default-image

বৃষ্টিতে আধা ভেজা একটি চিঠি আমার ডাক বাক্সে পড়ে ছিল। সব চিঠিই নিয়ে এসেছিলাম ঘরে। কাজের ব্যস্ততার জন্য সব চিঠি খুলে দেখার সময় হয়নি। আজ আমার ছুটির দিন। তাই বলে ঘরের কাজে কি ছুটি আছে? শনিবার আবার ব্যাংক খোলা থাকে আধা বেলার জন্য। সেই তাগাদাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। চা বানাবার আর সময় পেলাম না। তাই গ্রোসারির ব্যাগটা হাতে নিয়ে ছুটলাম বাইরে। আমার তো গাড়ি নেই; বাসের অপেক্ষায় আছি। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে বাসগুলো অনেক দেরি করে আসে। কফি কিনতে কোনো দোকানে ঢোকার সাহস করছি না বাস মিস করার ভয়ে। যাক বাবা বাসও পেলাম বাকি কাজগুলোও শেষ হলো। এখন বাড়ি ফেরার পালা। মনে মনে ভাবছি, যত কাজই থাকুক না কেন, আজ বাড়ি গিয়ে চিঠির কাজটা শেষ করব। কিছু বিল আছে মাসের শুরুর দিকে দিতে হয়, আবার কিছু চিঠি আছে গার্বেজ। রোববার যদিও আমার বন্ধ, সেদিন না হয় রান্নার কাজটা করব। নিজে নিজেই ভেবে নিলাম কাজের অংশগুলো।

মানুষের হাতে এখন সব ধরনের ফোন আছে। এ ফোনের সঠিক ব্যবহার জানলে নানাবিধ কাজ সহজ হয়; অনেক সময়ও বাঁচে। এক সময় যখন বাড়িতে ফোনের ব্যবস্থা ছিল না, তখন মানুষ ডাকযোগে চিঠি আদান-প্রদান করত। সেই চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে হতো দুই-এক সপ্তাহ। কখনো-বা ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য মাস পেরিয়ে যেত। সেই চিঠি পাঠানোর জন্য পোস্ট অফিসে মেয়েরা যেত না, পাঠাতে হতো কোনো পুরুষের হাত দিয়ে। আর চিঠির উত্তরের অপেক্ষাটা ছিল কঠিন। সুখবরের চিঠি ঘরের মানুষগুলোকে আনন্দে ভাসিয়ে নিত। এখন কোনো শোক সংবাদ ফোনে দিলেও সরাসরি ব্যক্তিকে বলা হয় না। আর সেই যুগে যে চিঠি পড়তে জানে, তাকে দিয়ে পড়ানো হতো। সে শোকের খবর বাতাসের আগেই ছড়িয়ে পড়ত গ্রাম-গঞ্জে, এমনকি শহরেও।

যা হোক চিঠিগুলোর মধ্যে ছিল স্বদেশের খামে ভরা একটি চিঠি। আমাকে আবেগতাড়িত করল চিঠিটা। কারণ এখন আর কেউ চিঠি লেখার প্রয়োজন মনে করে না। বোঝা যাচ্ছে, যে লিখেছে তার সঙ্গে হয়তো খামের নামের মানুষের কোনো যোগাযোগ নেই। খামের নামটা আমার নাম নয়। ভিজে যাওয়া চিঠিটার লেখাগুলো বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে—খুলব কি খুলব না বোঝার আগেই কেমন যেন একটা আকর্ষণ বোধ করলাম। তাৎক্ষণিক খুলে পড়তে শুরু করলাম। একজন অভাগী মায়ের আর্তনাদ চোখে পড়ল। তাঁর ছেলের সঙ্গে হয়তো যোগাযোগ নেই অনেক বছর। তবু দোটানার মধ্যেই লেখা চিঠিটা। মা আমাদের সবারই খুব প্রিয় একটা জায়গা। তবু মানুষ ভুল করে। ভুলে যায় জন্মদাত্রীর মুখ। মা তাঁর চিঠিতে ছেলের সঙ্গে নিজের একটা ছবি দিয়েছেন। ছবিটা দেখে মনটা আমার ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। চিঠিতে তাঁর যে অভিব্যক্তি, তা আমাকে তাড়িত করল।

বিজ্ঞাপন

‘বছর ঘুরে আবার আসছে নতুন বছর। সবাই ঘর-দুয়ার পরিষ্কারে ব্যস্ত। আমিও আসার পর থেকে টিনের বাক্সটির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আজ সকালেই বাক্সটির ভেতর তোমার-আমার ছবিটা চোখে পড়তেই বুকের হাড়গুলো যেন আমাকে আঁকড়ে ধরল। কত দিন তোমাকে দেখি না। আমার কান্না দেখে আরেক অভাগী মা বললেন, ছেলেকে চিঠি দিলে সে উত্তর দিতে পারে। সে আশা নিয়ে তোমাকে লিখছি। আমি বউমাকে পাঠানো তোমার চিঠির খামটা চুরি করে রেখেছিলাম। আজ এতকাল পর এই চিঠির কোনো মূল্য তোমার কাছে আছে কিনা জানি না। তোমার কাছে চাইবার আমার কিছু নেই। তবে মা হওয়ায় তোমার মুখখানা দেখার বড় লোভ হয়। তোমাকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতে কী যে সাধ হয় বাবা! তোমার একখানা পুরোনো শার্ট লুকিয়ে রেখেছিলাম। মন খুব বেশি অস্থির হলে বুকে জড়িয়ে ধরি। আর সঙ্গ সঙ্গে মনে হয় তুমি আমার বুকের পাঁজরে লেপ্টে আছ। বউমা আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেছে। এখানে আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। সময়মতো খাবার পাই। আমার মতো অনেক মা আছেন এখানে। সবার সঙ্গে সময় কেটে যায়। দু-একবার বউমা এসেছিল আমাকে দেখতে, তখন তোমার ছেলের থেকে শুনেছিলাম তোমার কথা।

‘দাদাভাই বলল, তুমি নাকি আগুন নেভানোর পুলিশের কাজ করো। বাবা তোমার মায়ের বুকে যে আগুন জ্বলছে, তা তো নেভানো যায় না। শরীরে আগুন লাগলে দগ্ধ হয়, কিন্তু আমি যে অন্তর্দহনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি প্রতিদিন। টাকা পয়সা মানুষের মূল্য দিতে পারে না। তুমি তো আমার অমূল্য সম্পদ। আমি শুধু তোমাকে দেখতে চাই। আমার বুকে মাথা রেখে তুমি আবদার করবে, ‘মা তোমার হাতে কাউনের চালের খিচুড়ি খেতে চাই, কিংবা গুড়ের পায়েস। যদি সত্যি তুমি আমার চিঠি পাও, জানিও। বড় অধীর আগ্রহ ও অপেক্ষায় থাকব তোমার উত্তরের।

তোমার অভাগী আম্মা’

চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। কখন যেন আমার চোখ ভিজে গেছে বুঝিনি। চিঠির ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এ কী আশ্চর্য ঘটনা। এই ছবির দুটি মানুষই আমার খুব পরিচিত, কাছের মানুষ। কাকতালীয়ভাবে হঠাৎ এদের নতুন করে জানা হলো। আমরা সবাই এক পাড়াতেই থাকতাম। শাহেদ ভাই মা-বাবার একমাত্র সন্তান। পাড়ার মাঝখানের দিকে তাঁদের নিজের বাড়ি ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন উকিল, মা আমার আম্মার সই (বন্ধু) ছিলেন। আমরা দুই ভাই, এক বোন। শাহেদ ভাই ও আমার মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা ছিল। কিন্তু সেটা ছিল অবুঝ প্রেম, যা প্রাপ্তবয়স পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। তিনি ১৪/১৫ বছর বয়সে চাচার সঙ্গে বিদেশে চলে যান। আর আমার আব্বা বদলি হয়ে যান মফস্বল শহরে। ভালোবাসায় ছেদ পড়ে হঠাৎ করেই। ধীরে ধীরে বুঝেছি, এ জীবনে হয়তো আর দেখা হবে না। কিন্তু ভাগ্যের এ কী পরিহাস, এত যুগ পর এ অসামান্য চিঠি আমার বাড়ির কথা মনে করিয়ে দিল।

অতীত যেন সহসাই বর্তমান হয়ে ত্বরিত গতিতে ভাসিয়ে বেরোল। কোথা থেকে শুরু করব জানি না। এ চিঠির মানুষটির আমার ঠিকানায় বসবাস ছিল ভাবতেই নিজের ঘরগুলো চোখের সামনে দেখতে পেলাম। আজ প্রায় ২১ বছর পর একটি চিঠি কেমন করে আমাকে এতটা আবেগতাড়িত করে দিল। তাড়াতাড়ি এক কাপ কফি বানিয়ে জানালার পাশে বসলাম। সেই অতীতের ধুলো পড়া স্মৃতি যেন হৃদয়ে আঘাত হানতে থাকল। আমি ক্রমেই বেহিসেবির মতো টেনে টেনে বের করছি হাজারো স্মৃতির সেই পাহাড়। সারা রাত চোখের জলে বুক আর মন ভাসালাম। সকালে উঠে কাজের জন্য তৈরি হলাম।

ম্যানহাটনের একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করি। সেখানে বিদেশিদের নিত্য যাতায়াত। একজন আসেন, তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে কাজ করেন। শুধু খাবারের অর্ডার দেন, আর নিয়ে চলে যান। তবে আমার কাছেই বেশি অর্ডার করেন। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলব কিনা দোটানায় পড়লাম। যা হোক আমাকে একটু সময় দেওয়ার কথা বলতেই তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, তিনি কোনো ভুল করেছেন কিনা। বললাম, ‘শুধু একটু সাহায্য চাই। “লস্ট ফায়ারম্যান”; তার জন্য বিজ্ঞাপন দিতে সাহায্য লাগবে।’ তিনি বললেন, সবকিছু রেডি করে কাল যেন তার ছবি ও বায়োগ্রাফি নিয়ে কথা বলি। জানালেন, খরচও আছে। আমি রাজি হয়ে গেলাম।

পরদিন হতে যেন এক যুগ বাকি। সকাল মনে হয় আর কোনো দিন হবে না। ক্লান্ত শরীর কখন যে ঘুমে আচ্ছন্ন হলো জানি না। যথাক্রমে কাজের জায়গায় ওই ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা। আজ সে এলই না। পরদিন আমাকে দেখেই বললেন, হারিয়ে যাওয়া ফায়ারম্যানের রিপোর্টটি দাও। আমি এক দৌড়ে এনে দিতেই, ওটা নিয়ে চলে গেলেন। তারপর এক সপ্তাহ চলে গেল। কিছুই বলেন না। আসেন, খাবার নিয়ে চলে যান।

আমি তাঁর আশা ছেড়ে পুলিশের কাছে যাই। ছবি ও কিছুটা পরিচিতি দিই। ওরা আশ্বস্ত করে—নিউইয়র্ক যদি কাজ করে থাকে, তবে তাঁকে বের করা কোনো কঠিন কাজ নয়। একদিন ওই কাস্টমার হঠাৎ আমাকে ফোন করে বললেন, তিনি বিভিন্ন ফায়ার সার্ভিস অফিসে বিজ্ঞাপনটি দিয়েছিলেন। তাদের মধ্য থেকে একজন তাঁকে একটি নম্বর দিয়েছেন যোগাযোগের জন্য। নম্বরটি লিখে নিলাম। বাড়িতে এসে কল দিলাম। ফোন রিসিভ করছে না কেউ। বেশ কিছুদিন পর আমি কল দিতেই আমার পরিচয় জেনে তারা বলল, ‘আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি আমাদের এই বীর সৈনিক ফায়ার ফাইটারকে। ৯/১১ হামলার সময় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে কর্মরত ছিলেন তিনি। নিজের জীবনের বিনিময়ে সাহায্য করেছেন অগণিত মানুষকে। সরি ফর ইউ অ্যান্ড আওয়ার লস।’

ফোনটা রাখতেই আমি এক বীর যোদ্ধাকে ভাবতে থাকলাম, চোখের পানি যেন এমনিতেই ভেসে চলল। হায়রে জীবন; কতভাবেই না ধরা দেয়। পরদিন সকালে চলে এলাম ৯/১১ মেমোরিয়ালে। হাতে ছিল কিছু সাদা গোলাপ। আমি একে একে নাম পড়তে থাকলাম। চোখ স্থির হলো তোমার নামের জায়গায়।

বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। নামের ওপর স্পর্শ করতে করতে মনটাকে শান্ত করলাম। শূন্য মন নিয়ে নয়, বরং অনেক গর্ব নিয়েই বাড়ি ফিরলাম। তুমি চলে গেছ। তবু অম্লান রয়েছ কোটি কোটি প্রাণে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0