default-image

ভ্যাপসা গরম আজ। ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের আকাশ মেঘে ঢাকা। বাতাসের কোনো পাত্তা নেই। ঘরে এসির বাতাসে বসে বসে বিরক্ত হচ্ছে তুহিন। একে অস্বস্তিকর আবহাওয়া, তার ওপর কাল রাতে নবনীর সঙ্গে ঝগড়ার জন্য বিরক্তিকর মেজাজ নিয়ে এখন দোতলার ব্যালকনিতে পা ঝুলিয়ে একা একা বসে ভাবছে তুহিন। তার ডান পাশে যেখানে নবনী বসতো সেখানে সুনসান নীরবতা। বুক ভরা শূন্যতা নিয়ে দেখছে, দূরে শহরের বাতিগুলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। ইদানীং নবনী কথায় কথায় সন্দেহের বাণ ছুড়ে মারে তুহিনের দিকে। এবারে তুহিন সত্যিই হাঁপিয়ে উঠেছে তাদের সম্পর্ক নিয়ে।

সেদিনের কথা হঠাৎ মনে পরে তুহিনের। ভোরের সাবওয়ের ট্রেন ধরবে বলে সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে সাবওয়ের দিকে। বুথের সামনে যেতেই দেখে, সবগুলো গেটে লাইন করে দাঁড়িয়ে লোকজন এমটিএ কার্ড সোয়াইপ করছে আর ট্র্যাকের কাছে অপেক্ষা করছে ম্যানহাটনগামী ট্রেনের। এমটিএ কার্ডটা মেশিনে টাচ করার আগে ঘাম মুছতে পকেট থেকে টিস্যু বের করছিল তুহিন। নিজের অন্যমনস্কতার জন্য পেছনে যাত্রীদের লম্বা লাইনের কথা মনে করেনি সে। পেছন থেকে এক নারীর কণ্ঠে বাংলা কথা শুনে সংবিৎ ফিরে পায় তুহিন।—‘এই যে কি করছেন আপনি? তাড়াতাড়ি করেন, দেখতে পাচ্ছেন না কত লম্বা লাইন আপনার পেছনে?’

এ কথা শুনে বিরক্ত হলেও বাংলা কথা শুনে থমকে গেল তুহিন। মেয়েটির বয়স ২২ কি ২৩ হবে। গায়ের রং দুধে আলতায় মেশানো না হলেও ফরসা। পরনে হাতাকাটা টি শার্ট, জিনসের প্যান্ট আর গলায় ঝোলানো ওড়না।

—হ্যালো কী দেখছেন এত, দৌড়ান ট্রেন এল বলে।

বিজ্ঞাপন

তুহিন তাড়াহুড়ো করে ট্র্যাকের দিকে পা বাড়াল। যাত্রীরা ট্রেনে ওঠার পাঁয়তারা করছে। তুহিন মেয়েটার পিছু নিয়ে একই কম্পার্টমেন্টে উঠে গেল। ওই মেয়েকে যতই দেখছিল, ততই মুগ্ধ হচ্ছিল তুহিন। সাধারণত অপরিচিত মেয়েদের প্রতি সরাসরি তাকায় না তুহিন। কিন্তু আজ যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সে। কিছুতেই তার দিক থেকে নজর সরাতে পারছে না। ট্রেন গ্র্যান্ড সেন্ট্রালে আসতেই তুহিনের বুকে চিনচিন ব্যথা জাগিয়ে মেয়েটি নেমে গেল। এই ভাবনায় সারা দিন কেমন একটা ঘোরে কাটিয়েছে তুহিন। মেয়েটার গলার আওয়াজ, কথা বলার ধরন, হাত দিয়ে চুল ঠিক করার ভঙ্গি সব থেকে থেকে ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে।

অফিস থেকে বের হয়েও সেই একই ঘোর। এর মধ্যে সে ভুলে গেছে নবনীর কথা। বাড়ির সামনে আসতেই হঠাৎ মনে হলো নবনীকে। ফোন অন করতেই দেখে নবনী কল করেছে বেশ কয়েকবার। সেদিন নবনী ফোন করে উত্তর না পাওয়ায় অনেক ঝগড়া করেছে। আজ তো আর কথাই নেই, নবনী ঝগড়া করতে এক পায়ে খাঁড়া। তা মনে হতেই অস্থির হয়ে গেল তুহিন। এখনো তো গার্লফ্রেন্ড নবনী, এরপরও এত খবরদারি। গৃহিণী হলে তো কথাই নেই। এখনই নবনীর কাছে তার কোনো মূল্যবোধ নেই। ফোন দিলেই বলবে, থাক তুহিন, আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি তোমার কোনো দায়িত্ববোধ নেই।

অফিস যাওয়ার পথে সাবওয়েতে প্রায়ই মেয়েটিকে খোঁজে তুহিন। এক সপ্তাহ কেটে গেল মেয়েটির কোনো দেখা নেই। একদম ভালো লাগছে না তুহিনের। যেন গরমকালের লু বাতাস বইছে তার বুকের ভেতর। একদিন তার বন্ধু অরুণকে এই ঘটনা খুলে বলল। ‘তুই প্রেমে পড়েছিস, এটা নিশ্চিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা অল্প বয়সী মেয়ের সঙ্গে’—বলেই হেসে ওঠে অরুণ।

তুহিন হয়তো বলবে, আর পারছি না নবনী, দোহাই আমাকে একটু বিশ্বাস করো, অবুঝের মতো কথা বলো না। এ কথা শুনে নবনী বলবে, অনেক হয়েছে তুহিন, আমাকে তুমি রক্ষিতা করে রেখেছ। অনেক দূরে থাকি বলে আমার চোখে ধুলো দিয়ে তুমি যা কিছু করে বেড়াবে? এরপরই ফোন বন্ধ করে দেবে নবনী।

তুহিন সত্যিই হাঁপিয়ে উঠেছে নবনীর সঙ্গে সম্পর্কটা নিয়ে। নবনীর সন্দেহ দিন দিন বেড়েই চলেছে। নবনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় ছয় বছরের। এক সময় দুজন পাশাপাশি বাসায় থাকত। একই স্কুলে পড়াশোনা করত। তখন থেকেই তাদের সম্পর্কের শুরু। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় নবনীরা বাড়ি কিনে যখন অন্য বরোতে চলে যায়। হঠাৎ এই দূরত্বটাই তাদের সম্পর্কটা একেবারে শেষ করে দেওয়ার পথে। কত দিন তারা এক সঙ্গে কুইন্স, ম্যানহাটনের অলিগলি ঘুরে বেড়িয়েছে, এইট অ্যাভিনিউয়ে মুভি দেখে গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছে।

এত দিনেও বিয়ে করেনি তুহিন-নবনী। তুহিন ভেবেছিল প্রমোশন পেলেই নতুন ফ্ল্যাট কিনে নবনীকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে নবনীর প্রতি তার আকর্ষণটাই ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে। এক নিঃশব্দ নিনাদ বইছে তুহিনের জীবনে।

সাবওয়েতে দেখা হওয়া সেই মেয়েটির কথা আবার মনে হলো তুহিনের। মেয়েটার নাম, ফোন নম্বরও জানা হয়নি। কী বোকামিই না করেছে তুহিন! নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে সে। বারবার তার মনে হচ্ছে—ওই মেয়েই পারবে তার জীবন পুকুরে পদ্ম হয়ে ফুটে সুখে স্বচ্ছন্দে ভরিয়ে দিতে। এই মেয়ে কখনো তাকে বিষণ্নতায় রেখে পাশ ফিরে ঘুমাবে না।

বিজ্ঞাপন

অফিস যাওয়ার পথে সাবওয়েতে প্রায়ই মেয়েটিকে খোঁজে তুহিন। এক সপ্তাহ কেটে গেল মেয়েটির কোনো দেখা নেই। একদম ভালো লাগছে না তুহিনের। যেন গরমকালের লু বাতাস বইছে তার বুকের ভেতর। একদিন তার বন্ধু অরুণকে এই ঘটনা খুলে বলল। ‘তুই প্রেমে পড়েছিস, এটা নিশ্চিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা অল্প বয়সী মেয়ের সঙ্গে’—বলেই হেসে ওঠে অরুণ।

—দেখ নবনীর সঙ্গে তোর সম্পর্কটা এখনো শেষ হয়ে যায়নি তুহিন। তারপর চেনা নেই-জানা নেই একটা মেয়ে। ট্রেনে, বাসে কত সুন্দরী মেয়ে আমরা দেখি তাই বলে সবাইকে ভালোবাসতে হবে! তুই এক কাজ কর, নবনীকে এবার বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দে।

অরুণের এসব কথা একেবারেই ভালো লাগেনি তুহিনের। আর নবনীর ওপর তার এতই বিরক্তি এসেছে যে, তার কথা আর ভাবতেই পারছে না তুহিন। এর চেয়ে ওই অচেনা অনিন্দ্য মেয়েটিকে নিয়েই ভাবতে চায় সে।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন