default-image

ইকবাল হাসান

বৃষ্টি থামার আগে

(প্রিয় ছড়াকার মনজুর কাদেরকে)

বারান্দায় বসে আছি। বাইরে বৃষ্টি পুনরায়। পাশে

ব্ল্যাক কফি। সিরামিক কাপে ঘোর সন্ধ্যাবেলা।

এমন বাদল দিনে কোথা থেকে ভেসে আসে নবম সিম্ফনি!

ভিজে যাচ্ছে পাশের বাড়ির শূন্য ব্যালকনি।

বৃষ্টি উপেক্ষা করে কারও কি আসার কথা তবে!

এই বৃষ্টি থামবে কবে? পুণ্যস্নান শেষে ফিরে এসে

গাছের পাতারা—অন্ধকারে এ ওর কাঁধে মাথা রেখে, ঠোঁট

রেখে, শরীর এলিয়ে যেন খুলে দেয় বুকের বন্ধনী।

আর আমি, পাশে ব্ল্যাক কফি, একা, কোথাও যাব না

এই বাদল-সন্ধ্যায় দরজা রেখেছি খুলে, তাই বলে

অপেক্ষায় আছি—কখনো ভেবো না।

মাসুদুজ্জামান

জীবন এমনই

যেমনই মনে হোক যাকে খুশি

ভাবতে পারো

আমার বুকের রং নিয়ে তাই

তেমনি আরও

যার ছবি আঁকো যেভাবে খুশি

সে ছবি আমারই

আমিই দিয়েছি যত রেখা আর

যত রং পারি

জীবন থেকেই সবটুকু ঢেলে

করেছি রঙিন

সেই রং দিয়ে যাকে খুশি আঁকো

যত অমলিন

সে ছবি হবে আমার রঙেই

ভীষণ রাঙানো

জীবন এমনি যদি পারো তবে

ফিরিয়ে আনো।

বিজ্ঞাপন

শামস আল মমীন

আপনি বলুন স্যার

(এক ছবিতে, মেলবোর্নের সমুদ্র সৈকতে, সলিমুল্লাহ খানকে হাঁটতে দেখে)

কতগুলো ঢেউ এসে ধুয়ে দেয় তাঁর যুগল চরণ।

স্তব্ধ বালুপথে হাঁটছেন তিনি, একা...

হঠাৎ মেলবোর্নের ‘গ্রেট ওশান’ রহস্যময় হয়ে ওঠে আরও।

ঘাড় ফিরে দেখলেন তিনি

জলের সব প্রাণীকুল জড় হয়ে আছে তীরে;

সবিনয়ে বলে ওরা,

আপনি বলুন স্যার, আমরা শুনছি।

ঝিরঝির হাওয়া, ঘূর্ণি হাওয়া, দমকা হাওয়া

একসাথে বলে ওঠে,

আপনি বলুন স্যার, আমরা শুনছি।

বেসামাল জলোচ্ছ্বাস, আর ঝাঁকে ঝাঁকে গাঙচিল

বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে নতশিরে বলে ফের

আপনি বলুন স্যার, আমরা শুনছি।

যত দূর চোখ যায়, তার চেয়ে দূরে চোখ রেখে দেখলেন তিনি,

জ্যাক লাকাঁ নেই, ফানো নেই...

অমর পঙ্ক্তি কিছু কোটের পকেটে নিয়ে শহরের ফুটপাতে

দাঁড়িয়ে আছেন বিষণ্ন বোদলেয়ার।

ভিনদেশি সব সাগরবিহঙ্গ, উড়তে উড়তে হর্ষোৎফুল্ল গুঞ্জনে মেতে ওঠে,

ঐ তো তিনি,

’কালো মুখ, সাদা মুখোশ’ এঁটে

হাঁটছেন, একা আরও কিছু দূর...

রাকীব হাসান

মার্চ মাসে ফেব্রুয়ারির কবিতা

পঞ্চাশ বছর বড় হয়ে আসলে কত বড় হয়েছি?

জন্মে পাওয়া দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে জানি, সে এখনো ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল

আমরা কি বড় হয়েছি উচ্চতায়, সবুজে আর সুন্দরে?

আমরা কি বড় হয়েছি সতেরো কোটি তর্জনীর সম্মিলিত মিনারে?

আজ ফেব্রুয়ারির শহীদ মিনারে বাংলায় কতটুকু প্রাণবাসি?

মানুষের কান্নার মতো আমরা যদি প্রাণীর কান্নায় ব্যথিত হই

উদ্ভিদ এবং বৃক্ষের বাঙালি নাম স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু

তারপর কতটা গভীর হয়েছে বাংলাদেশে প্রাণের সমবাস?

ধর্মের গির্জায়, মন্দিরে-মসজিদে আমরা দেখতে কেমন হয়েছি?

আমাদের উৎসবে চির আনন্দে গাইছেন আব্বাসউদ্দীন আর জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ,

এই সত্য মেঘের জঙ্গল ঢেকেছে কি?

দেশের মাতৃকোলে কত বড় হলো তিতুমীর, সূর্যসেন আর প্রীতিলতা?

শ্যামা সংগীত আর কীর্তনে গোলাবাড়ির উঠানে,

অনতিদূরে মাদ্রাসার মাঠে ইসলামিক গানের বাংলাদেশ,

কেমন আছেন সম্প্রীতির কাজী নজরুল?

ভালো আছে তো জীবনানন্দের রূপসী বাংলা লাল টিপ পড়া সবুজ শাড়িতে?

ফুলঝুরি ইউনিয়নের একজন অখ্যাত মোস্তফা জমাদ্দার,

প্রেমিকা লাভলিকে আংটি পরিয়ে যুদ্ধে যায়, ফিরে আসে না..

সেই আংটি কি পড়বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর?

জগৎজ্যোতি দাস আর তাঁর টেকেরঘাটের গেরিলা দলের

ম্যুরাল আমরা কবে রক্তের লালে দেখব মিউজিয়ামে?

আমাদের বোধের বাতাস উড়ল কত দূর, পার হলো কি সীমান্ত?

আমরা কি বিশ্বসভায় রবীন্দ্রনাথের পাশে বসে মহাবিশ্ব দেখি?

প্রতিবাদের ফেব্রুয়ারি জন্ম দেয় প্রতিরোধের ৭ই মার্চ

আমাদের ভাষার আগুন ভাষণে জ্বলে ওঠে মুজিবের উদ্যানে

বাংলাদেশ জানে-বাঙালি জানে, যে জানে না সে কি আমাদের?

আলী সিদ্দিকী

সহস্রকালের স্বপ্ন পাখা

ঢেউয়ে ঢেউয়ে নেচে নেচে তুমি চলে এলে-

সকল আঁধার দুয়ার ভেঙে চুরমার করে

ঝলসে দিয়ে চোখের আলো,

লক্ষ কোটি সূর্য শিখার মঙ্গল দীপ জ্বেলে।

সহস্র বছর ধরে বসে থাকা তোমার পথ চেয়ে-

ত্রিনয়নের স্রোতোধারায় স্বপ্ন ভাসিয়ে রেখে

আলুথালু এক সুনামির আশায়,

বিসর্জনের সব আয়োজন রেখেছি সাজিয়ে।

জনসমুদ্র জেগে ওঠে ঢেউয়ের ফণার ছোবলে-

স্বপ্নসুধায় ভরিয়ে দিলে শতাব্দীর মৃত শিরা

রক্তকণায় ছড়িয়ে দিলে রক্তবীজ,

তোমার তর্জনী নির্ণীত হলো নতুন ভূগোলে।

এত রক্তোচ্ছ্বাস কেউ দেখেনি জ্যান্ত ইতিহাসে-

মাটির নিচে জেগে থাকে জাতিস্বরের গাঁথা

শত পুষ্পের পল্লবে আঁকা রক্তপতাকা,

সহস্রকালের রুদ্ধ স্বপ্নেরা মেলে পাখা বাতাসে।

default-image

খলিল মজিদ

বিকল্পরতি

প্রতিদিন চাঁদ ওঠে রাত দেড়টায়, ডাক আসে

শুরু হয় কথার মৈথুন, প্রিন্ট হতে থাকে

চুম্বনচিহ্ন প্রোটন প্রবাহে। ছাপ পড়ে

কি-বোর্ডের কর্ডে, মাউসের ক্লিকে;

জাদুর এক দেবশিশু জেগে ওঠে মায়ার প্রহরে।

সে মন্থন করে ফুলে-ওঠা মেঘ, নাম দেয়

অনসূয়া, প্রিয়ংবদা। মেঘের নিপল চুষে

বৃষ্টি নামায় প্রতিদিন রাত দেড়টায়।

মেঘের নরম ঘুম, ঘোরলাগা, মাংসের

অকল্পনীয় জোছনায় দগ্ধ; নেশা, ছায়া,

চাঁদের কুহক, কামনার গোলাপি উৎসবে।

মাঝরাতে যখন মেঘমন্থন হয়, জেগে ওঠে

মাটির টুনটুনি, পালকে স্পর্শ পেতে চায়

জোছনার নীল জিহ্বার, রাত্রিভর

বিকল্পরতির বৃষ্টি চিরি চিরি চিঠির প্রলাপে

ঝরে, তখন বৃষ্টির দাঁত শিউরে তোলে

অপেক্ষাতুর ক্রন্দনের শিকড়।

মনিকা মুনা

আয়না

রাতের আকাশে চাঁদ মোটামুটি স্থির হয়ে এলে

আমার শরীরজুড়ে মুখোশ পেরেক হয়ে বিঁধে

যেতে শুরু করে। নিয়ম করে প্রচুর মুখোশ গোনা

হয় তখন। সারি ধরে দেয়ালের গা ফুটো করি,

কংক্রিটের রক্ত ধীরে ধীরে নীল হয়ে আসে।

বেঁচে থাকা মানে কি গোপন আয়নায় মুখ দেখা?

তুমি কি দেখতে কোনো দিন? তোমায় আয়নার

কথা কোনো দিন শুনিনি কোনো বয়ানে। মজ্জার

ভেতরে এসে এইভাবে রাত জুড়ে বসে! দুর্বল বৃষ্টি

নামে। এই গৃহ, বিছানা-বালিশ আমায় সঙ্গী করে

উড়াল। এভাবে আমায় তুমি স্পর্শ কর, আর

ভাব-স্পর্শের অতীত বলে কিছু নেই!

বিজ্ঞাপন
সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন