default-image

শাড়ি না পরলে নাকি বাঙালি রমণীর মতো লাগে না—পতি দেব সেদিন বললেন কথাটা। উত্তরে তাঁকে আমি নির্দ্বিধায় অতীত মনে করিয়ে দিই। প্রথম যখন বিদেশ পাড়ি দিই, তখন তো বলেছিলে, ‘বিদেশে কেউ শাড়ি পরে না, নেওয়ার দরকার নেই, তখন একটা শাড়িও আনতে দাওনি!’ তিনি হাসতে হাসতে উত্তর দেন, ‘ক্লজেট খুলে শাড়ির তাক দেখলে কেউ এ কথা বিশ্বাস করবে না!’ পাশ্চাত্যে থাকলেও দেশীয় পোশাক, খাবার, সংস্কৃতি চর্চা থেকে আমরা একটুও দূরে সরে যাইনি। বরং এই ভৌগোলিক দূরত্বের কারণেই মরমে–মননে বাংলা জড়িয়ে আছে। দেশে গেলে ব্যাগভর্তি করে দেশীয় জিনিস কেনাকাটা করি। মাটির ডিনার সেট, শতরঞ্জি, মা-মেয়ের জন্য রুপার নূপুর, চুড়ি, গয়না, হারমোনিয়াম...! আমার এসব দেখলে আত্মীয়স্বজনেরা অস্ফুটে বলে ওঠেন, প্রবাসে থেকে তোমার এত বাংলা প্রীতি। কী করে বোঝাই, এসব ছুঁয়ে আমি দেশের ঘ্রাণ পাই, বাঙালিয়ানায় বেঁচে থাকার আনন্দ পাই।

শেকড়ের টান, সে তো নাড়ির টান। ২০ বছরেও আমার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং আরও বেশি বাঙালি হয়েছি। আমি যাদের সঙ্গে মেলামেশা করি, তারাও কম না। টরন্টোতে বাঙালিয়ানা চর্চা বেশ সচল। আমার বন্ধুরা ও তাদের পরিবার মিলে আমরা জেঁকে বসে বাঙালিয়ানায় মেতে উঠি। এ এক অপরিমেয় আত্মতৃপ্তি! আমরা যারা এখানে বাঙালি আছি, সবাই একই কথা বলবেন ঘুরেফিরে। তাইতো এখানে তৈরি হয়েছে লিটল বাংলাদেশ, তৈরি হয়েছে বাঙালি পাড়া, তৈরি হয়েছে হৃদয়ে বাংলাদেশ—বিভিন্ন নামে বিভিন্ন এলাকায়। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্বেও দেশের কথা মনে পড়ে। শেকড় এমনই একটা জিনিস। গাছ যত ওপরেই বাড়ুক, শেকড়ের সঙ্গে সে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। বিচ্ছিন্নতায় প্রাণহানি। আমাদেরও একই অবস্থা, দুই দশক কেন, দশ দশক থাকলেও আমরা বাঙালি হয়েই থাকব এই ভিনদেশে।

বিজ্ঞাপন

কিশোরী চঞ্চলা অপরূপ বিস্ময়ের নায়াগ্রা জলপ্রপাত, তুষারের মিহি দানায় আবৃত, পাহাড় আর হৃদে ঘেরা দেশ কানাডা! অন্টারিও প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর টরন্টোতে আমি থাকি। এক ছেলে আবরার ও মেয়ে সারিনা, তাদের বয়স ১৬ ও ১৩। ভিনদেশে বাঙালি হয়ে থাকা অতটা সহজও নয়। তবু দেশি ভাষায় কথা বলি, দেশি খাবার রান্না করি, দেশীয় আয়োজনে দেশি পোশাক পরি। শুধু আমি একা নই, পরিবারেও এই রেওয়াজ চালু রেখেছি। আমার বাচ্চারা মাঝেমধ্যে দ্বান্দ্বিকতায় পড়ে জিজ্ঞেস করে, তারা তো কানাডীয়, তাদের সংস্কৃতি (কালচার অ্যান্ড নর্ম) কি হবে? উত্তর দিই, তোমাদের সংস্কৃতি দুটিই, তোমাদের বাবা–মা এখানে অভিবাসী, সুতরাং তোমরা দুটো সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং রীতি মেনে চলবে। তবে হ্যাঁ, তোমাদের ধর্ম একটাই! এ জায়গায় আমি কখনো সমঝোতা করব না। কিছু জিনিস গোড়া থেকেই জানিয়ে রাখতে হয় বৈকি।

জীবন বহমান নদী, একেক বাঁকে একেক পরিবর্তন। আমরা কেবল এই পরিবর্তনের পথযাত্রী। বাঙালিয়ানা কখনো কখনো মন খারাপও করে দেয়। মনে পড়ে, দূরদেশে ফেলে আসা প্রিয় মানুষদের, যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা কুসুমকোমল শৈশবের কথা। মনে পড়ে, বাড়ির পেছনের রাস্তাটা, যে রাস্তা মনে হয় আজও অপেক্ষায় আছে আমি কবে বাড়ি ফিরে যাব। এসব ভাবতে ভাবতে বিষণ্ন কুয়াশার চাদর যখন আমায় ঢেকে দেয়, তখনই বন্ধুরা এসে আমায় জাগিয়ে তোলে ঋতুভিত্তিক আয়োজনের সঙ্গী হতে। বিশেষ করে শীতের সময় পিঠা উৎসব, বসন্তবরণ, তারপর বৈশাখ। এসব অনুষ্ঠান আমরা প্রচণ্ড প্রাণোদ্দীপনা নিয়ে পালন করি বান্ধবীরা মিলে। গান গাইতে গাইতে মেলায় যাই বাসন্তী রং শাড়ি পরে। দেশি মেলায় ঘুরে ঘুরে চটপটি–ফুচকা খাওয়া কিংবা মহুয়ার ঝাল মুড়ি যার মজাটা আসলেই কুড়মুড়ে মুখরোচক! স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে সব বান্ধবী মিলে শাফিন আহমেদের সঙ্গে গান গাওয়া, ‘ফিরিয়ে দাও আমারই প্রেম তুমি, ফিরিয়ে দাও’ অথবা আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে গাওয়া—‘আমি বারো মাস তোমায় ভালোবাসি, তুমি সময় করে বন্ধু বাসিও...’।

টরন্টো শহরের ডেনফোর্থ হলো বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। ওখানে আছে এসব আনন্দ দানের অনুষঙ্গ বিভিন্ন সংগঠন। পালাক্রমে আয়োজন করেন দেশি আমেজের দেশি অনুষ্ঠান! সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানে ছোট ছোট বাচ্চারা যখন মঞ্চে উঠে গায়—‘এসো হে বৈশাখে’ আর এর সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে অথবা একুশে ফেব্রুয়ারির বইমেলায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটা করে—অন্তরাত্মা যেন রিনরিন করে কেঁপে ওঠে। এ এক অতৃপ্ত অমিয় সুখ। প্রকাশের নয়, কেবল অনুভবের!

শেকড় ছুঁয়ে থাকার চর্চা চলতে থাকে, থাকবে! আরেকটু না বললেই নয়। আমাদের কাঙ্ক্ষিত দুটি ঈদ হলো এখানকার সেরা উৎসব! পতি দেবের কাছে বাঙালি ঈদ মেলায় এক ধরনের বায়না, পাকিস্তানি ও ইন্ডিয়ান মেলায় আরেক ধরনের বায়না। চাঁদ রাতে মেহেদি লাগানোর বায়না। তারপর ঈদের দিন দল বেঁধে আত্মীয় ও বন্ধুদের বাসায় ঘুরে ঘুরে বেড়ানো। এসব মহানন্দের গল্প আসলে লিখে শেষ করা যাবে না। আসন পেতে বসে জম্পেশ আড্ডা দিতে হবে, বাঙালি আড্ডা! এখন বরং একটা গান শোনা যাক—

‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে

মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ।

তব ভুবনে তব ভবনে

মোরে আরও আরও আরও দাও স্থান।’

বিজ্ঞাপন
সাজসজ্জা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন