নিয়তি

বিজ্ঞাপন
default-image

টেলিফোনটা রেখে দেওয়ার পরও শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল রায়হান সাহেবের কানে, ‘দোস্ত, তুই আমার কথা শুনলি না!’ ছোটবেলার বন্ধু। অভিমান করে রেখে দিয়েছে ফোনটা। নিউইয়র্কে তখন কয়টা বাজে; হয়তো মধ্যরাত। একসঙ্গে আমেরিকায় যাওয়ার কথা ছিল। জীবন সায়াহ্নে এসে রায়হান বন্ধুকে ফোন করলেন পরামর্শের জন্য।

পালাবদল আর উত্থান-পতন রায়হান সাহেবের নিত্যসঙ্গী। মনে হয়েছিল একদিন গর্তে ছিটকে পড়ে যাবেন। সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিলেন। দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস। আমেরিকান অ্যাম্বাসির বিপরীতে। পরে চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এমন পরিণতি হবে, তা-ইবা কীভাবে বুঝবেন। তখন তো সঠিক মনে হয়েছিল।

রিনা কীভাবে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, ভাবতে গিয়ে কোনো কুলকিনারা পাননি এখনো। অনেকটা অ্যাক্সিডেন্ট বলা যায়। অফিস থেকে বের হয়ে মার্লিনে লাঞ্চ করতেন। মার্লিনের পায়া খুব বিখ্যাত। দুপুরের খিদের সময় পরোটার সঙ্গে খাসির পায়া। দারুণ স্বাদ। রিনাও পায়া খেতে ভালোবাসেন। লাঞ্চ সেরে হেঁটে হেঁটে অফিসে আসতেন দুজন। রিনা একটা চার্টার্ড ফার্মে কাজ করতেন। পাশাপাশি ভবন। তারপর ভালো লেগে যাওয়া এবং বিয়ে। কোনো কোনো সিদ্ধান্তের বেলায় রিনার বুদ্ধির ওপর নির্ভর করতেন। তাঁর পরামর্শে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ব্যবসা ধরেন। সেখান থেকেই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। প্রাচুর্য এবং সম্পদ এখন হাতের মুঠোয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পড়ালেখা শেষে ছেলেটা ভালো কিছু করবে অন্তত রায়হান খন্দকারের এই বিশ্বাসটুকু ছিল। স্বপ্নগুলো বাস্তবতার মুখ দেখল না। এই সত্যটি বুঝতে অনেক দিন লেগেছে। মেয়ে দিলরুবার বিয়ে দিয়েছেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের ছেলে অভির সঙ্গে। রিনার পরামর্শে মেয়ের বিয়েও দ্রুত সম্পন্ন হয়। বাবার পরিচয়ে অভির পরিচিতি। সবাই সমীহ করে তাকে। অভি একদিন বিপদে পড়ে গেল। রাতের আঁধারে কারা ডেকে নিয়ে যায়। দুদিন পর বাসায় ফেরে। তারপর থেকে মানসিক পরিবর্তন। কারও সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে না। এসব জেনে যাওয়ায় রায়হান মেয়েকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। ভেবেছিলেন স্বাভাবিক হয়ে অভি তার বউকে নিয়ে যাবে।

মায়ের বিপরীত চারিত্রিক গুণাবলি নিয়ে মেয়েটা বড় হয়েছে। আত্মসম্মানবোধ প্রখর। মা রিনা খন্দকার রাজধানী মহিলা উন্নয়ন সমিতির সভাপতি। কখন ঘরে ফেরেন ঠিক নেই। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দহরম-মহরম। দিনকে রাত বানানোর কৌশল জেনে গেছেন। তিনি ইদানীং কারণে-অকারণে ক্ষেপে যেতেন মেয়ের ওপর। মায়ের ওপর রাগ করে মেয়েটা দুদিন হলো ঘরে ফিরছে না। স্বামীর বাড়িতেও যায়নি। কোথায় গেল, কিছুই জানেন না রায়হান। ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন তাঁকে পেয়ে বসেছে।

নিজের ছেলে রবিন কি করে সেই খবর পর্যন্ত জানা নেই। সকালে বের হয়, ফেরে রাতে। শেষ পর্যন্ত কলেজের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। উচ্চশিক্ষা তো দূরের কথা। মায়ের মাত্রাতিরিক্ত আদরে এই পরিণতি। রবিন বললে এলাকায় সবাই চেনে। প্রায়ই বন্ধুদের নিয়ে আসে। ঘরের খাবারের চেয়ে ফাস্টফুড তাদের প্রিয়। পিৎজা, চিকেন ফ্রাই, বার্গার ইত্যাদি এবং ড্রিংকস। যখন-তখন মায়ের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়ে যাবে। যুবকদের এই ট্রেন্ড নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা ভাবছেন বলে মনে হয় না। রায়হান সাহেবের চেয়ে থাকা ছাড়া করার যেন কিছু নেই। অনেক আগে থেকেই রবিন বাবার কথাকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এখন কিছুই বলেন না। বললেও গায়ে মাখে না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বারিধারায় দশ কাঠা জমির ওপর রয়েছে তাঁদের চোখ ঝলসানো অত্যাধুনিক বাড়ি। আশুলিয়ায় ড্রিম গার্মেন্টস ও সিদ্ধিরগঞ্জে ড্রিম টেক্সটাইল মিল। এগুলো রায়হান সাহেবের জীবনে সাফল্যের মাইলফলক। স্বপ্নভঙ্গের পরও পরিশ্রম করে এই পর্যন্ত এসেছেন। সব স্ত্রীর বুদ্ধির জোরে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছয়কে নয় করতে হয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এটাই নাকি নিয়ম। উঁচুতলার সঙ্গে ছন্দ মেলাতে রিনা স্বামীকে এই কৌশলটি আয়ত্ত করতে শিখিয়েছেন। খুব কাজে লেগেছে। সমাজে একজন বিজনেস ম্যাগনেট হিসেবে তাঁর নামডাক।

কিন্তু মানসিক দৈন্যে তিনি এখন দিশেহারা। এই বাস্তবতা প্রকাশ করার সৎসাহসটুকুও আবার হারিয়ে ফেলেছেন। শুধু মেকি সুখের অভিনয় করে যাচ্ছেন। ছেলে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বাবার ব্যবসার হাল ধরবে—চাওয়াটা খুব বেশি ছিল না। মেয়ে দিলরুবা কিন্ডারগার্টেন থেকেই মেধাবী। কলেজের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই স্ত্রীর অনুরোধে মন্ত্রীপুত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলেন। ভুলের খেসারত এখন দিচ্ছেন।

ধুরন্ধর কলিম উদ্দিন আগে রাজধানীর একটি অখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। কয়েক বছরের মাথায় এমপি। এখন ফুল মন্ত্রী। রায়হান সাহেবের কাছে বিষয়টি আজও রহস্যময়। অথচ এই লোকটি এখন তাঁর বেয়াই। মেয়ে ও ছেলেকে সবকিছু ভাগাভাগি করে দেবেন—তেমন প্ল্যান ছিল। ড্রিম টেক্সটাইল মিলটি রিনা খন্দকারের নামে আগেই লিখে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রায়হান রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ। সেখানে নীতিবোধ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। ক্ষমতাসীনদের দাপট দেখে নিজেই চুপসে গেছেন। মেয়ের শ্বশুর কলিম উদ্দিন করিতকর্মা জনদরদি ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন! অন্তত সরল বিশ্বাসী মানুষেরা এমনই জানেন। কলিম উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সমাজবিজ্ঞান মেজর নিয়ে কোনোরকম পার হয়ে গেছেন। আশ্চর্য হয়েছিলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া দেখে। মেধার দিক থেকে কলিম উদ্দিন তাঁর ধারেকাছেও ভিড়তে পারত না। রায়হান আলাদা ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতেন। কলিম উদ্দিনের মতো লোকেরা তাঁর সমকক্ষ কোনো দিন হওয়ার কথা নয়। পরিচিত হওয়ার পর থেকেই তাঁকে খুব সংকীর্ণ মনের মনে হতো।

আজ ক্ষমতা বা সম্পদ কোনো কিছুই কলিম উদ্দিনের কমতি নেই। ছেলেটাও বাপকে ছাড়িয়ে যাবে। দিলরুবার মতামত তোয়াক্কা না করেই একটা স্বপ্নের ঘোরে তার মা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। এখন কী করবেন? মেয়েটির জন্য ছটফট করতে থাকেন। কোথায় যেতে পারে? এবার সত্যি ক্ষেপে গেলেন রায়হান স্ত্রীর ওপর। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন বাঁধ ভেঙে আসছে। তিনি তো প্রতিপত্তি ও প্রাচুর্যের মোহে ছিলেন না।

রিনা বেডরুম থেকে লিভিং রুমে এসে টিভি সুইচটি অন করতেই রায়হানের মাথায় যেন আবারও বাজ পড়ল। কোথায় মেয়ের খোঁজ নেবে, উল্টো পাশের দেশের উদ্ভট সব টিভি সিরিয়াল দেখা নিয়ে ব্যস্ত। এই ধারাবাহিক সিরিজগুলো ভয়ংকর। সন্দেহ ও সংসার ভাঙনের বীজ রোপণ করে। সবকিছুতেই ষড়যন্ত্রের কথা বলে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘মেয়ের খবর পেয়েছ?’ রায়হান খন্দকার শুধু এই তিনটি শব্দ উচ্চারণ করলেন। রিনা রায়হান সাহেবের কণ্ঠের তীব্রতা দেখে খানিকটা অবাক হন।

রিনা কোনো উত্তর দিলেন না।

রাত দশটার সংবাদ শুনতে রিমোট কন্ট্রোল হাতে নিলেন। খবরে ভেসে এল একটি মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ। রায়হান সাহেব সঙ্গে সঙ্গেই মূর্ছা গেলেন। পরদিন শহরের নামকরা হাসপাতালে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। একমাত্র মেয়ে ছাড়া আর কাউকে পাশে দেখলেন না। তাহলে সেদিন টিভিতে কী দেখেছিলেন!

একটু একটু করে মনে আসছে। নিজের মেয়ের মতো কাউকে টিভির পর্দায় দেখেছিলেন। তারপর কিছু মনে নেই।

‘আব্বু চলো তুমি-আমি আমাদের মফস্বল শহরে চলে যাই। এই বিষাক্ত শহরে আমরা আর থাকব না। টাকা-পয়সা কি জীবনের সব? আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলব আব্বু আরও কিছুদিন এখানে থাকলে।’ রায়হান খন্দকার মেয়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আসলেই তো; এই অর্থহীন প্রাচুর্য দিয়ে তিনি কী করবেন?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন