default-image

এই সেদিন এক রম্য রচনায় পড়লাম, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না সত্যি, কিন্তু বই বের করে মানুষ দেউলিয়া হতে পারে। কথাটি মনে ধরল।

গায়ক ভালো না হলে মানুষে পচা ডিম মারে, মন্দ গায়ক দেরিতে হলেও একসময় সমস্যাটা ধরতে পারে। কিন্তু নবীন লেখক ভালো না হলে সেটা তার বুঝতে পারার কোনো সরাসরি উপায় নেই। উপায় যা আছে তা বড়ই তির্যক।

সব নতুন লেখক বা কবির গৃহপালিত পাঠক থাকে। তারা নিজ গৃহে থাকতে পারে, যেমন স্বামী বা স্ত্রী, তাদের ভাই-বোন, অন্যান্য আত্মীয়স্বজন, অফিসের সহকর্মী অথবা অধস্তন, বন্ধু-বান্ধব, তারপর পাড়ার বৈশাখী মেলার আয়োজকেরা এবং প্রতিবেশীরাও থাকছেন। ‘গৃহপালিত’ বলার কারণ হলো, এদের ধরা সহজ, উড়ে পালাতে পারছে না। তাই নতুন কবি বা লেখকের পুরো মনোযোগ এই গৃহপালিত পাঠক কুলকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

প্রথমবার বই বের করবেন, সবাই খুব উৎসাহ দেখাবে। কবে পাব হাতে? আর কত দিন বাকি ভাই; বা লিঙ্গভেদে আর কত দিন বাকি আপা? যেন তার তর সইছে না। এখন আবার ফেসবুকের কল্যাণে ধাপেধাপে মানুষকে সব জানানো যায়। যেমন, আপনি স্ট্যাটাস দিলেন, মেলায় বই বেরোচ্ছে—বইয়ের নাম ‘এক কাপ রোদ্দুর’। মন্তব্য আসতে থাকল, সাধু সাধু! আমার এক কপি চাই কিন্তু। কেউ আবার মজা করে লিখল, আমার জন্যও এক কাপ। তার এক মাস পরে দিলেন প্রচ্ছদ, ঝকঝকে তকতকে। নামিদামী শিল্পীর মনকাড়া প্রচ্ছদ। তাতে আবার ফেসবুকে রইরই। আপনিও ভাবছেন, আর কে পায়! বই তো মনে হয় সুপার হিট!

বিজ্ঞাপন

তারপর বই বেরোল। বড় বড় করে স্ট্যাটাস দিলেন, ৪২০ নম্বর স্টলে ‘এক কাপ রোদ্দুর’ বইটি পাওয়া যাচ্ছে। প্রকাশক ‘সেরা বই প্রকাশনী’। ফেসবুকে অসংখ্য চেনা মানুষ জানাচ্ছে, আমি কাল মেলায় যাব, শুধু এক কাপ রোদ্দুরের জন্য। কেউ বলছে, শুক্রবারেই গিয়ে কিনে আনছি। এভাবে অনেকেই মেলা থেকে বইটি কিনল। তারপর সেটা দিলেন অনলাইন বিক্রয়কেন্দ্র রকমারিতে। তারপর কালাপানি পার করে নিয়ে এলেন সুদূর বিদেশে। এখানে বইয়ে স্বাক্ষর দিয়ে, কত কপি যে হট কেকের মতো চলে গেল ইয়ত্তা নেই। সবার ‘এক কপি রোদ্দুর’ চাই। হায়, কি যে মজার বিষয়!

দেশেও বিক্রি হয়েছে দুশ কপি। আশানুরূপ না হলেও ভাবলেন, মন্দ কী? সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা বেশ ভালোই হলো। আপনি কিছুই বুঝলেন না।

আবার খেটেখুটে, অর্থ ও বিস্তর সময় ব্যয় করে দ্বিতীয় বই বের করবেন। এবার আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই। ফেসবুকে ‘লাভ’ কমে আসছে। বইয়ের নাম ‘নিসর্গের সঙ্গে বসবাস’, পাঠক ভাবল ‘অ’। এবার প্রচ্ছদ করলেন আরেক শিল্পী। পাঠক আবার ভাব দেখাল, ‘অ’, এরাই তো করে। এই দুই প্রচ্ছদ শিল্পী মিলে বছরে যদি দু হাজার প্রচ্ছদ করে, তাতে পরিচিত সবারই একটা করে প্রচ্ছদ তারা করবে, এতে হইচই করার কি আছে?

আবার ধরুন আপনি নিজেই প্রচ্ছদ আঁকলেন, সেখানে প্রথমে যে তুলকালাম, সেটা দ্বিতীয়বারে নেই। ‘আপনি আগেরবার আঁকছিলেন। তো?’

তারপর বের হয়ে গেল দ্বিতীয় বই। তবুও কোনো উচ্ছ্বাস নেই। আবার কালাপানি পার করে নিয়ে আসলেন। তাতেও কারও তেমন ট্যা-ফু নেই। বইয়ের প্রসঙ্গটা আগে যতবার ও যতক্ষণ এসেছে, এবার তার সিকি ভাগও আসছে না। কেন? আপনার মাথায় ঢুকছে না। দেশেও এবার বিক্রি হলো মাত্র ২৩ কপি। হা ভগবান! গতবারের সেই ২০০ লোক গেল কোথায়? স্টল চিনতে পারেনি নাকি?

ঘটনাটা এ রকম। প্রথমবার বিভিন্ন কারণে চেনা মানুষদের উৎসাহ থাকে। জানতে চায়, কী লিখেছেন, কেমন লিখেছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আপনার সামাজিক অবস্থানের জন্যও হয়তো অতিরিক্ত উৎসাহ তারা দেখাতে পারে। তারপর যখন বই হাতে পেয়েই গেল, তখন দুটি ঘটনা ঘটে। এক প্রকার ক্রেতা আসলে পাঠক নন, তারা বইটা দুই লাইন পরে রেখে দেন, কাল পড়বেন বলে। সেই কাল আর কখনো আসে না। তখন তার কাছে বইটা বোঝা মনে হয়। বইটা একটা কাজ। অথবা এমন হতে পারে যে, তার পড়ার অনেক ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সময় করতে পারেননি। তখন সে ঠিক করে, পরেরবার বই প্রসঙ্গে কথাই বলবে না।

আরেক ধরনের ক্রেতা আসলেই পাঠক, তবে আপনি যা লিখেছেন সে তা পড়ে না। ধরুন, আপনি পরাবাস্তব কবিতা লিখেছেন, সে আসলে কবিতা পড়তে ভালোবাসে না, পরাবাস্তব তো নয়ই। কাজেই তার এ বইটা কিছুতেই ভালো লাগবে না। সবাই তো শামসুর রাহমানও পড়ে না।

আর শেষ যেই সম্ভাবনা, সেটাই লেখকের জন্য কাল। হয়তো বই মোটেও ভালো হয়নি। সামনাসামনি কেউ বলতেও পারছে না, কারণ সবাই গৃহপালিত পাঠক। একে যদি মঞ্চে গান গাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে পচা ডিম খাওয়ার মতো পরিবেশনা হয়েছে। কিন্তু লেখককে পচা ডিম মারার উপায় নেই। কারণ, বই এক পৃষ্ঠা পড়ে বন্ধ করে রাখলেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে, লেখকের ওপর ডিম মারার মতো ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে না। তদুপরি লেখক খুবই বন্ধু মানুষ। তখন পাঠক ঠিক করে, বই নিয়ে আর উৎসাহই দেখাব না, কথাই বলব না। পরের বার আপনি যখন ফেসবুকে ‘নিসর্গ’ বইটার স্ট্যাটাস দিলেন, সে ভাবছে, ‘খাইছে রে, আবার বই?’ এই নিরুৎসাহ ভাবটাই পচা ডিম। তার মানে—‘হচ্ছে না, লেখা ভালো হচ্ছে না।’ যা হোক, আর অন্যান্য অনেক কিছুর মতোই, একজনের লেখা ভালো হলো কি মন্দ হলো, সেটা নিজে নিজে বুঝতে পারা বেশ দুরূহ ব্যাপার, যা নির্ভুল বিজ্ঞান বা এক্সাক্ট সায়েন্স নয়। এমনকি তার ধারে–কাছেও নয়। সবাই নিরুৎসাহিত করছে, কিন্তু আপনি হয়তো ফ্রানৎজ কাফকার মানের লেখক। কে জানে?

বিজ্ঞাপন

ফেসবুকের পোস্ট আর তার লাইক কোনো মান দণ্ড নয়। শুধুমাত্র সাংখ্য মানে কোনো কিছু নিরূপিত হয় না। কাজেই ভুলভাবে প্ররোচিত হবেন না। আরেকটি কথা, তরুণেরাই প্রকৃত পাঠক। যারা চাকরি-সংসারের চক্করে আটকা পড়েছেন, তাদের সিংহভাগ আর পাঠক নন। দু–চারজনের এখনো ইচ্ছা থাকলেও তাদের জন্য সময় সুযোগ করে ওঠা সহজ হয় না। বই কখনো আশপাশের গৃহপালিত পাঠককে মাথায় রেখে লেখা বা প্রকাশ করা উচিত নয়। কাউকে এটা পড়তে বা কিনতে জোরাজুরি করা ঠিক নয়। প্রত্যেক ধারার (genre) বইয়ের জন্যই একনিষ্ঠ পাঠক আছে। সেই পাঠক আপনার অফিসের এহসান সাহেব না-ও হতে পারেন। তেমন আশা করাও ঠিক নয়।

আজকে ফেসবুকের কল্যাণে যত কবি-সাহিত্যিক বেরিয়েছেন, তাতে আমরা সবাই কমবেশি গৃহপালিত পাঠক বা ‘ভুক্তভোগী’। দিনকে দিন জীবন জটিল হয়ে যাচ্ছে। যেমন, আগে লেখক বা কবিকে উৎসাহিত করাটাই ছিল সুধীজনের কাজ। এখন মনে হচ্ছে কাজটা দুই ভাগে ভাগ হয়েছে, উৎসাহিত করা ও নিবৃত্ত করা। আর সেখানেই এসে পড়ে আধুনিক জীবনের দুশ্চিন্তা। একে কী উৎসাহিত করব, না নিবৃত্ত করব? শেষে দেউলিয়া হয়ে যাবে না তো আবার?

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন