default-image

অফিস থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পা ফেলতেই ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। একটু ঝড় বৃষ্টির আশঙ্কা থাকলে তো কথাই নেই। এই হচ্ছে ছোট্ট শহরের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কার্তিকের শেষ, তাই দিনগুলো ছোট হয়ে আসছে। এখন ছয়টা বাজতেই সন্ধ্যা নেমে যায়। অন্ধকারে পা টিপে টিপে বাস স্ট্যান্ডে চলে এলেন খায়রুল সাহেব।

তারপর বাসের অপেক্ষায় ম্যারাথন সময় ক্ষেপণ। এক সময় বাস এল, কিন্তু বাসে প্রচণ্ড ভিড়। গা বাঁচিয়ে ওঠার জো নেই। এ ধরনের ভিড়ে পকেটমারদের উৎপাত ভীষণ বেড়ে যায়। কিন্তু কী আর করা। বাসায় তো ফিরতে হবে। খায়রুল যতক্ষণ অফিসে বা বাইরে থাকেন, নীলিমা বেচারী বাসায় একা থেকে থেকে বের হয়ে যান।

কদিন হলো, খায়রুল তার মোবাইলে রবীন্দ্রসংগীত অ্যাড করেছেন, তাও মাত্র দু লাইন। রবীন্দ্রসংগীত নীলিমার খুবই পছন্দ। খায়রুলকে বলে দিয়েছে, যখন আমি ফোন করব, সঙ্গে সঙ্গে তুমি ফোন ধরবে না। দুটো লাইন শেষ হলে তুমি ফোন ধরবে। বেশ কয়েক দিন হয়, তারা দোতলার একটি ফ্ল্যাট নিয়েছেন। কিন্তু নীলিমা ভীষণ খুঁতখুঁতে। ফ্ল্যাটের তিন পাশে তিনটা জানালা, কিন্তু দক্ষিণে একটা জানালা নেই বলে প্রতিদিন কথা শোনায় খায়রুলকে। বলে দোতলা না হয়ে তিন তলায় ফ্ল্যাট নিলে বাড়তি একটা জানালা পাওয়া যেত। খায়রুল কথা বলে না। তিনি জানেন, কিছুক্ষণ বকবক করে নীলিমা অন্য প্রসঙ্গে যাবে।

বিজ্ঞাপন

মন্থরগতিতে বাস চলছে, বাদুড়ঝোলা হয়ে অধিকাংশ যাত্রী গন্তব্যে চলেছেন। ইতিমধ্যে খায়রুলের মোবাইল বেজে উঠে। নীলিমার ফোন ভেবে তিনি আর ফোন ধরেননি। রিং বেজে বেজে ফোনটা বন্ধ হয়ে যায়। মিনিট পরেই আবার ফোনটি বেজে উঠে। পাশে থেকে দু–একজন যাত্রী বিরক্তির চোখে তাকাচ্ছেন তার দিকে। এবার ফোনটা পকেট থেকে বের করে দেখেন নীলিমার ফোন। অন করতেই ঝাঁজালো কণ্ঠে নীলিমা বলে, আমি কি শুধু গান শুনতে তোমাকে ফোন দিচ্ছি!

খায়রুল চাপা কণ্ঠে বলেন, আহা নীলু, আস্তে করে বলো।

–কী হয়েছে, আর কী হবে—কোত্থেকে একটা উটকো ঝামেলা নিয়ে এসেছ। ওই মহিলা এখন বলছে, সে ভীষণ ক্ষুধার্ত। ইলিশ মাছ ভাজি করে তাকে ভাত দিতে। এখন ইলিশ আমি পাব কোথায়।

–আহ্ নীলু, ওকে কোন রকম ম্যানেজ করো না। বাবলির মাকে বাজারে পাঠিয়ে দেখ না, ইলিশ পাওয়া যায় কিনা। রাত তো বেশি হয়নি। ইলিশ যদি পাওয়া না যায়, রুই মাছ নিয়ে আসুক।

নীলিমা আবার গলা উঁচু করে বলে, হ্যাঁ, রাত–বিরাতে বাবলির মায়ের ঠেকা পড়েছে মাছ বাজারে যাবে।

খায়রুল অসহায়ের মতো আশপাশে তাকান, দেখেন কেউ আড়ি পেতে শুনছে কি না। তারপর আবার বলেন, নীলু ওই মহিলাকে একটু বাড়তি যত্নআত্তি করো। বিষয়টা খুবই জটিল, যার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলছি সবাই বলছে, বিষয়টা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। যেভাবেই হোক লোকটার মুখ বন্ধ করে দিন। যদি কোন কিছু হয়ে যায়, তবে থানা-পুলিশ, মামলা–মোকদ্দমা, কীভাবে মরল, কে মারল হাজারটা প্রশ্ন সামনে এসে হাজির হবে। আমি হাসপাতালে ফোন করেছিলাম, নার্স বলল, লোকটি এখনো ঘুমাচ্ছে। সকালে ডাক্তার আসবে, এক্সরে করবে। তারপর কটা হাড় আছে, কটা ভেঙে গেছে তা নির্ধারণ করবে।

নীলিমা আবার বলে, তাতে আমাদের কী যায় আসে। আমরা তো ওঁকে মারিনি, বেটা চুরি করতে এসে ফেঁসেছে।

রাস্তায় ভীষণ জ্যাম, রিকশা আর যানবাহনে পুরো রাস্তা একাকার হয়ে আছে। এতক্ষণে বাসের মধ্যে ভিড় একটু কমেছে। খায়রুল চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিলুকে বোঝাবার।

নীলিমা একটু গলা নামিয়ে বলল, ঘটনা কী, একটু খুলে বলো তো।

খায়রুল বলেন, ঘটনা তো একটা হয়েই আছে।

বেটা চোর আমাদের তিন তলার কার্নিশ বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করছিল, শব্দ পেয়ে আমরা যখন বের হলাম, তখনই চোরটা লাফ দিল। তারপর দেখলাম, সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে। তাই তো তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। এখন যে ঝামেলাটা হয়ে গেছে, তাতে প্রচুর টাকা খরচা করা ছাড়া বেরিয়ে আসা যাবে না। তার ফ্যামিলিকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে হবে, পুলিশকে ও টাকা দিতে হবে।

খায়রুল বলে চলছেন, তারপর হাসপাতালের বিল। তার চেয়ে তুমি যদি লোকটার বউয়ের সঙ্গে একটা সমাধানে যেতে পারতে, তা ভালো হতো। এজন্য তো তার বউকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা। ওই মহিলা যদি হাসপাতালে থেকে স্বামীর পাশে বসে কান্নাকাটি করে, তবে পাড়ার মাস্তান, সমাজকর্মী, সাংবাদিক সবাই এসে ভিড় জমাবে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে।

নীলিমা আবার ঝাঁজিয়ে উঠল, পা ভাঙুক আর পাঁজর ভাঙুক, তাতে তোমার কি! পুলিশকে একটা কল করতে, পুলিশ এসে লোকটাকে নিয়ে যেত।

–আহ্, আস্তে কথা বল। ওই মহিলা শুনতে পাবে।

–মহিলা শুনতে বয়েই গেছে। এসে দেখো, ড্রয়িং রুমে বসে টিভি খুলে বসে আছে। যেন আমাদের পরম আত্মীয়। এমন ভাব, যেন এটা তার স্বামীর জন্য নিত্যদিনের ঘটনা। চোরের বউ বলে কথা।

খানিক পরে খায়রুলের কথায় নীলিমা একটু নরম হয়ে ওই মহিলার সঙ্গে ভাব জমাবার চেষ্টা করে বলল, তোমার নাম কি?

বিজ্ঞাপন

টিভি থেকে চোখ না তুলেই বলল, আমারে কিছু কইলেন আপা। একটু দাঁড়ান সিনটা দেইখ্যা লই। আমি আবার নাটকের পাগল। ক্ষণিক পরে বলল, আমার নাম বদনি। আরও একটা নাম আছে। তয় মা–বাবা আদর কইরা বদনি বলেই ডাকত।

চোরের বউ, তার এত ভালা নাম দিয়া কি অইব আপা। নীলিমা বদনির যুক্তিতে মাথা নাড়ায়, তারপর বলে, চা খাবে বদনি! হ্যাঁ আপা, তয় আমি আবার আদা তেজপাতা ছাড়া চা খাই না। হুনছি, আদা তেজপাতা শরিলের জন্য উপকারী।

কাজের বুয়া বাবলির মা অনেক আগেই চলে গেছে। যাওয়ার সময় নীলিমাকে সাবধান করে দিয়েছে। বলেছে, ওই মহিলার দিকে খেয়াল রাইকেন আপা। ওর মতিগতি ভালা না। চোরের বউ কি না।

নীলিমা চা বসাল শুধু তেজপাতা দিয়ে, আদা ছিল না তাই। বদনিকে চা দিয়ে নীলিমা বলে, আচ্ছা বদনি, তোমার স্বামীর অবস্থা এখন কেমন?

বদনি বলে, ও তো ভালা আছে। মাথা ফাইটা একটু রক্ত বারইছে, এইটা তার জইন্যে তেমন কিছু না। চুরি বদমাইশি করলে এমন তো হইবোই। ঠিক বলি নাই আপা। ওরে বুজাইয়া কইলাম, চোর হইসনা, ডাকাইত হো। মাইনসে আমারে সরমান দিয়া কথা কইবো। কেউ চুরের বউ কইব না। হে আমার কথা কানেই নিল না। তয় আমারে বিয়া করণের আগে নাকি ডাকাইত দলে যোগ দিছিল। হাফ পেন্ট বাহিনী ডাকাইত দলে। পরে রেবের মাইরের ছুটে দল গেল ভাইঙা—বলেই বদনি অট্টহাসিতে লুটিয়ে পড়ল।

ইতিমধ্যে খায়রুল বাসায় এলেন। এসে দেখেন, বদনি ড্রয়িংরুমে সোফায় পড়ে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। নীলিমা আরেক সোফায় বসে ঝিমোচ্ছে। ভাবখানা এমন, বদনি নামক ওই মহিলাকে পাহারা দিচ্ছে। খায়রুল দেখে বললেন, ওঁ আর পালাবে না। নীলু তুমি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়। আমিও খাওয়া সেরে আসছি। তারপর সকালে দেখা যাবে।

পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে খায়রুল চলে গেলেন হাসপাতালে। বদনি ঘুম থেকে উঠে দেখে, বাবলির মা এখনো আসেনি। নীলিমাও ঘুমোচ্ছেন। বদনি রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের সরঞ্জাম খুঁজে বের করে নিজেই চুলোয় চা চাপাল। নীলিমা ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে দেখেন, বদনি চায়ের ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছে।

দুজনে চা খেতে খেতে নীলিমা এবার অন্য প্রসঙ্গে কথা ওঠাতে চাইলেন, ভাবলেন অভাবী মানুষ কিছু টাকাপয়সা দিয়ে যদি বদনিকে বিদায় করা যায় সেটাই মঙ্গল।

নীলিমা বলে, আমি কিছু টাকা তোমাকে দেব বদনি, সেই টাকা তোমার স্বামীর চিকিৎসার জন্য খরচ করিও।

তারপর নীলিমা ভাবতে লাগল, প্রথমে দু শ টাকা থেকে শুরু করবে, আবার ভাবছেন দু শ টাকা মনে হয় কম হবে।

ইতিমধ্যে বদনি বুঝে গেছে, সহজ উপায়ে টাকা রোজগারের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বদনি জানতে চাইল, বিলটুর বাপ (তার স্বামী) কেমনে পড়ছে আপা ওই স্পটটা দেখন যাইব?

নীলিমা একটু বিরক্ত হলো, স্পট দেখে তুমি কি করবে!

বদনি বলে, আপা আফনি না বলতাছেন চিকিৎসার খরচাপাতির কথা। এখন স্পটটা দেখলে বুঝতাম কত উচা থন মানুষটা পরেছিল। কী পরিমাণ জকম হইতে পারে। তা না দেখলে টেকার পরিমাণ কেমনে কই আপা। হাত ভাঙার এক রেট, পাও ভাঙার অন্য রেট, ঠিক বলি নাই আপা।

নীলিমা ভাবছে, এই মহিলা পাগল না অতি চালাক। দরজাটা খুলে দেখালেন নীলিমা। এই যে বারান্দা দেখছ তার ওপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে যায় সে। এই মুহূর্তে শোয়ার ঘরে ফোন বেজে উঠে। অন্য প্রান্ত থেকে খায়রুল বলেন, নীলু একটা দারুণ সুখবর আছে।

নীলিমা বলে, কি খবর!

–আমি অফিসে যাওয়ার পথে হাসপাতাল গেলাম। গিয়ে দেখি ডাক্তার সব টেস্ট করে রেজাল্ট পেয়ে আমাকে বললেন, আপনার রোগীর অবস্থা ভালোই। তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন।

তারপর ওই ব্যাটাকে এক শ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, এই যাত্রা বেঁচে গেলে, পুলিশে দিলাম না। কথাগুলো শেষ করেই জিজ্ঞেস করলেন খায়রুল, ওই মহিলা কি করে নীলু! ওঁকে তাড়াতাড়ি বিদায় কর।

দুজনের কথোপকথন শেষ না হতেই নীলিমার কানে এল ওপর থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ। ঘর থেকে দৌড়ে বের হন নীলিমা, দেখেন ঠিক একই জায়গায় পড়ে আছে বদনি। ডান হাতটা কেটে রক্ত পড়ছে।

নীলিমাকে দেখে বলছে, আপা পইরা গেছি বিলটুর বাপের মতন। তয় লাফটা ঠিকমতো হলো না। টেকার পরিমাণটা কেমনে কই। ঠিক বলিনি আপা!

মন্তব্য পড়ুন 0