default-image

ট্রেনের খোলা জানালার বাইরে থেকে ধু ধু হাওয়া বইছে। যাত্রীদের ক্লান্ত শরীর আরামে জুড়িয়ে যাচ্ছে। এয়ার পিলোতে হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় ফাল্গুনী বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। ঢাকাগামী রাতের পারাবত ট্রেন দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। আলোর চকিত ঝলকানিতে পেরিয়ে যাচ্ছে কুপি জ্বালানো গ্রামের বাড়ি আর ছোট স্টেশনগুলো। এর মধ্যে জ্যোৎস্নার রুপালি আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে ট্রেনের ঘুমন্ত কামরা।

এই প্রথম বাবা-মাকে ছেড়ে যাচ্ছে ফাল্গুনী টানা ১৫ দিনের শিক্ষা সফরে। দেশের অনেক জায়গা থেকে মিলিত হবে সহপাঠী বন্ধুরা। বোটানি ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক ট্যুর। বন্ধু বিন্নি আর লাবনিকে দিয়ে অনেক কষ্টে রাজি করাতে হয়েছে মা-বাবাকে।

মা-বাবার একমাত্র সন্তান ফাল্গুনীকে কখনো চোখের আড়াল করতে চান না তাঁরা। ফাল্গুনীর বাবা সেকেলে মানুষ, উনি জানেন ইউনিভার্সিটি ট্যুরে স্টুডেন্টদের সঙ্গে দুজন অধ্যাপকও যাচ্ছেন, তবু তিনি মেয়েকে ছাড়বেন না। ফাল্গুনী বাবাকে অনেকবার বলেছে, বাবা আমার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। আমি দুম করে কোনো ছেলের পাল্লায় পড়ব না। যদি পড়ার হতো বিএসসি পড়ার সময় কারও ঘাড়ে লটকে যেতাম। সে সময় অনেক মেধাবী ছেলেরা আমার পেছনে ঘুর ঘুর করেছে। অনেক কষ্টে ওদেরকে সামলেছে ফাল্গুনী। কিন্তু এবারের ট্যুরে নিজেকে যেন একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ট্রেন ছাড়ার পর থেকেই অকারণে তাকে খুশি খুশি লাগছে।

—অ্যাই শুনছিস, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? কানের পাশে ফিসফিস করছে ফরহাদের কণ্ঠ।

গায়ে কাটা দিয়ে উঠল ফাল্গুনীর। তোকে না বলেছিলাম বাংকারে

উঠে আসতে। ‘উঠব তো, ওয়েটিং ফর মিতা। মিতা বলেছে, ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে এসে যাবে।’

ও তো ডাইনিং কম্পার্টমেন্টে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। তুইও যা বুঝিস, ও বললেই কি ১৫ মিনিটে ফিরবে নাকি! যা দেখ গিয়ে ওরা কেমন আড্ডা জমিয়েছে। ঠিক আছে, আমি ছেলেদের সঙ্গে আছি। মিতা এসে গেলে আমাকে একটা মিসড কল দিস, আমি অপেক্ষা করব। বললাম না তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

বিজ্ঞাপন

ফাল্গুনী চোখ বড় বড় করে হেসে বলল, তাই। বাব্বা জরুরি কথা।

হ্যাঁ রে, বিশ্বাস কর। সামনাসামনি বসে কথাটা বলতে হবে। তুই শুনতে না-ও পারিস।

না না, শুনব না কেন? ফাল্গুনীর ভেতরটা কাঁপছে এক অজানা আশঙ্কায়। ও যে কথাটা ভাবছে, সে কথাই কি ফরহাদ বলতে চাচ্ছে? নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ফাল্গুনী বলে, চল ওদিকে খালি সিটে বসি।

ফরহাদ করুণ স্বরে বলে, এভাবে হবে না রে! আমার কথা দু-এক মিনিটে শেষ হবে না। একটু পরেই সবাই হুড়হুড় করে ছুটে আসবে। তারপর জানতে চাইবে আমরা কী কথা বলছিলাম দুজনে। কিন্তু কথাগুলো একান্ত তোর আর আমার।

ফাল্গুনী গলার কাঁপুনি কিছুতেই বুঝতে দেয়নি ফরহাদকে। মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলে, কীভাবে কোথায় বসে বলতে চায় ফরহাদ?

হ্যাঁ রে সেটাই ভাবছি, তবে তুই যদি অ্যালাউ করিস।

তার মানে কী? বিস্ময়ে তাকায় ফাল্গুনী।

মানে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন আমি তোর পাশে আসব।

আমার পাশে আসবে মানে? না না।

ফরহাদ বলে, কথাটা তুই অন্য ভাবে নিস না ফাল্গুনী। আমি তোর বাংকারে উঠব, তারপর ফিসফিস করে কথা বলব। ফরহাদের প্রস্তাবে কথা কিছুক্ষণ আটকে গেল ফাল্গুনীর। তারপর লাজুক মুখ নিচু করে বলেছিল, আচ্ছা।

রাত নিঝুম। অন্ধকার ভেদ করে চলছে ঢাকাগামী ট্রেন। পা টিপে টিপে পুরুষ ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে ফাল্গুনীর বাংকারের সামনে। একবার দুদিক দেখল, তারপর নিঃশব্দ পায়ে ওপরে উঠে পড়ল। ফাল্গুনীর শরীরের ওপর ওর শরীর স্পর্শ হলো। যেন বিদ্যুতের শক খেলে গেল দুই শরীরে।

ফরহাদ উঠতে চাইল। কিন্তু ফাল্গুনী বলল, ‘নড়াচড়া করিস না। কেউ টের পেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আই ডোন্ট মাইন্ড, কানে কানে বল’। দুজন মুখোমুখি। তীব্র ভালো লাগা কাজ করছে দুজনের।

কীরে, বল?

বলব, আচ্ছা শোন। একজন কঠিন সমস্যায় পড়েছে। খুবই ভয়ানক ভাবে তোর প্রেমে পড়েছে। তোকে বলতে সাহস পাচ্ছে না। এদিকে তোকে ছাড়া তার চলবে না।

‘কেন সাহস পাচ্ছে না?’

যদি তুই রিফিউজ করিস, সে সহ্য করতে পারবে না। যদি তোর কোনো বয়ফ্রেন্ড থাকে, তাই সে আগে জেনে নিতে চায়।

না রে, তাকে বলে দিস আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই। আমি এখন খুবই চুজি, তাই এখন রিফিউজ করব না। এখন সেই ছেলের ওপর নির্ভর করছে।

দুজনই হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। কি রে কিছু বলছিস না যে! আমি তো তোকে অ্যালাউ করেছি আমার বাংকারে।

আবার একটা বড় শ্বাস ফেলে ফরহাদ বলল, না ভাবছি তার নামটা বলব কিনা!

তুই না বললেও আমি আন্দাজ করে নিতে পারছি।

জানিস, মেয়েরা আলাদা একটা ইমিউন নিয়ে জন্মায়। তারা পুরুষদের চোখের ভাষা বুঝতে পারে।

তাই তোর প্রস্তাবের জন্য আমি অপেক্ষায় ছিলাম।

তুই ওয়েট করছিলি, দ্যাট মিন্স তুই রাজি।

ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে জোড়ে ব্রেক কষেছে পারাবত ট্রেন। ফরহাদ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ফাল্গুনীর ওপর। ওর মুখের নিচে ফাল্গুনীর মুখ। ফাল্গুনী ফিসফিস করে বলে, দারুণ ভালো লাগার সময়, তাই নারে! হুম বলে ফরহাদ আবার চুপ। অজান্তেই ফাল্গুনীর নরম আঙুল খেলা করছে ফরহাদের চুলে। তোকে একটা কথা বলতে চাই ফাল্গুনী। বলে ফেল। ‘তুই কি ভাবিস এ রকম সুযোগ আবার আসবে?’

হ্যাঁ রে, সেই জন্যই বলি, আমার আজকের আচরণ তোর কেমন লাগল। ফরহাদ যেন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে পুরোনো কথার কাসুন্দি টানছে। নিজের অজান্তে এলোপাতাড়ি স্বরলিপি আওড়াচ্ছে।

ফাল্গুনী ম্লান হাসে, ভাবে বোকা ছেলে এখনো তার দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারছে না। ফ্লাড লাইটের আলোতে দেখছে ফরহাদের মুখ। কনকনে বাতাসেও ঘামছে ফরহাদ। সময় বয়ে যাচ্ছে। বয়ে চলেছে রাত্রির নৈঃশব্দ্য। নান্দনিক জ্যোৎস্না আর লাইটপোস্টের আলোতে ভাসছে দূরের রেললাইন।

ফরহাদ তার অব্যক্ত কথাটা অকপটে বলার চেষ্টা করে। শামীমকে তুই তো চিনিস। যে লোকটা আমাদের এক ব্যাচ আগে ছিল। এখন সে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছে। খুবই ব্রিলিয়ান্ট লোক। আমরা একই এলাকার লোক হওয়ায় দীর্ঘ দিন থেকে তাকে চিনি-জানি। বলতে পারিস আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তোর প্রতি তার একটা দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তাই আমাকে দিয়ে তোর কাছে প্রস্তাব পাঠালেন।

বিজ্ঞাপন

এক নিশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে ফরহাদ। তারপর ফাল্গুনীর উত্তরের অপেক্ষায় চুপ করে থাকে সে।

ফাল্গুনী বুঝতে পারে না এটাই কি ফরহাদের আসল প্রস্তাব, যা বলার জন্য ভণিতা করে আসছিল। দুজনই বাকরুদ্ধ।

এক সময় নীরবতা ভেঙে ফরহাদ বলে, কি রে, কিছু বলছিস না যে?

ফাল্গুনীর চেহারায় বিরক্তি। আমাকে একটু ভাবতে দে, ফরহাদ। গুড নাইট।

এতক্ষণে ফেরিঅলার সাজানো পসরা বিক্রির চেঁচামেচি শুরু হয়েছে। বোঝা গেল আখাউড়া জংশনে এইমাত্র ট্রেন থেমেছে। যাত্রীরা সবাই আড়মোড়া ভেঙে যে যার ইচ্ছামতো ছুটে চলেছে। অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে পুরো কম্পার্টমেন্ট।

ফাল্গুনী গুনগুন করে গান ধরেছে, ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ।’ অনেক দূরে ফুটফুটে আলোয় ভেসে চলেছে নীলাদ্রির বিশাল লেক। নিস্তব্ধ অপরূপ নিসর্গ। এরই মধ্যে ফরহাদও গান ধরে, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু।’

পাশের দোকান থেকে ভেসে আসছে ডুবো তেলে মসলাযুক্ত সমুচা তৈরির ঘ্রাণ। সেই সঙ্গে টেপ রেকর্ডারে আকুল করা সুরে বাজছে, ‘এ পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হোতো, তুমি বলো তো।’

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন