default-image

থাইল্যান্ড যাওয়া অবধি আমার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ঘুরপাক খেত ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রচণ্ড নাড়া দিয়ে গেছে পৃথিবীকে। আজও মানুষের মন থেকে যুদ্ধের বিধ্বস্ততা, ভয়াবহতা, নৃশংসতা, তাঁর ক্ষরণ, দহন, বেদনা মুছে যায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যাঁরা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাঁদের কেউই হয়তো আজ আর নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সরাসরি অভিজ্ঞতা হয়েছিল যাঁদের, তাঁদেরও কমসংখ্যকই আমাদের মাঝে আছেন, সে সব ভয়াবহ দিনের শিহরণের কথা বলতে। কিন্তু আমরা জেনেছি, জেনে আসছি অসাধারণ সব ফটোগ্রাফ শিল্পীদের তোলা আলোকচিত্র থেকে, প্রধানত হলিউডে নির্মিত চলচ্চিত্র ও বিখ্যাত সব লেখকের ইংরেজি ভাষায় লিখিত উপন্যাস থেকে। এসবের বাইরেও আরেকটি নান্দনিক শিল্প মাধ্যম চিত্রাঙ্কণ থেকে।

আমার কৈশোরউত্তীর্ণ সময়ের কৌতূহল থেকে ক্রমশ পাঠ্য ও পাঠ্যবহির্ভূত জ্ঞান জগতের উন্মীলন যখন ঘটছে, যৌবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে, তখন আমরা পড়ে ফেললাম বিশ্বযুদ্ধের লোমহর্ষক ভয়াবহতা ও বীভৎসতা, বিশেষ করে জানলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা, মানুষের নির্মমতা এবং অবশ্যই এক নারকীয় পৃথিবীর হত্যাযজ্ঞ ও বীভৎসতা।

লিও টলষ্টয়ের বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, এরিক মারিয়া রিমারকের লেখা বহুল পঠিত ও সমাদৃত গ্রন্থ ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ অ্যান্থনি ডোয়্যের রচিত ‘অল দ্য লাইট ইউ ক্যান নট সি’ জোসেফ হেলারের ‘ক্যাচ-২২’ আমাদের যুদ্ধ চিনিয়েছে। আমরা আমাদের কিশোর বয়সে অনেক দিন বাসায় না জানিয়ে, স্কুল ও পরবর্তীতে কলেজ ফাঁকি দিয়ে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখতাম ইংরেজি নামকরা সব সিনেমা। সে সময় আমাদের পরিচয় হয় দুনিয়া তোলপাড় করা সিনেমা ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। একে একে রবার্ট রোসোলিনি পরিচালিত ‘রোম ওপেন সিটি’, ‘অ্যাপোকেলিপস’, দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স, ‘প্লাটুন’ প্রভৃতি বিখ্যাত সব সিনেমা দেখে যুদ্ধকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। চিত্রাঙ্কনের শুরুর ইতিহাস অনেক প্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই শুরু চিত্রাঙ্কনের যাত্রা। চিত্রশিল্পীরা সময়ের ক্ষতচিহ্ন এঁকে রেখেছেন অমর সব মূল্যবান চিত্রদলিলে। তারই প্রতিফলন দেখতে পাই ওয়ার্ল্ড ওয়ার অফিশিয়াল আর্টিস্ট ছাড়াও খ্যাতিমান আর্টিস্ট এডওয়ার্ড আর্ডিজোন, এডওয়ার্ড ব্যাডেন, ডেভিড বমবার্গ, এরিক কেনিংটনের বিখ্যাত সব ছবি।

বিজ্ঞাপন

এসব বই পড়া, সিনেমা দেখা, ছবি ও চিত্র দেখা ও মর্মে গাঁথা অভিজ্ঞতা নিয়ে গিয়েছিলাম থাইল্যান্ড। নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে একদিন ও ফেরার পথে থাইল্যান্ডে ছয় দিন অবকাশযাপন। সঙ্গী ছিলেন আমার তদানীন্তন বস প্রয়াত গাই গোল্ডমিয়্যার। সারা থাইল্যান্ড চষে বেরিয়েছিলাম প্রায়। মনের মধ্যে ছিল ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’। একদিন সকাল সাতটায় রওনা হলাম। ব্রিজে ওঠার খানিকটা আগে প্রথমে যেখানে গিয়েছিলাম, সে এক কঠিন, মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা। কাঞ্চন বুড়ি ওয়ার মিউজিয়াম। ওখানে না গেলে বিশ্বযুদ্ধের স্বরূপ সত্যিকারভাবে জানা হত না। জাপান অধিকৃত ব্রিটিশ সেনাদের ওপর নির্মম ও পৈশাচিক অত্যাচার ও হত্যার যে ভয়াবহ রূপ বিশেষ করে আলোকচিত্রগুলোতে প্রদর্শিত হচ্ছে, তা দেখে আমি অবসেসড্ হয়ে পড়েছিলাম। সেখান থেকে গিয়েছিলাম ওয়ার সিমেট্রিতে। সবুজ ঘাসের বিস্তারে, কী চমৎকার নিসর্গ রূপ সৌন্দর্যে শায়িত আছেন যুদ্ধে নিহত সব যোদ্ধারা। এই সৌন্দর্য আমার কাছে মলিন মনে হল।

যুদ্ধে নিহতদের নাম পড়লাম, বেশির ভাগ আইরিশ। কিছু ভারতীয় সেনার নামফলকও দেখেছিলাম। খুব কম বয়সী। মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এরপর ঐতিহাসিক কাওয়াই সেতুর ওপরে মাঝখানে গিয়ে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেও আর উৎসাহ ছিল না। অনতিদূরে নদীর ওপারের দিকে জলের ভেতরে কয়েকটি হাতির জলকেলি দেখেও মন শান্ত হয়নি।

কেবলই ওয়ার মিউজিয়ামে দেখা ব্রিটিশ ও আইরিশ বন্দী সেনাদের কথা—যারা নির্মাণ করেছিল এই ব্রিজ, তাদের বন্দীজীবনের দুঃসহ যন্ত্রণা, তাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার, পীড়ন ও হত্যার দৃশ্যের ফটোগ্রাফগুলো চোখের সামনে ভাসছিল আর আমার চোখ জোড়া জলে ভেসে যাচ্ছিল। থাইল্যান্ড থেকে নিউইয়র্কে ফেরার পরও ওই ফটোগ্রাফ ও বিষয় আমাকে অবচেতনে বিষাদাক্রান্ত রেখেছে দীর্ঘদিন।

বিশ্বযুদ্ধ দেখিনি। মহামারির ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করিনি। কিন্তু আমাদেরই জীবনকালে করোনা মহামারি (কোভিড-১৯) দেখতে হলো। সে যে কি নির্মম–নির্দয় মৃত্যুর ছোবল! মৃত্যুই যেন ছিল কেবল সত্য, আর সব মিথ্যা! আতঙ্ক, নির্ঘুম জীবন, অবিশ্বাস, ঘৃণা! এসব যে কি নির্মম বাস্তবতা হয়ে যুক্ত হলো আমাদের দৈনন্দিনতায়! আবার এসবের মধ্যেই মানবতার কি অপূর্ব অভূতপূর্ব প্রকাশ! প্রাণকে হাতের মুঠোয় বন্দী করে, জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে মানুষই কাঁধে কাঁধ দিয়ে এগিয়ে এলেন মানবতার ডাকে। ডাক্তার, নার্স, হাসপাতালকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স কর্মী, অগ্নিনির্বাপণকর্মী, পুলিশ বাহিনী, সেনা সদস্য, সংবাদ কর্মী, এসেনশিয়ালকর্মী, সরকারি নানা সংস্থার কি বিপুল উদ্যম, উদ্দীপনায়ভরা মানুষ এগিয়ে গিয়েছিলেন মানুষকে বাঁচাতে!

শঙ্কা, আতঙ্ক কাটেনি, করোনা চলে যায়নি। আমেরিকায় বিভিন্ন স্টেটে, পৃথিবীর নানা দেশে এখনো চলছে করোনার সংক্রমণ ও বিস্তার। মরছে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা রেখে বাবা। চলে যাচ্ছেন মা প্রাণপ্রিয় কোলের শিশু সন্তান ছেড়ে। তরুণ সন্তান মা-বাবার স্বপ্ন মিথ্যা করে দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে একেবারে। আমরা আশাবাদী, হয়তো নিকট ভবিষ্যতে একদিন আমরা এই শঙ্কা-সংকট মুক্ত হব। করোনাভাইরাসও হয়তো বিদায় নেবে। ক্ষত চিহ্নগুলো হয়তো থাকবে আরও কিছুকাল। কিন্তু থেকে যাবে চিত্রাঙ্কন। থেকে যাবে আলোকচিত্র। প্রদর্শনী হবে। প্রকাশিত হতে থাকবে নানা মাধ্যমে বারবার।

করোনাক্রান্তিকালের এই দুঃসহ স্মৃতিগুলো ছবি ও চিত্রের মধ্যে দিয়ে বেদনা মূর্ত হয়ে আমাদের হারানো স্বজনদের কথা বলবে।

বিজ্ঞাপন

ফটোগ্রাফির জনক ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ নিসেফোর ১৮২২ সালে সর্বপ্রথম ফটোগ্রাফ তৈরি করেন। এটি ছিল পোপ সপ্তম পিউসের একটি প্রতিকৃতির ফটোগ্রাফ। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ফটোগ্রাফ কেবল মিলন, আনন্দের ছবিই ধরে রাখেনি, কত কত ঐতিহাসিক ঘটনা, বিয়োগ ব্যথার সাথি হয়েছে! স্প্যানিশ ফ্লুর কথা আমরা উদ্ধৃত করতে পারি। ১৯১৮ও ১৯১৯ সালে স্বয়ং ভ্যানগঘের শিষ্য নরওয়ের বিখ্যাত শিল্পী এডওয়ার্ড মাঞ্চসহ খ্যাতিমান সব শিল্পী ‘ইমার্জেন্সি হসপিটালস্ ডিউরিং ইনফ্লুয়েঞ্জা এপিডেমিক ( ১৯১৮ ), অ্যা ডেমনস্ট্রেশন অ্যাট দ্য রেডক্রস ইমার্জেন্সি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশন ইন্ ওয়াশিংটন ডিসি ( ১৯১৮), অ্যা প্যারেড মর্নিং দ্য ভিকটিমস অব স্প্যানিশ ফ্লু ইন ফিলাডেলফিয়া নামক বিখ্যাত চিত্র অঙ্কন করেছিলেন, যা আজ ইতিহাসের সাক্ষী। এসব চিত্রাঙ্কন ছাড়াও আছে আলোকচিত্র। বিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী লুইস হাইন আমেরিকান রেড ক্রসে যোগদান করার পর তিনি সংস্থার পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র তুলেছিলেন, যা আজ ইতিহাসের বেদনার সাক্ষী হয়ে আছে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি, বিশেষতমার্চ থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মহামারিতে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু মানবজাতিকে এক অসহায় অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে । মানব জাতি এই মহামারিকে দমন করতে সর্বাত্মক চেষ্টায় নিয়োজিত আছে। নিকট ভবিষ্যতেই একদিন হয়তো বিপদ কেটে যাবে বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে মানুষ। কিন্তু হারানোর ক্ষত, যন্ত্রণা রয়ে যাবে। কবি ও লেখক তাঁদের শব্দের বুননে প্রামাণিক করে রাখছেন এই দুঃসহ দিনের স্মৃতিকথা। চিত্রকর এঁকে রাখছেন ঘরবন্দী মানুষের অসহায়ত্ব। আলোকচিত্রশিল্পী ফ্রেমবন্দী করেছেন মানুষের আর্তনাদের পাশাপাশি সহানুভূতির ও সহমর্মিতার ছবি।

নিউইয়র্ক পোস্টের আহ্বানে ও আয়োজনে এসব ছবি প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ‘প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’ করোনাকালের ফটোগ্রাফি ও নিয়মিত শিল্পীদের পাশাপাশি খুদে শিল্পীদের করোনা দিনের ভাবনা ধরে রাখা চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে কালের দায় ও সময়ের দাবির প্রতি সম্মান জানাল। এই মহৎ কাজের মূল প্রেরণা প্রদর্শনী আয়োজনে যুক্ত শিল্পীদের আমাদের অভিনন্দন। আমার প্রত্যয়, মানবজাতির এই ক্রান্তিকালে ‘প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’র আবাসিক সম্পাদক, সংবাদকর্মী, আলোকচিত্র সাংবাদিক ও লেখকেরা তাঁদের অবদানের জন্য প্রশংসিত হবেন! আপনাদেরকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন