default-image

কামরাঙা গাছটিতে রং পাতার ঝোপে টিয়েগুলো ঝড় তুলেছে। পাকা ফল নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে। চলছে ভালোবাসা, আদর সোহাগ, চিৎকার। টিয়ার ঠোঁটের লাল রং কী জমাট কোনো কষ্ট?

একটা দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট শশীর বুকে। ওর যখন বারো-তেরো বছর বয়স, গ্রাম থেকে শহরের এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল ওর বড় ভাই।

গোপাল ডাক্তার। হোমিওপ্যাথির জন্য শহরে নাম করা। দিনাজপুর শহরে সবাই এক নামে চেনে। দুই ছেলে সজীব ও শিশির। ছেলেরা বউসহ দূরে অন্য শহরে থাকে। গোপাল বাবুর দুই মেয়ে। পলা আর পান্না। বড় মেয়ে পলা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। ভালো পাত্র পেয়ে ছোটটির বিয়ে দিয়ে দেন। তার স্বামী পিডিবির বড় অফিসার। পাবনায় থাকে।

বাড়িতে গোপাল বাবু আর তার স্ত্রী। মেয়ে পলা। পাঁচ রুমের একতলা বাড়ি। দীপালি রাণীকে শশী মা ডাকে। গোপাল বাবুকে বাবা। রান্নার একজন নারী আর শশী। বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা আর কাপড় ধোয়া; ছাদে শুকাতে দেওয়া। আর ছাদ থেকে শুকনো কাপড় এনে গুছিয়ে রাখা, এই কাজ। সন্ধ্যা হলে দীপালি রাণী মানে গোপাল বাবুর স্ত্রীর পায়ের কাছে কাঠের জলচৌকি নিয়ে বসে টেলিভিশন দেখে। কখনো তার পায়ে বাতের ব্যথা নিরাময়ের তেল ডলে দেয়। প্রথম ছয় বছর বেশ ভালোই ছিল। প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসে বড় ভাই এসে সপ্তাহ খানিকের জন্য বাড়ি নিয়ে যায়।

ওই বছর পান্না রাণীর দুই নম্বর বাচ্চা হয়েছে। তার একজন সাহায্যকারী দরকার। মায়ের কাছে ফোন করে জানায়। তখন দীপালি রাণী বলেন, ও শশী তুই কটা মাস গিয়ে পান্নার কাছে থেকে আয়। বড় নাতনি মৌলি যায় স্কুলে। ছোট তোতনকে বাসায় রেখে যাবে কার কাছে। যা মাই।

বিজ্ঞাপন

মা, মুই না যাও তোমাকে ছাড়ি।

আরেকটা চেংরি মুই খুঁজছ। পালি পরে তোক নিয়া আসিমো। মুই ধরি যাইম। তুই চিন্তা করিন না।

দীপালি রাণী আর শশী এক সকালে লাল রঙের বিআরটিসি বাসে করে পাবনা শহরে পৌঁছান। পান্নার স্বামী সুবোধ সরকার। বেশ শান্ত ভদ্র। অফিসের জিপ নিয়ে শাশুড়িকে বাস স্টপ থেকে নিয়ে আসেন। হলুদ সীমানা প্রাচীর। বড় একটা পুকুর। পুকুর পাড়ে নারকেল গাছের সারি। সারি সারি হলুদ রঙের তিনতলা সরকারি কোয়ার্টার। শেষ বিল্ডিংয়ের একতলার ডানদিকে পান্নার বাসা। পান্না মাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে। ছোট মৌলি দিদার সঙ্গে গল্পের ঝুলি খুলে বসে। স্কুলের মিস সেজে দিদা আর শশীকে ছাত্রী বানিয়ে পড়ায়।

ছোট তোতন দুই মাসের। শশী তোতনকে কোলে নিয়ে বিকেলে বারান্দায় হাঁটে। সকালে উঠে নাশতা বানায়। সকালে পান্না ওর মেয়ে মৌলিকে স্কুলে দিয়ে আসে। এসে রান্না করে আবার আনতে যায়। মেয়েকে নিয়ে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে ওরা সবাই ঘুমায়। এই সময় শশী কাপড় ধুয়ে স্নান সেরে ছাদে দিয়ে আসে। এসে নিজে খেয়ে নেয়। একদিন ছাদে কাপড় মেলে নিচে আসার সময় নিচতলার কাজের ছেলেটা ওকে চেপে ধরে। এমন ষন্ডা মার্কা দেহ। নড়তেও পারে না শশী।

সোনালি বিকেল হেলে পড়েছে।

টিয়াগুলো ঝগড়া করে বাড়ি মাথায় তুলেছে। পুরোনো বাড়ির ওপরে এখন দোতলা তিনতলা হয়েছে। গোপাল বাবু আর দীপালি রাণী দুজনেই গত হয়েছেন। শশী ছাদে কাপড় তুলতে এসেছে। বড় ছেলে সজীব আর তার বউ সীমা এখন এই বাড়িতে থাকে। বাদ বাকি সব ভাড়া দেওয়া আছে। ছাদের এই কোণটিই শশীর প্রিয়। এখান থেকে কামরাঙা গাছের তলটা পরিষ্কার দেখা যায়। এখানেই শাবল কোদাল দিয়ে গর্ত করে ছোট কাঁথায় মুড়ে শুইয়ে দিয়েছিলেন বাবার দেহটিকে।

পান্নার বাসার ছাদে শুকনো কাপড় তুলে আনতে গিয়ে পাশের বাসার গরুর রাখাল ওকে জাপটে ধরে পানির ট্যাংকের ওপাশে নিয়ে যায়। ধর্ষণ করে। বাসায় গিয়ে পান্নাকে কিছু বলার আগেই দেরি করে ছাদ থেকে আসার জন্য চড় মারল পান্না। আর ওকে বলতে পারল না। কালো মুখে লজ্জা আর গ্লানির যে আঁচড়, তা কেউ দেখল না। শরীর জুড়ে যে কষ্ট আচমকা রক্তাক্ত করল, তাও কেউ দেখল না।

সন্তান নারীর জীবনে আরাধ্য। শশী গরিবের সন্তান। রূপ লাবণ্য সৃষ্টিকর্তা বেশি দেননি। কালো শরীরে রূপ না থাকলেও যৌবন প্রকৃতির নিয়মেই এসেছিল। আর সেই অনুয়ায়ী মধুলোভী গরুর রাখাল যুবক ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এখানে জীবন মেশিনের মতো। প্রতিদিন ঘড়ির কাটা ধরে দৌড়ানোর ওপর চলতে হয়। ভাবে শুক্রবার ছুটির দিন। সেদিন বলবে। কিন্তু সেদিন সকাল বেলায়ই মেহমান আসে। পান্নার ঢাকায় থাকা ছোট ভাই আর বৌদি। শিশির আর রুপা। ওরা কয়েক দিন সারা দিন হইচই করে কাটিয়ে তারপর চলে গেল।

আর ছাদে গেলেই ওই ছেলে জাপটে ধরে। পরপর কয়েক দিন এ রকম হলো। শশী একদিন পান্নাকে বলল, সে আর এখানে থাকবে না। পান্না তখন বলে

-এখন মৌলি স্কুলে যাচ্ছে। আরেকজন মানুষ এনে তারপর তোকে বাড়ি পাঠিয়ে দেব।

পরের মাসে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করল। বমি শুরু হলো। যা খায়, তাই বমি করে। বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে গেল। পান্না হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার জানালেন, পিরিয়ড বন্ধ। শশী সন্তান সম্ভবা। আকাশ ভেঙে পড়ল পান্নার মাথায়।

মায়ের কাছে ফোন করে সব জানাল পান্না। শশীকে এক মুহূর্ত আর রাখবে না। শশীকে চড় থাপ্পড় মেরে জানতে চাইল, কার সঙ্গে কখন কবে এই কাজ করেছে?

-দিদিগো, আমি তার নামও জানি না। সে তার বংশের বীজ আমার শইল্যে কেমনে দিল? আমি ছাদে গেলে সে আমারে ঠাইস্যা ধরে।

লোক লজ্জার ভয়ে টু শব্দ না করে পান্না আর ওর স্বামী। ওকে বাসে তুলে মায়ের বাসায় ফেরত পাঠাল।

বিজ্ঞাপন

অশিক্ষিত মেয়ে কেঁদে আকুল হয়। বাসে করে আবার গোপাল বাবুর বাড়িতে ফিরে আসে। এই বাড়িটাই ওর কাছে আপন লাগে। দীপালি রাণী দয়াবতী। এখানে এসে সে তার পা জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। পান্না রাণীকে সে যে বহুবার বলার চেষ্টা করেছে, তাও বলে। কিন্তু পান্না আর তার স্বামী দুজনেই বাচ্চাদের নিয়ে এমন ব্যস্ত যে, আর কোনদিকে খেয়ালই করে না। এমনও দিন গেছে, ছাদে সেই ছেলে আগেই ওত পেতে বসে ছিল। ও যাওয়া মাত্রই হামলে পড়েছে। ফিরে এসে বলতে গেছে, ওর কোনো কথাই শোনেনি পান্না। সেই ছেলের লালসার বলি হয়েছে সে। এমনকি, একদিন পান্না মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পর দরজায় কলিং বেল বাজে। শশী মনে করে পান্না। খুলতেই ঘরে ঢুকে পড়ে। সেদিন ওই ড্রয়িং রুমে তার ওপর ছেলেটি ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ছাদের সব কাপড় উঠিয়ে ভাঁজ করে একটা ঝুড়িতে রাখে। ততক্ষণে কমলা রং ছড়িয়ে ঝুপ করে আঁধার হয়ে আসে চারপাশ। কামরাঙা গাছের তলে আঁধার ঘন হয়ে আসে। বুকের ভেতর মুচড়ে ওঠে যেন। মা মা কান্নার ধ্বনি যেন বুকের গহিনে শোনে।

সন্তান নারীর জীবনে আরাধ্য। শশী গরিবের সন্তান। রূপ লাবণ্য সৃষ্টিকর্তা বেশি দেননি। কালো শরীরে রূপ না থাকলেও যৌবন প্রকৃতির নিয়মেই এসেছিল। আর সেই অনুয়ায়ী মধুলোভী গরুর রাখাল যুবক ঝাঁপিয়ে পড়ে। নয় মাস দশদিন পর যে শিশু ভূমিষ্ঠ হয় রাতের গভীরে, সে নাকি কান্নাও করে না। যদিও শশী, গিন্নিমা ও বাবা দুজনকেই বলেছিল সে বাচ্চাটাকে নিয়ে গ্রামে চলে যাবে। সে চায় বাচ্চাটাকে নিয়ে বাঁচতে। কিন্তু তার বাচ্চা পৃথিবীর আলো দেখল না।

এই বাড়ির কামরাঙা তলায় শুয়ে থাকা আপন জঠরের মাংসপিণ্ড ছেলে না মেয়ে ছিল, তাও জানে না। তবে ওই জন্যই এই বাড়ি ছেড়ে আজ ৪০ বছর আর কোথাও যাওয়া হয়নি। মমতায় আর ভালোবাসায় একটিবার শিশুটিকে বুকে যদি জড়িয়ে ধরতে পারত! চোখ বেয়ে জল গড়ায়। বয়স এখন তারও পঞ্চাশ পেরিয়েছে। চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা এখন।

মন্তব্য পড়ুন 0