‘কবিতার এক পাতা’ বাংলা কবিতার এক নান্দনিক আয়োজন। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের প্রতি মাসের তৃতীয় শুক্রবার প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা মননশীল কবিতাপ্রেমী পাঠকদের সামনে মেলে ধরে গুণী কবিগণের অসাধারণ কিছু কবিতা। অগ্রসর পাঠকের বৈচিত্র্যময় পাঠ পিপাসার কথা মাথায় রেখে উৎকৃষ্ট কবিতা ধারাবাহিক প্রকাশ করে যাচ্ছে ‘কবিতার এক পাতা’। বাংলাদেশ, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত কবি ও কবিতাস্পৃষ্ট মানুষের ইতিবাচক সাড়া কাজটিতে আমাদের সচকিত ও সনিষ্ঠ রেখেছে। আপনাদের সহযোগিতায় ও ভালোবাসায় আমাদের এ যাত্রাপথের তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ ঘটল। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা কর্তৃপক্ষসহ পুরো প্রথম আলো পরিবারের কাছে কৃতজ্ঞতা। আপনাদের সবার জন্য আমার এক বুক ভালোবাসা—ফারুক ফয়সল
default-image

মাহবুব হাসান

পাতা ঝরার কাল

কবিতার রাজ্যে ফল শুরু হয়েছে শরতে,

হেমন্তের সোনা রোদব্যাপী শীতের প্রকোপ

পাতা ঝরছে পাতা ঝরছে, পাতা ঝরছে

সকাল দুপুর রাতে,

নিঃশব্দের ভেতর সেই পতনধ্বনি

সবুজের হন্তারক,

হলুদ, লাল আর মেরুন

প্রকৃতির লীলা

আমাদের রাজনৈতিক রাজার পতনের মতোই বিতর্কিত;

নভেম্বরে নির্বাচনী ডামাডোলের ভেতরে

ফল-এর শুরু,

দুরুদুরু দুরুদুরু বুকে গিয়েছে অনেকে

ভোট কেন্দ্রে,

ভয়ের বাতাসা খেয়ে

সাধারণ জন আগাম দিয়েছে ভোট

মেইলে এবং তিন তারিখ, বুথে—

ফল-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন ‘বোল্ট’

নেমে আসে পতনের আগাম শীতার্ত কাল,

বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাসের দিন।

এই উন্মাতাল পরিবেশ তো উত্তম

পতনের জন্য

এবং নতুন চিন্তার খাপে ভরে নিতে হবে আজ

আলোর ইশারা–

ফল শুভ হোক

কেন না কবিতা পাবে নতুন পৃথিবী

নতুন বসন্ত

চিন্তার সৌরভ!!!

শিহাব শাহরিয়ার

চিঠি স্মৃতি

আমাদের দিনগুলো আমাদের হাতের মতো

আবার গাঙের কিনারের মতো আমাদের হাত

আমরা কখনো কোনো হাতের পার্থক্য খুঁজি না ?

মনে করি মেহেদিরাঙা হাত ও নিরন্ন হাত একই

হাতেরাও তো ভাসে হাওরের সাদা সাদা জলে

আমাদের কাছে দিন যাপনের কোন স্বাক্ষর নেই

কলসির কাজলা রং রোদকে একদিন তাজা করেছে

তবে আমাদের হাতে থাক চিঠি স্মৃতি ও কমলার পূজাঘট

বিজ্ঞাপন

রাকীব হাসান

কয়েকটি অক্ষর শব্দ করে

দেখার প্রলোভনে পরীক্ষা শেষ না করে তার সঙ্গে...

বড় হয়েছি, বাড়ি ছেড়েছি তার সঙ্গে।

স্কুলের বেঞ্চে খুব মন দিয়ে শিখেছি প্রেমের সূত্র

তাকে জড়িয়ে রাখতাম বীজগণিতের বন্ধনী দিয়ে;

যোগের পূর্ণিমায় নদীতে ভাটার বিয়োগ

কতগুণ মনের ভার ভাগ করে

বইয়ের পৃষ্ঠায় তার নাম লিখে

ইরেজার দিয়ে মুছে ফেলেছিলাম রবীন্দ্রনাথ,

আমার আদিম যুগে ভুলে গিয়েছিলাম ভাষার ব্যবহার

শব্দের অভাবে তাকে শূন্য ডাকতাম।

কলেজে যে যায় কত সহজে সে হারায়

স্কুল ছেড়ে আসা আঙুলের গন্ধ,

সব জন্ম একদিন হাঁটতে শিখে যায়

কয়েকটি অক্ষর বসে থাকে শূন্যের শূন্যতায়।

আঠারোর দিনে যে প্রজাপতির উৎসব

সিল্কের ছাপ নিয়ে পচে যায় উনিশের মেয়ে!

অন্ধকারে খুব যত্নে গড়া বিকশিত গল্প

ভাঙা চাঁদ দিয়ে তাকে কত শত মাইল দীর্ঘ করেছিল!

সেই জলের দৈর্ঘ্য উনিশ বছর পরে

একটি রাতে পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি হয়ে ঘুমিয়ে যায়।

শব্দের অক্ষরগুলো কাগজ ছেঁড়ার শব্দে

করতলে টলমল, চিঠির ভয়ানক নির্জনতায়

কত দুঃখ লেখা হয়নি আমাদের;

এই নিঃশব্দের দ্যোতনায় যে শব্দ পাই

সবচেয়ে বেশি চুরমার দেখি স্মৃতির গমক...

তার নামে পাখোয়াজ বাজে কণ্ঠের দেয়ালে,

কয়েকটি অক্ষর শব্দ করে।

আলী সিদ্দিকী

কালবেলা

সর্বনাশের দুয়ার খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি

সকল সুখী লখিন্দর

বেহুলার মুক্ত খোলে;

নিদ্রাবিমূঢ় রাত্রি সাক্ষী

গহিন তরঙ্গতাড়িত কালবেলা

বিভীষিকা জাগিয়ে তোলে।

তুমি মুছে নিয়েছ আলতা-সিঁদুর

খুলে নিয়েছ নথ-বাজুকা

ঠোঁটের রঙের ভ্রমর;

আত্মোৎসর্গের সকল আয়োজন সমাপন শেষে

তুমি আলগা করে নিলে রক্ত শেকলে রচিত নোঙর।

default-image

খালেদ সরফুদ্দীন

শিরোনামহীন

১ .

চিচিং ফাঁদের অস্থিরতায় এলেবেলে বয়ে যায়

পঞ্চাশ ফুটলেই পুরুষগুলো ছেলে হয়ে যায় ।

পুরুষের চোখ কিংবা কথা কি সীমারেখা মানে ?

কষ্টের অক্টোপাসে বেড়ে ওঠা পুরুষেরা জানে ।

২ .

কষ্টের রসায়ন

বুকে ধুপ ধুপ,

অভিমান যদি হয়

অধিকার রূপ,

সময়ের বেড়াজালে

কানামাছি চুপ।

৩ .

বেহুলা আজকাল বিধবা থাকে না

লখিন্দরকে মনেও রাখে না,

এই যদি হয় সুশ্রী মেয়ের কল্পনা

তারাতো আর সংখ্যাতে আজ অল্পনা?

এ কেমন কান্না শুধু বুকের ভেতর

জন্মশাসন চলছে আজও মানবেতর ।

ফারহানা ইলিয়াস তুলি

রোদ পোড়াবার স্মৃতি

পোহাতে গিয়েই একদিন পুড়িয়ে ফেলেছিলাম

অনেকগুলো পাতা। পৃথিবীর সে সকল পৃষ্ঠায় মানুষের

বেদনা লিখিত থাকে;

পুড়িয়ে ফেলেছিলাম তার পরিচিতি।

আর বিজলির আলোতে নিজের মুখ দেখে আবার

বুঝে নিতে চেয়েছিলাম,মানুষ ফিরে না-স্মৃতি থাকে।

হলুদের মিশ্রণ দেখলেই প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা

আরোগ্যের সংকেত পাই। জানতে পারি, এই সময়

ক্রমশ বদলে গিয়ে একদিন নতুন প্রাণের সঞ্চার পাবে।

একদিন,অবয়বে তাকিয়ে থেকেই আমরা খুঁজে নেব

পরস্পরের বাহুবন্ধনের হেমন্ত চিত্র,

এক কিংবা দুই, দুই কিংবা একের পঠিত সবটুকু প্রেম।

নাহার মনিকা

মন্থন

মন উঠে গেলে কি করা বায়স?

মহাশূন্য ছায়া ছায়া দিনে

মন উঠে যায়।

বৈতালের দিকে মন এক শ ওজন,

বাতাসেও স্থির।

কতগুলো ধূসর মাছের মত

মন দিয়ে ভান ধরে-‘দেখি নাই’।

না দেখার নামই বুঝি বসে থাকা!

সৌরচুল্লি থেকে ফিরে আসে

মন্থনে মন্থনে অগ্নি শলাকা।

পৃথিবীর মত করে আয়ু

কার মন উঠে গেল? কোথা থেকে বক!

এক পায়ে ধ্যানে বসে আছি

কুয়োতলা মনে করে অর্থহীন

ধরে রাখছি সমুদ্রের জল।

রেজা শামীম

নগরহীন নাগরিক

এই শহরে কোন বৃক্ষ আমাকে চেনে না

আমিও জানি না তাদের ডাকনাম

নিজের মত করে কোনো নাম রাখার কথাও মনে হয়নি কখনো।

এই শহরের রাস্তাগুলো ভীষণ এঁকেবেঁকে উঠে গেছে সবুজ পাহাড়ে

আমি আটকে আছি রুক্ষ ভ্যালিতে।

এই শহরের উৎসবগুলো অনাত্মীয়ের মতো,

আমাকে অন্ধকারে রেখে আমারই প্রতিবেশীর

হীরক বাতির আলোকোজ্জ্বল বাড়িতে হুল্লোড় করে,

আমার দরজায় জমে থাকে হিম।

যে শহর থেকে আমি এসেছি, সে শহরও মনে রাখেনি আমাকে

যে খানাখন্দ আমি চিনতাম, ক্ষত সেরে তারা আরও চকচকে

পাড়ার যে পোড়ো বাড়িটাকে আমরা ভূতের বাড়ি বলতাম

সেটিও বদলে গেছে বহুতল শপিং মলে।

আমাকে কেউ চেনেনি

আমার শহর বেদখল হয়ে গেছে ভিন্ন কোলাহলে।

ঠিকানা লেখা কাগজ হারিয়ে

আমি শহরবিহীন হাঁটি দ্বান্দ্বিক অবসাদে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0