default-image

গাড়ি পার্কিং করতে কিছুটা সময় নিয়ে নিল শাফকাত। চার ব্লক দূরে একটা ফ্রি পার্কিং পাওয়ায় কোনো ভাবনা না করেই রেখে দিল। আকাশ ফকফকে। বৃষ্টির কোনো আলামত নেই। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া যাবে। সব সময়ই জ্যাকসন হাইটসের দোকানগুলোতে ভিড় লেগে থাকে। হাঁটলেই পরিচিত মুখ পাওয়া যায়। ইদানীং শাফকাতের বেলায় তেমনটা ঘটে না। অনেক দিন ধরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। তার সঙ্গে অন্যদের বিস্তর ফারাক। পরিচিতির পরিধিও কমে এসেছে।

বাজারের লিস্টে তেমন কিছু ছিল না। কদিন আগে কসকো থেকে শপিং করার সময় ‘রোস্টেড পাইন অ্যাপল অ্যান্ড হ্যাবানারো’ নামক একটা জেলি কিনে এনেছিল। দারুণ স্বাদ। ম্যাক্সিকান রেসিপিতে বানানো। মেয়ে বলেছিল, ‘বাবা তোমরা তো ঝাল পছন্দ কর। এটা নিয়ে নাও। আমার স্প্যানিশ বান্ধবীরা খুব পছন্দ করে। বেশ দাম।’

শাফকাত জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি লাইক কর?’

-হ্যাঁ বাবা, তবে ঝাল। তোমরা অবশ্যই পছন্দ করবে।

বাসায় এনে দেখল খুব টেস্টি। ইনগ্রেডিয়েন্ট দেখে গিন্নিকে বলল, ‘এইটা তো আমরাও বানাতে পারি।’

বিজ্ঞাপন

রোস্টেড পাইন অ্যাপল, ম্যাঙ্গো, লেমন জুস, অ্যাপল সিডার ভিনেগার, গার্লিক, জিঞ্জার, হট স্প্যানিশ চিলি, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি ও আরও কিছু উপাদান। ওভেনে দিয়ে রোস্ট করে ফেলল। তারপর চিনির শিরা দিয়ে পুরোপুরি সুস্বাদু আচার বানিয়ে ফেলে।

এমনিতেই সে নিয়মিত আনারস খায়। খুব ভালো লাগে। আনারস কাঁচা মরিচ ও প্রচুর রসুনের সঙ্গে সামান্য লবণ মিশিয়ে খেতে দারুণ। দেখাদেখি মেয়েও খেতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে ওর জন্য কাঁচা মরিচগুলো ফেলে দিতে হয়। করোনাকালে এই অভ্যাসগুলো খুব কাজে লেগেছে। ভাইরাস ধারেকাছেও আসতে পারেনি। আপাতত সেই ধারণা নিয়েই আছে।

নতুন রেসিপি পেয়ে শাফকাতের মনে হলো ভালোই হয়েছে। এখন একসঙ্গে বানিয়ে অনেক দিন খাওয়া যাবে। কিন্তু জেসমিন, অর্থাৎ জেটালির মেয়ে খেয়ে বলল, ‘খালু, দারুণ হয়েছে। তবে একটু ঝাল। গলায় ধরে। করোনা বা ফ্লু-এর জন্য পারফেক্ট। পাঁচফোড়ন দিলে আরও টেস্টি হতো।’

জেসমিন পাঁচ মাস পর সেদিন প্রথম বাসার ভেতর এসেছিল। আগে কয়েকবার তাদের বাগানের সবজি নিয়ে এসেছে কিন্তু ঘরে ঢোকেনি।

শাফকাত ইতিমধ্যে দুটো আনারস ডিপ ফ্রিজে কেটে রেখে দিয়েছিল। কাজ না থাকায় ইদানীং অনেক সময় পাওয়া যায়। পাঁচফোড়ন কিনতেই আজ জ্যাকসন হাইটসে আসা। তারপরও মাছ, মাংস ও সবজিসহ আরও অনেক কিছু কেনাকাটা হয়ে গেছে। প্রথমে এসব কেনার ইচ্ছা ছিল না। বারবার তো আসা যাবে না।

ঝড় শুরু হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। ছাতা আনেনি। দোকানের কার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল অন্য দোকান থেকে আরও কিছু কিনতে যাবে কিনা। এমন সময় একজন এসে বলল, ‘আপনাদের এগিয়ে দিয়ে আসি, আমি এখানে কাজ করি।’

-আপনি বাঙালি? পঞ্চাশোর্ধ্ব লোকটিকে শাফকাত জিজ্ঞেস করল।

বাঙালি বুঝতে পেরে আর না করতে পারেনি। যদিও ভেবেছিল বাজারগুলো নিজেরাই নিয়ে যাবে।

শাফকাতকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক তাঁর ব্যক্তিগত গল্প বলতে লাগলেন। শাফকাত সত্যিই লজ্জিত হয়ে পড়ল। এমন একজন ভদ্রলোক তাঁর বাজারের কার্ট ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন দেখে। এখানে এসে আমরা কত কিছু সাবলীলভাবে করতে পারি; অথচ দেশে এমন কল্পনাও করতে পারি না।

আমেরিকায় কোনো কাজ ছোট নয়। ভদ্রলোকের নিজের সম্পদের সঙ্গে তুলনা করলে শাফকাত কিছুই না। এমনকি আমেরিকার অনেক প্রবাসীও লজ্জা পাবেন। গুলশানের কাছে বাড্ডায় কয়েক বিঘা জমি। অনেকগুলো অ্যাপার্টমেন্টের মালিক। হাঁটতে হাঁটতে গিন্নির সঙ্গেও গল্প করছিলেন। শাফকাত শুনছিল। ছেলে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজনেসে মাস্টার্স করে আমেরিকায় এসেছে। আবার এখানে পড়াশোনা শুরু করেছে। ছেলেকে সাহায্য করতে তিনি এখানে এই কাজ নিয়েছেন। দোকানের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে আগে সাপ্তাহিক ৪০০ ডলার বেতন পেতেন। এক নাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে। তাই কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। বললেন, ‘স্বাস্থ্য আগে।’ এখন শুধু কার্ট ঠেলে যা পান। ছেলে দুদিন কাজ করে। তাই নিয়ে চলে। গিন্নিও অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন। পায়ে ব্যথা তবুও শারীরিক পরিশ্রম করতে তাঁর দ্বিধা নেই। বোঝা গেল শালির বদৌলতে তাঁদের গ্রিন কার্ড হয়েছে। সম্ভবত তাঁদেরই বেসমেন্টে থাকেন।

শাফকাতের মাথা ঘুরাতে লাগল। সন্তানের জন্য এত ত্যাগ! এই সন্তান যদি কোনো দিন অবাধ্য হয়? তাঁর তো প্রচুর সম্পদ রয়েছে। কিছু বিক্রি করে এখানে বাড়ি কেনা যায়, ব্যবসা করা যায়। কিন্তু আমরা তা করি না। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিই। আমরা কিছু হারাতে চাই না—অনেক দিন বাঁচব এই আশায়।

সাড়ে তিন ব্লক হাঁটার পর তাঁরা গাড়ির কাছে পৌঁছান। শাফকাত ভদ্রলোককে কী টিপস দেবে, খুব চিন্তায় পড়ে গেল। একটু আগে কথা প্রসঙ্গে ভদ্রলোক বলছিলেন, ‘এই নেন দশ ডলার আংকেল’—অনেকেই এভাবে নাকি তাঁকে টিপস দেয়।

বিজ্ঞাপন

এই করোনাকালে শাফকাতের কাজের অবস্থা বলার মতো নয়। কাজে যায় না। তবুও প্রতি মাসে গাড়ির ফুল ইনস্যুরেন্স, ব্যাংকের পেমেন্ট, গ্যারেজ ও বাড়ি ভাড়াসহ প্রায় চার হাজার ডলার লাগে। বাকি খরচপাতি তো আছেই। আন-এমপ্লয়মেন্ট বাবদ সর্বনিম্ন একটা অ্যামাউন্ট পায়। তা দিয়ে চলার প্রশ্নই ওঠে না। গাড়ির ঋণ বাবদ ব্যাংকের ইনস্টলম্যান্টটিও এই ডলার দিয়েও হয় না। এই কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু অবস্থা যা, তাতে ব্যবসা একেবারে শূন্যের কোটায়। কোনো অগ্রগতি হবে—এমন আশাও নেই।

ভদ্রলোক ততক্ষণে বাজারগুলো তাঁর গাড়ির ট্রাংকে রেখে দিয়েছেন। শাফকাত পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। একবার ভাবল, অনেক টিপস দেবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো এই ভদ্রলোককে করুণা করার মতো যোগ্যতা কি তাঁর আছে? তাঁর অবস্থা জানলে উল্টো তাকেই করুণা দেখাবেন।

প্রচণ্ড বৃষ্টি তখন শুরু হয়ে গেছে। গিন্নি গাড়িতে বসে নামাজ পড়তে গেলেন। ভদ্রলোক ট্রলি নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে আবার দোকানে ফিরে গেলেন অন্য আরেকজন কাস্টমারের আশায়। শাফকাত আনমনে তাঁর পথের দিকে চেয়ে রইল। পৃথিবীটা কারও কাছে কত সুন্দর, স্বপ্নময়। এই স্বপ্নই মানুষকে বাঁচার প্রেরণা জোগায়। গিন্নি নামাজ শেষে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত টিপস দিয়েছ?’

শাফকাত গিন্নির কাছেও ব্যর্থতা লুকাল। সঠিক কথা বলতে পারেনি। জীবনটাই যেন লুকোচুরি।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন