default-image

গুরুদাসপুর

মনিজা রহমান

চোখ বুজতে সেই তরুণী মেয়েটির মুখচ্ছবি ভেসে উঠল মানসপটে।

‘স্যার, আপনার শরীর ভালো আছে?’ চালকের আসনে বসা প্রবীরের হাসিখুশি চেহারাটা দেখতে পান মহসিন আলী।

নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে আজ এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করবেন মহসিন আলী। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না বলে আয়োজকদের একজনকে অনুরোধ করেছিলেন বাড়ি থেকে তুলে নিতে।

’শোন প্রবীর, আমি কিন্তু সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করিনি। সংগঠক ছিলাম। রাজশাহী থেকে মুক্তিকামী মানুষদের নিয়ে যেতাম ভারতে। আবার ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, অস্ত্র-গোলাবারুদ পৌঁছে দিতাম ক্যাম্পে। গুরুদাসপুর, চলনবিল, বড়াই গ্রাম ছিল আমার এলাকা। মোট সাতবার এভাবে ভারত গেছি আর এসেছি। এই যাওয়া–আসার পথে একবার আশ্রয় নিয়েছিলাম এক বাড়িতে।’ এখানে এসে থেমে যান মহসিন আলী।

মৃত্যু, রক্ত, যুদ্ধ, বীভৎসতা যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবু একটি ঘটনা কোনোভাবে মেনে নিতে পারেন না মহসিন আলী। যে ঘটনা বারবার তাঁকে দাঁড় করায় অপরাধীর কাঠগড়ায়।

মহসিন আলী বলতে থাকেন, ‘তারিখটা আমার এখনো মনে আছে। ১৯৭১ সালের ১৮ আগস্টের ঘটনা। তখন সারা দেশ বন্যায় প্লাবিত। বুক সমান বন্যার পানির মধ্যে প্রায় তিন মাইল হেঁটে লালপুর এলাকার ওই বাড়িতে যখন পৌঁছাই, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সারা শরীর ছেয়ে গেছে রক্তচোষা জোঁকে। শরীরের জোঁক সরিয়ে আশ্রয় চাইলাম। শুধু মা আর মেয়ে ছিল ওই বাড়িতে। ওরা প্রথমে গোসলের ব্যবস্থা করল। তারপর রাতের খাবারের বন্দোবস্ত করল। কীভাবে খবর পেয়ে রাজাকারের একটি দল এল ওই বাড়িতে।’

‘মেয়েটার বয়স কত ছিল?’ –মহসিন আলী থামতে প্রবীর জানতে চায়।

–‘এই সতেরো কি আঠারো। ওই টুকুন মেয়ে রাজাকারদের ধমকের সঙ্গে বলল, ভেতরে আমার অসুস্থ স্বামী শুয়ে আছেন। আপনারা কেন এত রাতে বিরক্ত করছেন?’ মেয়েটির ধমকে রাজাকাররা চলে গেলে আমি দ্রুত বাড়িত্যাগ করি। তারপর ভারতে চলে যাই। ২৩ আগস্ট ১৬ জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ওই পথে ফেরার সময় জানতে পারি, আমার চলে যাওয়ার দুই দিন বাদে রাজাকাররা এসে মা আর মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে। তারপর আর ওদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।’

মহসিন আলী আজও জানেন না মেয়েটির নাম কি ছিল। মফস্বল শহরের এক সাধারণ মেয়ে। বুকে যার জন্মভূমির প্রতি অসীম ভালোবাসা।

বিজ্ঞাপন

প্রাপ্তি

মারজানা সাবিহা শুচি

‘ও বাবা তোবরেজ, দাওনা দুই মুঠা চাউলই দাও…খোকার মা বড় আশা করে বইসে আছে!’

তোবরেজ দোকানদার কিপটামিতে নামকরা, একবার যখন বলেছে বাকিতে দেবে না, আশা কম। তবুও মিনতি করে বুড়ো মালেক। কানাইগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি ক্যাম্প উড়িয়ে দিয়েছে, দোকানের সামনে বসে দুই/চারজন সেই গল্প করছিল। একজন বলল, ‘দাওনা তোবরেজ, বুড়ো মানুষটা এত করে চাইছে!’

‘না, না, ওসব বাকির ব্যবসা হবে না!’ তোবরেজ বিরক্তিতে হাত নাড়াল যেন মাছি তাড়াচ্ছে, ‘যান তো কাকা, এইটা দানছত্র পাইছেন নাকি!’

শেষ আশাটুকুও নিভে যায়। বুক খামচে ধরা ব্যথায় চোখে পানি চলে আসে। বিড়বিড় করে ‘আচ্ছা আচ্ছা’ বলতে বলতে সরে আসে বুড়ো। খালি হাতেই ফিরবে? কোথায় কার কাছে আর সাহায্য চাইবে!

স্কুল মাস্টার ছেলেটা থাকতে কীভাবে কীভাবে জোগাড় করে ফেলতো খাবার। এখন সেও নেই, আর যুদ্ধের বাজারে সবকিছুই আক্রা। শহর ছেড়ে পালিয়ে আসা স্বজনের ভিড় বাড়িতে বাড়িতে, সবাই টানাটানির মধ্যে। কিন্তু সপ্তাহখানেক শাক পাতা খেয়ে তাদেরও আর চলছে না। খোকার মা একেবারে বিছানায় পড়ে গেছে। বাকিতে একটু চাল ডাল যদি পাওয়া যায়—ভয়ে ভয়েই এসেছিল তোবরেজের কাছে।

সন্ধ্যার পর পেটে পাথর বেঁধে উঠোনে বসেছিল দুই বুড়োবুড়িতে, পায়ের শব্দে চমকে তাকাল।

‘ও কাকা!’ -চাপা গলার ডাক শোনা যায়। তোবরেজ নাকি!

‘আসো’—বলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই বেড়া সরিয়ে ঢোকে তোবরেজ। হাতে ছোট একটা বস্তা। ধপ করে সেটা উঠোনে নামিয়ে বলে, ‘কাকা, এই রাখেন, এক সপ্তার জন্য যা যা পারি দিয়া গেলাম। পরে আবার দেবো নে। আপনের যাওয়া লাগবে না কাকা, আমিই আসব। খালি কাউরে এইটা বলেন না আপনে।’

‘বাবা...?’ বিস্ময়ে কথাটা শেষ করতে পারে না মালেক, চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকে। পাশে দাঁড়ায় খোকার মা-ও।

‘কাকা’, না-বলা প্রশ্নটা বুঝে নেয় তোবরেজ, ‘আপনের পোলা মুক্তিযুদ্ধে গ্যাছে এইটা বলেন নাই কেন আমাকে! পরে শুনলাম! সে আমাগোর জন্য স্বাধীনতা আনবার গ্যাছে, আপনেদের দেখভাল অহন আমরাই করবোনে। মুক্তিযোদ্ধার বাপ–মা আপনেরা!’

হঠাৎ ঝুঁকে দুজনকে কদমবুসি করে ফেলে তোবরেজ। মাথায় হাতটাও ঠিকমতো রাখতে পারে না মালেক, চোখের পানি মুছেই শেষ হয় না যে!

রূপান্তর

মঞ্জুর চৌধুরী

ওয়াপদা অফিসের হেডক্লার্ক হাবিবুর রহমান মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, পাকিস্তান মিলিটারি দেশরক্ষার জন্যই রাস্তায় নেমেছে। শেখ সাহেব যা-তা শুরু করেছিলেন। দুই দিন পরপর এই দফা, ওই দফা, এই আন্দোলন সেই আন্দোলন! এসব করে দেশ ভাঙার দিকে টেনে নিচ্ছিলেন। এখন মিলিটারি নামায় দেশটা টিকে গেল।

ওদের নামে অনেক কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। ওরা বিনা বিচারে বাঙালি মারছে, হিন্দু মেরে সাফ করে দিচ্ছে, মেয়েদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ওনার ধারণা, এগুলো গুজব। বাঙালির কাজই হচ্ছে গুজব ছড়ানো।

তবে এই মুহূর্তে মিলিটারির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর নিজের বুকটা ধুকপুক করছে। যদিও তিনি জানেন, তাঁর ভয়ের কোনো কারণ নেই। তিনি আওয়ামী লীগ বা হিন্দু না। তিনি কাজে যান, কাজ শেষে মাথা নিচু করে বাড়ি আসেন। শান্তিতে ঘুমান।

কারও সাতে-পাঁচে তিনি নেই।

তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন একটি কাতারে। সবাই আতঙ্কিত। হাবিব সাহেবও কিঞ্চিৎ আতঙ্কিত হচ্ছেন। মিলিটারির উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। তবে নিশ্চয় খারাপ না। এতগুলো নিরপরাধ মানুষের প্রতি নিজ দেশের মিলিটারি অন্যায় করতে পারে?

তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এখুনি ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে বুলন্দ আওয়াজ তুলবেন। এতে মিলিটারি নিশ্চয় বুঝবে তিনি কোনো দলের সমর্থক।

–‘স্যার! আমার মেয়েটার দিকে তাকায়ে আমাকে যেতে দেন স্যার!’

এক ভদ্রলোক তাঁর পাঁচ বছরের শিশু কন্যাকে নিয়ে টুলে বসা মেজরের দিকে এগিয়ে এল। পরির মতন ফুটফুটে মেয়ে।

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেজর নিজের পিস্তল বের করে একটা গুলি করল। মেয়েটির মাথা ভেদ করে গুলি এসে লোকটার পেটে বিঁধল। মেয়েটার শরীর সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ল। মাথার মগজ ছিটকে বেরিয়ে এল।

তাঁর বাবা হতভম্ব হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছেন। নিজের জখম যেন তিনি টেরই পাচ্ছেন না। চোখ বিস্ফোরিত, কণ্ঠরুদ্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনিও হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

গালি দিতে দিতে মেজর আরেকটা গুলি করল তাঁর বুক বরাবর। ভদ্রলোকের প্রাণ প্রথম গুলিতেই বেরিয়ে গিয়েছিল, দ্বিতীয় গুলিতে তাঁর দেহান্তর হলো।

হাবিব সাহেব চিৎকার করে উঠলেন, ‘এই শালা মেজর!’ তারপর মেজরের সেই গালি তাকে ফিরিয়ে দিলেন।

মেজর ও তার সিপাহি দল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সাধারণ বেশভূষার সেই বাঙালি কেরানির দিকে।

বিজ্ঞাপন
default-image

স্বাধীনতা তোমার জন্য

রাজিয়া নাজমী

আমার নাম দীপান্বিতা। বাবার কাছে দীপান্বিতা। মায়ের কাছে শুধু দীপ। অবশ্য দুটো নামই হারিয়ে গেছে। বাবার খুব আপত্তি ছিল মায়ের দীপ ডাকা। একদিন মন খারাপ করে বলেছিলেন, ‘দীপান্বিতা’ এত সুন্দর নামকে কেন ছেঁটে দিচ্ছ?

মা আমার চুলে বেণি বাঁধতে বাঁধতে হেসে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, অর্থ তো বদলে যায়নি। দীপান্বিতা, দীপ, যাই ডাকি না কেন আমাদের মেয়ে যার জীবনে যাবে, তার জীবনও আলোকিত করে তুলবে। বেণিতে লাল ফিতের ফুল বেঁধে বাবার দিকে তাকিয়ে মা বলেছিলেন, আমার কথা একদিন মিলিয়ে নিয়ো।

মায়ের কথা মেলে নাই। দীপান্বিতা এই জীবনে কারও ঘরেই আলো জ্বালাতে পারেনি, বরং নিভিয়েছে। দীপা কি দায়ী এতে? কিসের দায়?

সেদিন কেন কেউ বাঁচাতে আসেনি, যেদিন বাবা–মা দুজনকেই মেরে ফেলল পাকিস্তানি সেনা? না; বরং তাঁরা বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছিল।

মা তাকে মুখে কাপড় চেপে ভারী আলমারির পেছনে চুপ করে থাকতে বলেছিল। গুলির আওয়াজের সঙ্গে মায়ের চিৎকার শুনে থরথর করে কেঁপেছে। তবু কোনো আওয়াজ করেনি সে। ভারী বুট মিলিয়ে যেতেই বের হয়ে এসে দেখেছিল, পূজায় বসার জন্য মায়ের সাদা শাড়ি বাবা–মায়ের দুজনের রক্তেই লাল হয়ে গিয়েছে। দীপা দুজনের মাঝে কতক্ষণ শুয়ে ছিল জানে না। চারদিকের চাপা শব্দে যখন ঘুম ভাঙল, তখন চোখ মেলে বাবা–মাকে আর দেখেনি।

মামা কোলে টেনে নিয়ে বলেছিল, ‘ভয় করিস না। আমি তো আছি’। দীপান্বিতা বাবার রক্তমাখা চশমা আর মায়ের গীতাঞ্জলি সঙ্গে নিয়ে মামার হাত ধরে চলে এল বাড়ি ছেড়ে। দীপ কি জানত, এই জীবনে তার আর বাড়ি হবে না!

একাত্তরে স্বাধীনতার যুদ্ধে মা তাকে পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে বাঁচালেও মায়ের আদরের ছোট ভাইয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। স্বাধীনতার এক বছর না যেতেই এক তোড়া ময়লা টাকার বদলে একটি কাগজে বিশ্বাসঘাতকতার টিপসই করে দীপার প্রিয় মামু বলে দিল, ‘মনে করবি আমি নেই’।

কাগজের মালিক তাকে কোনো সান্ত্বনা দেয়নি। অন্ধকার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার আগে বলেছিল, মাফ করে দিস আমাদের, তোর বাপের রক্তের স্বাধীন দেশে তুই স্বাধীন থাকলি না।

ঘরের ভেতর পা রাখল পরাধীন দীপান্বিতা।

ঊনপঞ্চাশ বছর

রিমি রুম্মান

দীর্ঘদিন পর গাঁয়ে ফিরেছে প্রবাসী দিমা। হারিকেন আর কুপির আলোয় যে গাঁয়ে হামাগুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে সন্ধ্যা নামে, সেই গাঁয়ে। কনকনে শীতের রাতে হুঁ হুঁ করে বাতাস ঢোকে রহিমা বু’র বেড়ার ঘরের ফাঁক-ফোকর গলে। কাঁপন ধরায় শরীরে। এটুকু আশ্রয় অবলম্বন করেই বেঁচে আছেন তিনি। রহিমা বু’র মুখে গল্প শোনে দিমা। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভীষিকাময়, বিষাদময় সময়ে বেঁচে থাকার গল্প। একটি অতৃপ্ত আত্মার গ্রামময় ঘুরে বেড়ানোর গল্প।

ঊনপঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। ঊনিশ বছরের উচ্ছল, প্রাণবন্ত দুই সই বেণি দুলিয়ে গ্রামময় চষে বেড়াত। রহিমার প্রাণের সই সালেহার বিয়ে ঠিক হয় পাশের গাঁয়ের রমিজের সঙ্গে। সালেহা স্বপ্নে বিভোর হয়ে খুশির জোয়ারে ভাসে। দুর্দান্ত সুখের সেই সময়টাতেই যুদ্ধ শুরু হয়…!

বিবেকের তাড়নায় যুদ্ধে যোগ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো স্বপ্নের কথা ভাবা দুঃস্বপ্ন রমিজের! একদল তরুণকে হানাদার বাহিনী চোখ বেঁধে নদীর ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। পরদিন প্রত্যুষে নদীর জলে অনেকের সঙ্গে রমিজের লাশ ভাসতে দেখা যায়। তরুণী রহিমা আর সালেহাকে রাতের আঁধারে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় সেনা ক্যাম্পে। পাকিস্তানি সেনারা অমানুষিক পাশবিক নির্যাতন চালায়।

দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু দুরন্ত চঞ্চল তরুণীদ্বয়ের সব সুখ, হাসি, আনন্দ স্তব্ধ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। নির্বাক হয়ে যায় সালেহা। তার আতঙ্কিত চোখ কেবল একদৃষ্টিতে শূন্যে চেয়ে থাকে। এক কাকডাকা ভোরে গ্রামবাসী আবিষ্কার করে, বাড়ির পেছনের আমবাগানে গলায় ওড়না প্যাঁচানো ঝুলন্ত নিথর যুবতীর দেহটি।

বুকচেরা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রহিমাবু দিমাকে জানাল, আজও সালেহার আত্মা অমাবস্যার রাতে গ্রামময় হেঁটে বেড়ায়। তিনি সালেহার ক্রন্দন, আর্তনাদ শুনতে পান। এমন করে মরার ইচ্ছে রহিমারও হয়েছিল। জীবনের প্রতি তীব্র হতাশা, ঘৃণা সত্ত্বেও আজও তিনি বেঁচে আছেন। সংকোচে, লজ্জায় ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন ঊনপঞ্চাশটি বছর। পিঞ্জরের আহত পাখির ন্যায় ছটফট করেছেন। মুক্ত বাতাস আর আলোর বিপরীতে অনাহারে-অর্ধহারে কেটে গেছে সুদীর্ঘকাল।

দিমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সে ব্যথাতুর দৃষ্টিতে তাকায় রহিমাবুর মুখের দিকে।

একসময় রহিমা হাহাকার করে উঠল, ‘চক্ষু দুইডা মুদে জন্মের লাহান ঘুমাইতে পারলে পরানডা শান্তি পাইতো-রে বইন! ”

একখণ্ড বিডি

কেয়া ওয়াহিদ

পারিসা বিডির সঙ্গে তিথির দেখা হয়েছিল ডাউনটাউন সাবওয়ে স্টেশনে। তিথি বাংলাদেশি জানার পর বিডি আরও উৎসাহিত এবং আন্তরিক হয়ে আলাপ শুরু করল।

জানা গেল, পারিসা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর কাজ ও গবেষণা করেছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহতার বর্ণনা যেভাবে সে বলে যাচ্ছিল, মনে হলো সে নিজের চোখে এসব দেখেছে। নারীদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম অত্যাচার, ঘরছাড়া স্বজনহারা মানুষের কষ্ট, ঘরবাড়ি আগুনে পোড়ার দৃশ্য, অনাহারী শিশুদের কান্না যেন মূর্ত হয়ে উঠল তার বর্ণনায়।

পারিসা বলল, ময়মনসিংহের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামের কথা। এক হতভাগ্য বাবা তার তিন সন্তান নিয়ে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে পালাচ্ছিল। ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তৃতীয় সন্তানটি কোনো এক সময় হাত থেকে ছুটে যায়; অজানা অচেনা পথে।

সিডনি শ্যানবার্গসহ অনেক বিদেশি সাংবাদিকদের বহিষ্কার করার পরও কয়েকজন রয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব বাংলায়। কোনো এক বিদেশি সাংবাদিক সেই রাতে বাবা–মা হারা শিশুকে রাস্তা থেকে তুলে নেয়। এক বিদেশি কূটনীতিকের বাসায় দিয়ে আসেন মানবতার খাতিরে।

তিথির মনে বিস্ময় ও কৌতূহল। সেই হারানো শিশুটি কি পারিসা? পারিসা কি তার সত্যিকারের নাম? তিন বছরের বাচ্চা কি নিজের নাম বলতে পারে?

পারিসা হালকা হেসে তিথির কৌতূহলের উত্তর দিয়েছিল—

‘না, আমি আমার সত্যিকারের নাম জানি না। আমার মিসরীয় পালক বাবা-মা আমার নাম দিয়েছেন, পারিসা। অরফানেজে কেউ আমার লাস্ট নেইম জানত না। তাই, তারাই বিডি নামটা আমার লাস্ট নেইম হিসেবে জুড়ে দেন! পরে জানতে পেরেছি বিডি অর্থ বাংলাদেশ। আমার দেশের পরিচয়েই আমার লাস্ট নেইম রাখা হয়েছিল।

–‘আমার হারানো পরিবার ও দেশ আমার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে।’ বলতে বলতে পারিসা তাঁর গলায় ঝোলানো লকেটটা বের করে দেখাল। সোনালি রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র, মাঝে সবুজ বৃত্তের ভেতর লাল বৃত্ত!

বিস্মিত, অভিভূত তিথি বুকে জড়িয়ে ধরল পারিসা বিডিকে। তার গন্তব্য চলে এলে সে দ্রুত ফোন নম্বরটা চেয়ে নিয়ে নেমে পড়ল তার স্টেশনে।

ট্রেনের ভেতর যেন রেখে আসল এক খণ্ড বিডিকে!

শঙ্কিত পদযাত্রা

শেলী জামান খান

হঠাৎ করেই মিলির জীবন উল্টাপাল্টা হয়ে গেল। সে মা হতে চলেছে। অথচ তার ভাবি সন্তানের বাবা নিখোঁজ। শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনেই ছেলের শোকে শয্যাশায়ী। এই ওলট-পালট শুধু তাদের একার জীবনেই নয়, পুরো দেশটাইতো লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। হানাদার বাহিনী বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত করে তুলেছে দেশটাকে।

একরাতে অবসন্ন দুর্বল শরীরে ঘুমহীন মিলি শুনতে পেল, বাড়ির উঠোনে অপরিচিত মানুষের পদশব্দ। তাদের ফিসফাস কথার আওয়াজ। ভয়ে মিলির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এরা কারা? কী চায়? কাকে খুঁজছে?

সেজানের খোঁজে এসেছিল সর্বহারা পার্টির ছেলেরা। সিরাজ সিকদারের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে সে নাকি দল ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে। পাড়ায় জানাজানি হয়ে গেল, সেজান মুক্তিযুদ্ধে গেছে। অনেকে সান্ত্বনা দিতে এল। কেউ এল অনুসন্ধানী মন নিয়ে।

সেজানের বাবা বুঝলেন, এখানে থাকা এখন নিরাপদ নয়। পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয়-স্বজনরা জেনেছে। এরপর জানবে মিলিটারি আর রাজাকারের দল।

রাতের শেষ প্রহরে খালের পানিতে কাঠের বইঠার ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দ মিলির বুকের ভেতর আছড়ে পড়তে লাগল।

‘মা, যদি ও আসে, তাহলে আমাদেরতো খুঁজে পাবে না’—মিলি ফুঁপিয়ে উঠল। তার শাশুড়ি চোখ মুছে ভাঙা গলায় বলল, ‘পোলাডারেতো ধইরা রাখতে পারলা না।’

মিলি তার পেটের ওপর হাত রেখে মনে মনে বলল, ‘তুমি কষ্ট পেয়ো না মণি, তোমার বাবা নিশ্চয়ই আসবে। যুদ্ধ জয় করে আসবে।’

মিলিদের নৌকা নদীতে পড়তেই খুব কাছাকাছি দেখা গেল আরেকটি নৌকা। মাঝি উচ্চ স্বরে হাঁক ছাড়ল, ‘নাও কম্মে যায়?’

ভয়ার্ত গলার উত্তর এল, ‘ক্যান? কি কাম?’

-কইতে মন না চাইলে কইও না।

-বাইডি। রাইতেও গাঙ নিরাপদ না। নৌকায় বাল-বাচ্চা, বুড়ো মানুষ আছে।

নৌকার গলুইয়ের কাছে গুটিসুটি বসে থাকা কৃশকায় বৃদ্ধটি এবার মুখ খুললেন, ‘মোরা বেনাপোলের দিকে যামু মাজিভাই। নিজের দ্যাশ, বাপ-দাদার ভিডা-মাডি ছাইড়া যাইতে আছি। পরানডা বড় পোড়ে।’

মিলির শ্বশুর এবার হাফ ছাড়লেন। ভেতর থেকে মুখ বের করে বললেন—

‘দাদা, মোরা যাইতে আছি, জালকাডির দিকে।’

তারপর নৌকা দুটির মাঝে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিষ খালির বুকে কাগজের নৌকার মতো দুলতে দুলতে একসময় তারা রাতের গহ্বরে মিলিয়ে যায়!

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন