default-image

হোটেলের জানালায় দেখা বিরাট লেকের ঘাটে বাঁধা অনেক ছোট-বড় নৌকা দেখে ভীষণ ইচ্ছা হলো সমুদ্রের নীলে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যেতে। অন্যদিকে ছোট আকারের বিমানগুলো ফড়িঙের মতো উড়ে উড়ে ওই লেকের পাশেই লম্বা পাকা রাস্তায় অবতরণ করছে। এগুলোও পর্যটকদের জন্য বরাদ্দ। তবে জনপ্রতি শত ডলার গচ্চা দিয়ে নীল সমুদ্রের মেঘমুক্ত আকাশে কিছুক্ষণ ঘুরে আসা যায়। তবে আমাদের লক্ষ্য বড় নৌকা ভাড়া করে লম্বা সময় নিয়ে শান্ত সমুদ্রের নীলে হারিয়ে যাব। একদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে খুঁজতে লাগলাম, বোট কোম্পানির অফিসের ঠিকানা। উদ্দেশ্য নৌকায় চড়ার নিয়মকানুন জেনে পরদিন সকালে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াব। কিছু দূর এগিয়ে দেখি, তিন-চার যুবক আড্ডা দিতে দিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। তাদের জিজ্ঞেস করে আশান্বিত হলাম না।

বিরাট বাউন্ডারি ঘেরা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আকাশে আধেক চাঁদ। কোথাও বড় গাছের ডালপালা আলো আঁধারের সৃষ্টি করেছে। আবার কোথাও ধুতরা ফুলের মতো সাদা ফুলগুলো লাইটপোস্টের আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। কাছের পার্টি হলের কিছু গুঞ্জন ভেসে আসছে। এক মহিলা জগিং করে করে হাঁপাচ্ছে। আমাদের কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করি বোট অফিসে যাওয়ার কথা।

বিজ্ঞাপন

ওই নারী তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে দিল বিশাল ফটকের পাশে সিকিউরিটি বসা; তাঁর কাছে সব খবর পাওয়া যাবে। এক মধ্যবয়সী লোকের সঙ্গে আলাপে জানা গেল বোট অফিসের দরজা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। একটা ফোন নম্বর ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার জানামতে এখানকার নৌকাগুলো সব ভাড়া হয়ে গেছে। আগামীকাল গভীর সমুদ্রে বড়শিতে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা হবে। তবে ‘ওল্ড সান জোয়ান’-এ পর্যটকদের জন্য নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়।

হোটেলে ফিরে আমার মেয়ে রোমানা ফ্রন্ট ডেস্কে কর্মরত মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করে পর্যটন গাইড বুক সংগ্রহ করে পুয়ের্তোরিকোর বিখ্যাত পর্যটন এলাকাগুলোর নাম জেনে নিল। নিয়ন পার্ক ও মিউজিয়ামে (শিশুদের বিনোদন কেন্দ্র) বোট রাইডসহ অনেকগুলো রাইড ও মিনি চিড়িয়াখানা আছে। জেনে খুশি হলাম। আমার নাতি-নাতনি দুজনের বিনোদনের ব্যবস্থা হয়ে গেল। চমৎকার লেকে আধঘণ্টা বোট রাইড। রাবারের তৈরি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। উজ্জ্বল রোদেলা দুপুরে কোনো ভিড় নেই। একমাত্র আমাদের আধিপত্য। কাউন্টারে যেতেই ক্রু সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে দিল। নিরাপদ জলপথে নিরিবিলি ভ্রমণ।

দুপাশে গাছপালা; কৃত্রিম উপবন। অনেক পুরোনো লেকের দুপাশের এ ল্যান্ডস্কেপ নিঃসন্দেহে কোনো জাঁদরেল স্থপতির হাতের ছোঁয়ায় তৈরি। গ্রামবাংলার বর্ষাকালের দৃশ্যই যেন ফিরে এল। পুরো দিন পার হয়ে গেল। কিন্তু প্যাডেলচালিত নৌকায় আর চড়া হলো না। কারণ, ইতিমধ্যে বিকেল ৪টা বেজে গেছে। ৪টার পর প্যাডেল বোট চড়া যায় না।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি কয়েকটি অজানা গাছের ছায়ায়। সামনের সবুজ আঙিনায় ঘাসের ওপর বসে কি যেন খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ধূসর রঙের কিছু পাখি। ঘাসে চরে বেড়াচ্ছে সাদা জোড়া ময়ূর। কিছু দূরে এগিয়ে দেখি, বড়সড় গাছের নীড়ে মা পাখির পাখাতলে কয়েকটি বাচ্চা। বাবা পাখি পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে তাদের মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার। মিনি চিড়িয়াখানায় বিরল প্রজাপতির কিছু গাধা জাবর কাটছে দেখলাম। খাঁচায় পোরা টিয়া পাখির কিছু শেখানো বুলি শুনতে শুনতে চলে এলাম মূল ফটকের সামনে।

সকালের নাশতা সেরে মালপত্র গোছাতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। দুপুর সাড়ে ১২টায় হোটেল হায়াতের চেক আউটের সময় আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু আমাদের ফিরতি নিউইয়র্ক ফ্লাইট রাত সাড়ে ৯টায়। এই দীর্ঘ সময় কীভাবে কাটানো যায়, তা ভাবছিলাম। হঠাৎ মনে হলো ‘ওল্ড সান জোয়ানের’ বৃহত্তর দুর্গটি সেদিন দেখা হয়নি। সিদ্ধান্ত নিলাম মালপত্র হোটেলের স্টোর রুমে রেখে বেরিয়ে পড়ব। হোটেলের লেনদেন চুকিয়ে লনে বসে ট্যাক্সির অপেক্ষা করছি। খানিক পরই চলে এল ট্যাক্সি।

ওল্ড সান জোয়ানের রাস্তায় যেতে যেতে নজরে এল অনেক পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে রয়েছে নতুন স্থাপনাও। হোয়াইট হাউসের আদলে গড়া গভর্নর ভবন, অনেকগুলো সরকারি অফিস। ঝুলন্ত বারান্দার কারুকার্যখচিত কিছু অট্টালিকা উজ্জ্বল রঙে সজ্জিত। একটি দালানের সামনে কাঠ খোদাই করা জালির কাজে এসেছে খানিকটা আগ্রা কিংবা রাজস্থানের আদল। আমি যেন তাকিয়ে আছি একটি স্বচ্ছ গোলকের দিকে। তাতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে স্বপ্নঘেরা প্রাসাদের আলো। এক পাশে ক্যারাবিয়ান সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাতামাতি দেখে এক সময় নজরে এল সফেদ দৃষ্টিনন্দন সিমেট্রি। মনে হলো বিভিন্ন পরাশক্তির আত্মপ্রকাশের ফসল এই মৃতের রাজ্য। স্বাধীনতাকামী শোষিত মানুষের আত্মদানের চিহ্ন ধরে রেখেছে এই সিমেট্রি।

বিজ্ঞাপন

সিমেট্রি পার হতেই সামনে এল বিরাট প্রাচীর ঘেরা পাঁচ শ বছরের পুরোনো দুর্গ। রূপকথার গল্পে যেমন কেল্লায় বন্দী রাজমহলের বর্ণনা পাওয়া যায়, সে রকম স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে রীতিমতো সতেজ, অথচ ভঙ্গুর প্লাস্টারে নির্মিত ইট-সুরকির তৈরি এ দুর্গ। এখানে এসেই স্মৃতিকে তাড়া করে কিছু দুঃস্বপ্ন। দু কদম এগোতেই চোখ আটকে যায় প্রায় দু শতাধিক সিঁড়ি বেয়ে পর্যটকদের ওঠানামার দিকে। আমিও সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকি; ওপরে ওঠার চিন্তাটা যেন মোটেই আসছে না। ছোট ছোট ঘরগুলো আমাকে আকৃষ্ট করে। মনে হয় প্রতিদিন সমুদ্র থেকে আসা ঘন এক ধরনের কুয়াশা জড়িয়ে রেখেছে প্রতিটি পাথরকে। কোথাও আধভাঙা দেয়ালের পাশে রাখা প্রকাণ্ড এক কামান সমুদ্রের দিকে তাক করে রাখা। আমি সব কটি সিঁড়ি মাড়িয়ে সামনে এগোতেই কোনাকুনি একটি বর্গক্ষেত্রের আকৃতিতে গড়া সবুজ আঙিনা অতিক্রম করতেই অতি স্থূলকায় বারো-তেরো বছরের এক সাদা তরুণী হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে দেখে মৃদু হাসে।

আমি তাকিয়ে দেখি ওর গাল দুটো ক্লান্তি আর গরমে ঘেমে রক্তিম হয়ে আছে। দু কদম সামনে এগোতেই গোচরে এল এক সেনা কর্মকর্তার মূর্তি। তিনি ছিলেন পুয়ের্তোরিকোর জাতীয় কমান্ডিং অফিসার অ্যাঞ্জেল রিভেরু মার্কস। ১৮৯৮ সালে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ যখন পুয়ের্তোরিকো আক্রমণ করে, তখন তিনি অতি দৃঢ়তার সঙ্গে তা প্রতিহত করেন। আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি সমুদ্রের দিকে মুখ করা রেলিংয়ে বাঁধানো লুক আউট পয়েন্টে। সেখানে সমুদ্রের কিছু ছবি তোলা শেষে আবার দুই শতাধিক সিঁড়ি ভাঙার প্রস্তুতি নিয়ে অতি সন্তর্পণে ওপরে চলে এলাম।

বাইরে রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে খেতে দেখি বিকেল ৪টা বাজে। ট্যাক্সি করে সোজা চলে এলাম হোটেলে। ৬টায় বিমানবন্দর পৌঁছাতে হবে। হোটেলে এসে মালপত্র নিয়ে বিমানবন্দরের পথে যাত্রা করি। এরই মধ্যে রাস্তায় অনেক জ্যাম লেগে গেছে। আমাদের ট্যাক্সি চলছে ধীর গতিতে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, বহুতল দালানগুলো ২০১৭ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘মারিয়া’র ক্ষত ধারণ করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। চালক একটা বিরাট ছয়চালা ঘর দেখিয়ে বলেন, ‘এটা একটা ক্যাথলিক চার্চ ছিল। এখন গভর্নর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, একে অ্যাপার্টমেন্ট ভবন করে ফেলবেন।’ আমি ভাবতে পুয়ের্তোরিকোর জনপদের কথা। ঘূর্ণিঝড় মারিয়ার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবার এসে গেল ঘূর্ণিঝড় ‘ডোরিয়ান’।

মন্তব্য পড়ুন 0