হেমন্তের এই সময়ে ভারমন্ট সাজে বর্ণিল সাজে; গাছে গাছে থাকে বহু-বিচিত্র রঙের পাতার অলংকার
হেমন্তের এই সময়ে ভারমন্ট সাজে বর্ণিল সাজে; গাছে গাছে থাকে বহু-বিচিত্র রঙের পাতার অলংকারছবি: লেখক

আমি এবং আমার স্ত্রী ঊষা। এ সময়টিতে বেড়াতে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নেই আমাদের। বড় ছেলে রেজওয়ানের পীড়াপীড়িতে রাজি হতে হয়। এক মাস আগে এয়ারবিএনবি বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছিল। গন্তব্য ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের একটি ছোট শহর, ওয়েস্ট ডোভার। তিন দিনের প্রোগ্রাম, হেমন্ত ঋতুর রঙিন পাতাদের এ পাহাড়ি রাজ্যে।

৯ অক্টোবর শুক্রবার। রেজওয়ানের অফিস ছিল বলে আমরা দেরিতে যাত্রা করি। নিউইয়র্কের নগরকেন্দ্র থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা ড্রাইভ। সড়ক পথে এখন পাতা ঝরার সময়। রাত ১০টায় জিপিএস আমাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর ঘোষণা জানান দেয়।

বাড়িটি বিশাল। ১২ জনের থাকার সুপরিসর আয়োজন। আমরা মাত্র পাঁচজন। আমাদের দুই ছেলে, স্ত্রীর বড় ভাই জুয়েল ভাই, ঊষা ও আমি। আমাদের সঙ্গে দুই পরিবারের আরও অন্তত ছয়জন যাবেন—মূল পরিকল্পনায় তেমন ছিল। সব পরিকল্পনাতেই চায় এক, আর নানা কারণে ঘটে আরেক। পাঁচজনের জন্য ওয়েস্ট ডোভার শহরের এ বাড়িটি অযাচিতভাবে অতি-স্বাচ্ছন্দ্যের হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

পৌঁছানোর পর, গভীর অন্ধকারে আকাশের তারা দেখা ছাড়া আর তেমন কিছু করার ছিল না। রেজওয়ান তারা দেখা শুরু করেন। অন্যরাও যুক্ত হই। কৈশোরে গ্রামের বাড়িতে মেঘমুক্ত রাতে, আকাশে যেমন তারার রাজ্য দেখা যেত। দূর দেশের অচেনা শহরের একই আকাশে সেই একই তারার মেলা। নিউইয়র্কের আকাশে তারার এমন মেলা কি দেখা যায়? খেয়াল করিনি। উঁচু সব অট্টালিকার সারিতে আকাশের তারারা হয়তো উঁকি দেয় কোনো ফাঁকে। ব্যস্ত নাগরিকের বিকারহীন ত্রস্ততায় এসব আর দেখা হয় না।

পরদিনের সকালটি রৌদ্রোজ্জ্বল ছিল। তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অক্টোবর মাসে ভারমন্টের আবহাওয়া এর চেয়ে ভালো আশা করাটা অনুচিত হতো। স্থানীয় এক রেস্তোরাঁয় ব্রেকফাস্ট করে একটি হাইকিং ট্রেইলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।

হেমন্তের এ সময় ভারমন্ট রাজ্যের বিশেষ আকর্ষণ; বিচিত্র রঙের পাতা-সমৃদ্ধ সারি সারি গাছ। শত শত মাইলজুড়ে ঘন পাহাড়ি গাছের জঙ্গল। একেকটি গাছের পাতা একেক রঙের। গুচ্ছ গুচ্ছ হলুদ, লাল, কমলা, সবুজ, নীল, মেজেন্টা, সোনালি, কত রং! কী অদ্ভুত দেখায়! ছবিতে যেমন দেখা যায়। তবে সশরীরে উপস্থিত হয়ে, জীবন্ত সুন্দরকে অবলোকন করার উপলব্ধি আলাদা।

default-image

ওয়েস্ট ডোভারের পাশের শহর উইলমিংটন। ঝরনার মতো ডিয়ারফিল্ড নদীটি বয়ে গেছে পাশ দিয়ে। ৭৬ মাইল লম্বা এ জলধারা, দক্ষিণ ভারমন্ট থেকে উত্তর-পূর্ব ম্যাসাচুসেটস হয়ে কানেকটিকাট নদীর সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। উইলমিংটন শহরে গাছপালা বেষ্টিত রে-হিল সড়কটি ডিয়ারফিল্ড নদীর পার ঘেঁষে চলে গেছে। রে-হিল রোডে একটি স্ট্রিপ মলের পার্কিং লটে আমরা গাড়ি পার্ক করি। একটি সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে নদীর অপর পারে চলে যাই। উইলমিংটন ট্রেইলটি সেখান থেকেই শুরু হয়েছে। দুই মাইল দীর্ঘ হাইকিং। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। প্রধানত সমতল মেঠো রাস্তা। আবার কোথাও উঁচুনিচু, পাথুরে ও আঁকাবাঁকা। গাছের শিকড় পুরো রাস্তাজুড়ে। ট্রেইলটি ধরে একটু এগোলে, ডান পাশে ডিয়ারফিল্ড নদী। দুই মাইল হাঁটার পর যে জায়গাটিতে পৌঁছাই, সেখানে নদীর পারে বসার জায়গা। ৪০ মিনিট সেখানে বসে বিশ্রাম নিয়ে আবার একই পথে ফিরে আসি।

রাতে একটি রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে বাসায় ফেরা। কিছু সময় আড্ডার পর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। ঘুমের অতলান্ত প্রশান্তি! পরদিন ১১ অক্টোবর রোববার। আবহাওয়া এ দিনেও খুব সুন্দর ছিল। বাইরে উজ্জ্বল রোদ। তবে তাপমাত্রা আগের দিনের চেয়ে একটু কম। ঘুম থেকে উঠে নিচে নেমে দেখি, বসার ঘরে কেউ নেই। চা বানিয়ে খেয়ে নেব ভাবছি। ভাগ্যক্রমে, ঊষার যে আজ জন্মদিন, সেটি মনে পড়ল। ঊষার জন্মদিনে একটা পোস্ট দেব ফেসবুকে, আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম। সেটি লিখতে লিখতে ভাবছি, করোনাভাইরাস চলে যায়নি, বরং প্রত্যাঘাত হানছে। দ্বিতীয়বারে, যুক্তরাষ্ট্রের নানা অঙ্গরাজ্যে সংক্রমণ ঘটছে।

বিজ্ঞাপন

নিউইয়র্কে এবারের সংক্রমণের হার তত উদ্বেগজনক এখনো নয়। নিউইয়র্কের নাগরিকেরা এ জন্য প্রশংসার দাবিদার বলে রাজ্যের গভর্নরসহ অনেকেরই ধারণা। তবে এই হারকে স্থিত রাখতে এ জনপদের মানুষকে অব্যাহতভাবে চৌকস থাকার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কোভিড মহামারির এ পর্যায়ে অবকাশ যাপনে বের হওয়া কি ভালো সিদ্ধান্ত হলো?

রেজওয়ানের ধারণা অনুযায়ী ভালো ছিল এ সিদ্ধান্ত। নিউইয়র্কের চেয়ে ভারমন্ট রাজ্যে করোনা সংক্রমণের হার কম। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে কম ভাইরাস সংক্রমণের হার এই রাজ্যে। জীবাণুনাশক দিয়ে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে এয়ারবিএনবির এ বাড়ি। আমাদের দলের অধিকাংশের মত হচ্ছে—আজ আর হাইকিং নয়। গাড়িতে করে ভারমন্টের সৌন্দর্য দেখতে বের হওয়া যায়।

একুইনোক্স পর্বতটি ভারমন্টের ম্যানচেস্টার শহরের উপকণ্ঠে বেনিংটন কাউন্টিতে পড়েছে। এটি এ অঞ্চলে অবস্থিত টাকোনিক পর্বতশ্রেণির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। একুইনোক্সের উচ্চতা ৩ হাজার ৮৫৫ ফুট। বেলা সাড়ে ১১টায় আমরা পাঁচজন আমাদের রুপালি রঙের অ্যাকোরা এমডিএক্সে চেপে বসি। রেজওয়ান ড্রাইভিং সিটে। কালো পিচ ঢালা রাস্তার মাঝখানে উজ্জ্বল হলুদ রঙের ডাবল-সলিড বিভাজক রেখা। দুই পাশে সারি সারি গাছ। বিচিত্র রঙের পাতা পড়ে আছে পরিচ্ছন্ন রাস্তার ওপর। প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সুনিপুণ সংমিশ্রণ এখানে। ঘণ্টাখানেক ড্রাইভ করে একুইনোক্স পর্বতের পাদদেশে পৌঁছাই।

আঁকাবাঁকা ও ঊর্ধ্বমুখী প্রায় সাড়ে পাঁচ মাইলের পাহাড়ি পথ। চূড়ায় পৌঁছাতে হবে। দৃশ্য অবলোকনের জন্য পরপর থামার জায়গা রয়েছে, গাড়ি পার্কের ব্যবস্থাসহ। নেমে হাঁটা যায়, দেখা যায় অপরূপ দৃশ্য, ছবি তোলা যায়। পর্যবেক্ষণ স্পটগুলোও পরিকল্পিতভাবে সাজানো। ওখান থেকে দিগন্তের নানা স্থাপনা ও অন্যান্য যে পর্বত দেখা যায়, সেসবের প্রতিটির বর্ণনা লিখে রাখা হয়েছে সেখানে যত্ন করে। একটি স্পটে ‘মনাস্টারি ওভারলুক’ লেখা একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। সেখান থেকে কারথুসিয়ান সন্ন্যাসীদের আশ্রম চোখে পড়ে। ১০৮৪ সালে জার্মান বংশীয় পুরোহিত সেন্ট ব্রুনো কারথুসিয়ান নামের একটি ধর্মীয় দলের সূচনা করেছিলেন, ছয়জন সঙ্গী নিয়ে। একাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের গ্রেনোবেল অঞ্চলের একটি পর্বতে কথিত পবিত্র আত্মার নির্দেশে বেড়ে ওঠা এ দল কারথুসিয়ান বা কার্দোজিয়ান সন্ন্যাসী হিসেবে পরিচিতি। এরই অনুসরণে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত রসায়নবিদ জোসেফ জর্জ ডেভিডসন গত শতকের ষাটের দশকে একুইনোক্স পর্বতে এই আশ্রম নির্মাণ করেন। সারা বিশ্বে এমন ২৫টি আশ্রম রয়েছে। উত্তর আমেরিকায় কারথুসিয়ানদের প্রথম ও একমাত্র আশ্রম এটি, যা নির্মাণ করতে পাঁচ বছর লেগেছিল।

পর্বতের একেবারে চূড়ায় রয়েছে মূল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। পরিচ্ছন্ন বাথরুম। রয়েছে নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করলেই ডান পাশে স্বয়ং সেন্ট ব্রুনোর মূর্তি। রয়েছে সন্ন্যাসীর প্রতিকৃতি ও নানা তথ্য। বসার ব্যবস্থাও আছে। খাবারের কোনো দোকান সেখানে নেই। খাবার সঙ্গে নিয়ে গেলে সেখানে বসে পিকনিক করার ব্যবস্থা রয়েছে।

একুইনোক্স পর্বত থেকে ফিরতে আমরা দীর্ঘ পথ ধরেছিলাম, যাতে ভারমন্টের মৌসুমি এ অচেতন করা সৌন্দর্য সর্বোচ্চ উপভোগ করা যায়। পরদিন এয়ারবিএনবির বাড়িটি ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না। মনে হচ্ছিল, আরও কিছুদিন এখানে পড়ে থাকতে পারলে ভালো লাগত। বাইরে ঝরঝর বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যে ড্রাইভ করে ভারমন্ট থেকে ফিরে আসা। আবারও চার ঘণ্টার ড্রাইভ। সামনে কোলাহলের নগরী নিউইয়র্ক।

মন্তব্য পড়ুন 0