আত্মহত্যার আগে

বিজ্ঞাপন
default-image

আর কিছুক্ষণ পর আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি। তবে কীভাবে আত্মহত্যা করবে, তা এখনো ঠিক করা হয়নি। আমি এই গল্পের প্রধান চরিত্র—অয়ন। আমার নিয়তি লেখক এই মুহূর্তে কী প্রশান্তিতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করছেন। হয়তো মনে মনে আমার মৃত্যুর ছক কাটছেন। কী নিষ্পাপ অন্যমনস্কতা তাঁর চোখে-মুখে। অথচ আরেকটু পরই তিনি আমাকে খুন করবেন।

খুন? হ্যাঁ, খুনই তো! আমি তো আত্মহত্যা করতে চাইনি। আমার বাবা-মা, ভাইবোন, এক বছরের বিবাহিত স্ত্রী—এদের ফেলে কেন আমি আত্মহত্যা করব?

মানলাম আমার স্ত্রী ইদানীং আমাকে ভীষণ সন্দেহ করছে। কিন্তু সেটা তো তার মানসিক চাপের জন্য হচ্ছে। তিন মাসের গর্ভবতী সে! খুব ভালো ছাত্রী। এবার তার মাস্টার্স পরীক্ষা দেওয়ার কথা। জানা কথা তার রেজাল্ট ভালো হবে। হলে সে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই লেকচারার হিসেবে যোগ দেওয়ার অফারও পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ায় সে মনে মনে হয়তো আমাকেই দায়ী করছে। না খেতে পেরে আর ক্রমাগত বমি তাকে একেবারেই দুর্বল করে ফেলেছে। এর মধ্যে দুবার হাসপাতালে নিতে হয়েছে তাকে।

আমার কী দোষ বলুন? লেখকই তো আমাকে দিয়ে জোর করে লেখাপড়া চলা অবস্থায় সাথীকে বিয়ে করিয়েছে। উপরন্তু এখন সাথী সন্দেহ করছে আমার সঙ্গে অন্য মেয়ের সম্পর্ক আছে। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলেই বা কাজের ব্যস্ততায় ফোন না ধরলেই সে সন্দেহ আরও বেড়ে যাচ্ছে। বাসায় ফিরলেই মোবাইল চেক করে, শার্টে আঁতিপাঁতি করে খোঁজে, কী খোঁজে সে? লিপস্টিকের দাগ, চুল? আমি কি এমন লোক!

অথচ লেখকই সম্পূর্ণ দায়ী এর জন্য।

অফিসের কলিগ মলিকে একদিন রাত হয়ে যাওয়ায় লিফট দিয়েছিলাম ঝড়বৃষ্টির মধ্যে। একটাই সিএনজি পাওয়া গিয়েছিল এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে। কিন্তু মলির বাসা কাছে হওয়ায় যেতে রাজি হচ্ছিল না ড্রাইভার। আজেবাজে লোকজন ছিল পাশের চায়ের স্টল ঘেঁষে। তাই মেয়েটাকে একা রেখে যেতেও খারাপ লাগছিল।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি তো শুধু তার বাসা পর্যন্তই লিফট দিয়েছিলাম। নামিয়ে চলে এসেছি। সাথীকে বাসায় এসে সব বলেছিও। তবুও লেখক ব্যাটা আমাকে সন্দেহ করাচ্ছে। এর পর মলির সঙ্গে অফিসে যতবার দেখা হয়েছে, শুধু সালাম আর কুশল বিনিময়-এর বাইরে তো কিছুই হয়নি।

আর ভালো লাগছে না। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লেখক আমার গল্পটা শেষ করে দেবেন। অথচ আমি তো মরতে চাই না। আমি সাথীর ভুল ভাঙাতে চাই। আমার অনাগত সন্তানের বেড়ে ওঠার প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করতে চাই। আমাকে কেন এমন শাস্তি মাথা পেতে হবে? এ কী তবে রানুর দেওয়া অভিশাপ!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

খালাতো বোন রানুকেও তো আমি বোন ছাড়া অন্য কোনো চোখে দেখিনি। উচ্ছল রানু অনেকবার আকারে-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। বোন হিসেবে ওর সব আবদারই আমি পূরণ করতাম। অথচ ওগুলোকে সে ভালোবাসা ভেবে ভুল বুঝত। একবার বিলের মাঝ থেকে কনকনে শীতে শাপলা তুলে এনেছিলাম ওর জন্য। শাপলাগুলো হাতে নিয়ে হঠাৎ রানু আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল আবেগে। আমি জোর করে সরে এসেছিলাম বলে ও খুব রেগে গিয়ে আমাকে অভিশাপ দিয়েছিল—কখনই সুখী হব না আমি ওকে ছাড়া। তবুও আমি কিছু বলিনি। চুপিসারে চলে এসেছিলাম ঢাকায়, আর ফিরে যাইনি। কেমন আছে রানু এখন?

পায়ের শব্দে চমকে বাস্তবে এলাম। ওই তো লেখক ফিরে আসছেন। হয়তো আমার মৃত্যুর মঞ্চ মনে মনে রচনা করে ফেলেছেন। আর সময় হাতে নেই বেশি! প্লিজ কেউ কি আছেন? কেউ শুনতে পাচ্ছেন? আ...আমি মরতে চাই না...। আমি বাঁচতে চাই। আমাকে একবার সুযোগ দিন নতুন করে বাঁচবার...শুনছেন...

চেয়ারে বসে কলমটা টেনে নিলেন লেখক। সুন্দর মুক্তোর মতো হস্তাক্ষরে লিখতে শুরু করলেন—আজ আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি। আর কিছুক্ষণ পরই...!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন