কথাগুলো বলে।

এর পর যাওয়ার পালা। ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেওয়া-নেওয়া হলো। ডাক্তার জামান বিনীতভাবে বললেন, ভারতে বেড়াতে গেলে অবশ্যই যেন তাঁদের বাসায় জসিম ও তার বন্ধুরা যায়। মিসেস জামান জসিমের কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘তোমাদের বাংলাদেশের ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাদের বীরত্বের কথা অনেক শুনেছি। আজ তা চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে গেলাম। আর একটা কথা, তোমাকে দেখলে আমার ছেলের কথা মনে পড়ে।’ জসিম অবাক হয়ে বলল, ‘এখানে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কী সম্পর্ক রয়েছে?’ মিসেস জামান একটু রহস্য করে বললেন, ‘আছে, আছে, তোমরাই তো তাঁদের উত্তরসূরি।’ এমন কথা একজন বিদেশির কাছ থেকে শুনে সবার বুক গর্বে ভরে উঠল।

জসিম ওয়াহিদার কাছে এসে বলল, ‘কে যেন তাকে বারবার করে ডাকছে। ভবিষ্যতে লন্ডনে লিঙ্কনস ইন এ তাদের কী দেখা হবে?’ ওয়াহিদা হেসে জানাল, ‘না হওয়ার কোনো কারণ তো দেখছি না।’ ফেরার পথে জসিম ভাবছিল, ‘এডিথ মুলারের গ্রামের বাড়িতে সফরের অভিজ্ঞতার স্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে প্যারিস সফরের এ অভিজ্ঞতা নেওয়ার ফল অধিক কিনা।’

মন্তব্য পড়ুন 0