প্রবাস জীবনের কষ্ট, শুধুই জীবন নষ্ট। বিদেশে কর্মজীবী মায়েদের বড়ই কষ্ট। তাদের সন্তানদের তার চেয়ে বেশি কষ্ট। নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। দূর থেকে সবাই ভাবে, আমেরিকা স্বপ্নের দেশ, এখানে টাকা আকাশে–বাতাসে উড়ে বেড়ায়। মানুষের জীবন সুখের তরী হয়ে যায়, কত ধরনের কথা শুনি! সেই মানুষগুলো যখন এখানে আসবে, সে পারবে না এই কষ্টের সঙ্গে লড়াই করতে। কারণ নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ এক ধরনের বিলাসবহুল জীবন কাটায় দেশে বসে বসে। তা এখানে কোনো দিনই সম্ভব নয়। মায়েরা বাচ্চাদের সময় দিতে পারে না, দুজনে কাজ না করলে সংসার চলে না। বাবাদের তো ব্যস্ততার শেষ নেই, তাদের কথা বাদই দিলাম। প্রত্যেকটা কর্মজীবী মা তাদের বাচ্চাকে ডে-কেয়ারে রাখে। অফিসে যাওয়ার সময় দিয়ে যায়, আবার অফিস শেষে ডে–কেয়ার থেকে বাসায় নিয়ে আসে। মা ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে পড়ে, পর দিন আবার সকালে অফিস। বাচ্চাকে একটু ডিনার করিয়ে আবার ঘুম। কোথায় সেই সময়?

বাচ্চা নিয়ে খেলা, আর তাকে আদর করার সময় নেই! জীবনের কঠিন বাস্তবতা এখানে এমনই প্রবল। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে তিন/চারটা কাজের লোক। কলেজে পড়া ছেলে–মেয়েদের মায়েরা মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। সুখ সুখ আর সুখ। তারপর কত মানুষ আছে বিদেশিদের এই কষ্টের টাকা দিয়ে দেশে পায়ের ওপর পা তুলে খায়। আর টাকা দিতে না পারলে তখন অন্য রকম কথাবার্তা। দেশের অনেক মানুষ কোনো দিন ভুলেও ভাবে না, এই টাকা কীভাবে উপার্জন করা হয়। অবুঝ শিশুরা জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে, কখন তাদের মা বাসায় আসবে, কোলে নেবে আদর করবে। সে স্বপ্নটি পূরণ হওয়ার আগেই সে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায়। হয়তো মাকে স্বপ্নেই শুধু দেখে। শনি, রবি দুই দিন, উইকএন্ডে অফিস বন্ধ থাকে। তখন আরও বেশি কাজ। সাপ্তাহিক রান্না, বাজার, ঘর ক্লিন, কাপড় লন্ড্রি, অতিথি আসলে আপ্যায়ন করা, নিজের আর বাচ্চার জন্য সময় কই?

বাস্তবতা বড় কঠিন, তার থেকে বাঁচার উপায় নেই। জীবন চলছে তার নিয়মে। মানুষ যেন যন্ত্র। এ যন্ত্রের জীবন টের পাওয়া যায় বিদেশে আসলে। প্রথম কিছুদিন সংগ্রাম করে জীবন সাজানোর অদম্য বাসনা থাকে। এরপর যখন টের পাওয়া যায়—এ এক ভিন্ন চক্রে জীবনের ঘানি টানা। হয় অভ্যস্ত হয়ে পড়া, নয় মানিয়ে নেওয়া! পেছনে আর ফিরে যাওয়া যায় না। দেশের সঙ্গে সম্পর্কগুলোও ছিন্ন হতে থাকে। এভাবেই পাল্টে যায় গ্রাম বাংলায় দেখা জীবনে নানা রঙের স্বপ্নের বুনন। জীবন ভেসে বেড়ায় এক কষ্টকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। এ কষ্টের, এ লড়াইয়ের নানা পর্যায় প্রায় সব প্রবাসীর জন্য সমান। কষ্টের একই রং। বেদনার নীল রঙের সঙ্গে এই ধূসর রং ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন
সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন