default-image

পাতা ঝরার দিন এসেছে। নিস্তব্ধ দুপুরে কান পাতলে শোনা যায় পাতার মর্মর ধ্বনি। হরিণের ঝাঁক পাতার ওপর মচমচ শব্দ তোলে। কিংবা খরগোশের দল লাফিয়ে চললেও বুঝতে পারি। আসলে একা থাকাটাই আমাকে সবগুলো শব্দকোষ পৃথক করে বুঝতে সহায়তা করছে। আমার ডাক্তার স্বামী হাসপাতালের ডিউটিতে যায় সাত-সকালে। আমাদের বিয়ে হয়েছে তিন বছর। আমরা আগে একটা দুই রুমের বাসার এক রুমে সাবলেট থাকতাম। আমার ভালো লাগত না। সঙ্গে থাকতেন নাসিম ভাই; আমার স্বামী শফিকের বন্ধু ও ভাই। মামাতো ভাই। তো সেই ভাইকে দেখতাম ভোরে গিয়ে রাতে ফিরতে। আমি রান্না করে তাঁর জন্য টেবিলে রেখে দিতাম। তিনি ছয় দিন কাজ করতেন। আমাকে বলতেন, ‘শনিবার তোমার ছুটি।’ সেদিন দুপুরে তিনি রান্না করতেন। শনিবার ছুটি; আমরা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতাম। সন্ধ্যায় এসে মজার মজার নানা পদের রান্না খেতাম।

তারপর শফিক রেসিডেন্সি শেষ করে হাসপাতালে চাকরি শুরু করল। আমিও অ্যাটর্নি অফিসে কাজ শুরু করলাম। এক বছর থাকলাম ওই বাসায়। এর ভেতর আমার মিসক্যারেজ হয়ে গেল। শফিকের প্রচণ্ড মন খারাপ হয়। কাজে যাওয়ার সময় এলে আমি স্নোয়ের ওপর পিছলে পড়ে যাই। সাদা তুষার লাল রক্তে ভিজছে। আমাদের অনাগত ভবিষ্যৎ সাদা তুষার লাল করে মিশে গেল। আমিও খুব কষ্ট পেলাম। শফিক তখনই সিদ্ধান্তে নিল—আমার চাকরি করার দরকার নেই। আমিও আসলে ভেঙে পড়েছিলাম।

সে যাক, এর পর আমরা বাড়ি কিনলাম; ভার্জিনিয়ার স্প্রিংফিল্ডে। খুব সুন্দর বাড়ি। সেই বাড়ির চারপাশ ফাঁকা। সামনের বাগান পেরিয়ে রাস্তা। সেই রাস্তা দুই ব্লক গিয়ে মেইন রাস্তায় পড়েছে। আমি একা সারা দিন বাড়িতে। শফিক যাওয়ার পরপরই আমি কখনো খেয়ে নিই সকালের নাশতা, তারপর ঘুম দিই। আসলে আমি প্রথম প্রথম চারপাশের জানালা দিয়ে প্রকৃতি আর তার নানা রূপ দেখতাম। রান্না করতে করতে হরিণ আসতে দেখতাম। কাঠবিড়ালির গাছ বেয়ে ওঠা দেখে মাশার গল্প মনে পড়ত। দোতলার শোয়ার ঘরে মস্ত জানালা। সেখান থেকে দেখা যায় লেকের জল। উড়ে আসে দল বেঁধে বুনোহাঁস। আমি তাদের জলকেলি দেখি মুগ্ধ হয়ে।

এই বাড়িতে না এলে আমি বুঝি প্রকৃতির রং বদল জানতামই না। আসলে ফুল-পাখি-নদী—সবকিছু মিলে মিশে এক মনোহর জীবন আমার। পাতা ঝরার দিন শেষে আমি আবার আমার সিগন্যাল পাই। পিরিয়ড হচ্ছে না। শফিককে বললে ও বলল, আসার সময় টেস্টিং কিট নিয়ে আসবে। পজিটিভ রেজাল্ট আসাতে আমাদের মন খুশি। আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকি। আমার বুকে দুঃস্বপ্নের মতো সাদা তুষারের কণা লাল হয়ে জমাট বাঁধে।

বিজ্ঞাপন

আমার কাজে সাহায্য করার জন্য এজেন্সিতে যোগাযোগ করে শফিক। কালো বুড়ি মারিয়া আসে। সে ঘরদোর পরিষ্কার করে স্যুপ আর ভেজিটেবল রান্না করে। ব্রেড বা কেক বেক করে। আমি মাছ-মাংস রান্না করি। মারিয়া কাজ করে, আর কথা বলে। সে জ্যামাইকান। সম্ভবত তার পূর্বপুরুষ ভারতীয়। মারিয়ার বয়স প্রায় ষাট। কিন্তু সে বাচ্চার জন্ম দেওয়ার সময় একলামশিয়া ভোগে। তার দুই নম্বর বাচ্চা হওয়ার পর সে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছিল। তখন তার স্বামী তার দুটো বাচ্চাসহ জ্যামাইকায় ফিরে যায়। সেন্টার বা নার্সিংহোমে প্রায় দুবছর চিকিৎসা নেওয়ার পর ভালো হয় মারিয়া। তার বয়স তখন বত্রিশ। স্বামীর খোঁজ পায় না। হাইস্কুল পাস; কী করবে কোথায় যাবে। তখন ওই নার্সিহোমে ক্লিনার হিসেবে কাজ পায়। নার্সিংহোমে থাকার ব্যবস্থাও হয়। আরও পরে সে এজেন্সিতে নাম লেখায়। ওই এজেন্সির মাধ্যমে সে কাজ করে বিভিন্ন পরিবারে। এখন সে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। এগুলো বকবক করে বলে প্রতিদিন।

কালো স্থূল শরীরের মারিয়ার চোখগুলো জ্বলজ্বলে বেশ। চুল ছোট করে কাটা। মারিয়ার কাজের সময় ৮টা থেকে বেলা ২টা। কিন্তু মারিয়া ৩টা পর্যন্ত থাকে। বেশিও থাকে কখনো কখনো। সে ভালোবাসে আমার যত্ন নিতে। আমার কোনো বিপদ যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সে খুব সতর্ক। কালো চামড়ায় মোড়ানো এক নারীর ভেতর আমি মমতাময়ী এক মাকে দেখি, যে সাত-সকালে এসেই আমাকে ব্রেকফাস্ট দেয়। চা বা কফি নিয়ে একসঙ্গে ব্যালকনিতে বসে কফি খাই। আমার নাম পাপড়ি। মারিয়া আমাকে পপি ডাকে। ঘরের মেঝে ঝরঝরে করে মোছে। আমাকে তখন হাঁটতে দেয় না। ঘর শুকানোর পর সে আমাকে বলে, ‘নাউ ইউ ক্যান ওয়াক।’

এক ঘণ্টা হালকা ব্যায়ামের পর লাঞ্চ করি। মারিয়া পরম মমতায় সব সময় আমাকে আগলে রাখে। মারিয়ার ঘণ্টা ধরা সময় শেষ হলেও সে যায় না। সে আমার বৈকালিক ভ্রমণের সঙ্গী হয়। কোনো দিন শফিক ফিরলে তিনজন একসঙ্গে ডিনার করি। সব গুছিয়ে মারিয়া চলে যায় ‘গুড নাইট’ জানিয়ে। শফিক মারিয়াকে এই বাড়তি সময়ের জন্য পে করতে চাইলে সে কেঁদেকেটে আকুল। বলে, এটুকুই তার আনন্দ। আজ বছর ঘুরেছে। না আমি মা হতে পারিনি। ছয় মাসের মাথায় একদিন শেষরাতে প্রচণ্ড ব্যথা। হাসপাতাল-নার্স-ডাক্তার-সিরিঞ্জ; কাটাছেঁড়া। কী বিশাল এক শূন্যতা নিয়ে আমি ফিরে আসি! বাসাটা খাঁ খাঁ করে। মারিয়া আসে। মারিয়া বকবক করে; কাঁদে। আমি দুদিন পর মারিয়াকে বিদায় করে দিই। শূন্য ঘরে কাজ করি আপন মনে। গান শুনি। ছুটির দিনে শফিকের কোলে মাথা দিয়ে গান শুনি। কেঁদে বুক ভাসাই। আমি কাঁদলে শফিক বিরক্ত হয়। বলে, ‘চলো বাইরে যাই।’ শপিং মলে গিয়ে আমাকে অডিও কিনে দিল। রাতে ডিনার করে আইসক্রিম খেয়ে ফিরে আসি।

সকালে শফিক কাজে চলে গেলে আমি একটা অডিও চালু করে কফি বানাতে দিয়ে ব্রেড টোস্ট করছি। সূরের মূর্ছনা আমাকে আকুল করল। বেটোফেন যে মেয়েটিকে ‘মুনলাইট সোনাটা’ উৎসর্গ করেছিলেন, ১৭ বছর বয়সী সেই মেয়ের নাম কাউন্টেসা গুয়েলিটা গুইচ্চিআরদি। এই মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন বেটোফেন। মেয়েটি বেটোফেনের ছাত্রী ছিল। সেই মুনলাইট সোনাটার মধ্যে কী জাদু ছিল জানি না। আমি যেন এর গভীরে ঢুকে যেতে লাগলাম। আমার মুক্তি যেন এই সুরে। একাকিত্ব আমাকে ছুঁতে পারে না। আমি একা এই সুরের ভেতর হাজারো আমি হই। টুকরো হয়ে ভাঙি। জুড়ে জুড়ে ফেলি নিজেকে। আমি শোকের সময় কাটিয়ে বেদনার ভেলা ভাসিয়ে এক নতুন আলো খুঁজে পাই। আমি বাঁচার জন্য জীবনের নতুন দিগন্ত খুঁজে পাই।

এক সকালে শফিক অফিসে গেলে আমি কী রান্না করব ভাবছি, তখন হঠাৎ সুরের আওয়াজ কানে এল। আমি পেছনের ডেকে বের হয়ে দেখি লেকের পাড়ে একজন পা ছড়িয়ে বসে বেহালার ছড় টানছে। সেই সুর লেকের জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে তান তুলেছে। আমি ধীর পায়ে বেডরুমের জানালায় পৌঁছে শুনতে থাকি নিমগ্ন হয়ে সে সুর; ক্ষুধা-তৃষ্ণা সব ভুলে।

ওই লোকের নাম নিকোলাস। তার বেহালার জাদু আমাকে এক অচেনা সুখের জগতে নিয়ে গেল। এই সুর আমাকে শফিকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যায় দূরে। ছোট ছোট সুখের এক অতল তলে হারিয়ে যেতে যেতে আমি বুঝতে পারি যে আমি ভীষণ একা। আমার একাকিত্ব থেকে এই সুরের জাদুকর আমাকে মুক্তি দিল। আমি নিকোলাসের প্রেমে শফিককে ছেড়ে চলে যাই। নিকোলাসের টাকার পাহাড় নেই। কিন্তু আছে এক বিচিত্র জীবন। আমাদের ক্যারাভান আমাদের নিয়ে যায় নিত্য নতুন শহরে। আমাদের পুতুলের মতো দুটি সন্তান; জেসিকা আর লারা। আমি ওদের সোনালি চুলে রিবন দিয়ে ঝুঁটি বেঁধে দিই। নিকোলাস আর আমার পরিরা বেহালায় সুর তোলে। আমি সেই সুরে ডুবে যেতে থাকি। আমার মতো সুখী কে?

একাকিত্ব মানুষের জীবনে এক শূন্যতা তৈরি করে। আর সেই শূন্যতা গভীর কোনো ভালোবাসায় পূর্ণতা পায়। ভালোবাসা, মায়া, আর মমতায় মিলেমিশে বর্ণিল হয়ে ছড়িয়ে পড়লে জীবন ভরে যায় আনন্দে। শফিকের জন্য আমার কোনো দীর্ঘশ্বাস নেই। তিল তিল করে জমে থাকা অবহেলার পাহাড়ে যে অভিমান চাপা পড়ে ছিল, তা শুধু খোলসের মতো জড়িয়ে রাখে। সে খোলস ছেড়ে বের হয়ে মুক্ত হতে পেরেছি বলেই আমি আনন্দিত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0