default-image

টপ্পা কি খেয়াল তাঁকে করেনি দখল,

মাছ কোটা কিংবা হলুদ বাটার ফাঁকে

অথবা বিকেলবেলা নিকিয়ে উঠোন

ধুয়ে মুছে বাসন-কোসন…

প্রিয় কবি শামসুর রাহমানের এই অতিপ্রিয় ‘কখনো আমার মাকে’ যখন বিভিন্ন সময় আবৃত্তি করি, নিজের অজান্তেই আমিও চলে যাই টাঙ্গাইলে শিশু ও শৈশবের আমার অতি ব্যস্ত আটপৌরে মায়ের কাছে।

খুব ছোটবেলায় আমাদের একান্নবর্তী বিশাল পরিবারে দেখতাম আমার মা সেই যে সকাল বেলায় স্নান সেরে রান্না ঘরে ঢুকতেন, সারা দিন শুধু রান্না আর রান্না, সকালের রান্না, দুপুরের রান্না, রাতের রান্না। কতরকমের যে রান্না হতো, তার ইয়ত্তা নেই। সংসারের বড় বউ হওয়ার কারণে আমার কর্তামা মাকেই দিয়ে এই রান্নার কাজে স্বস্তি পেতেন। কাজেই আমার মা যে ভালো রাঁধুনি, তা শিশুবেলায়ই বুঝতে পেরেছিলাম। আমার মনে আছে, পয়লা বৈশাখ ও দশমীর দিন আমাদের বাড়িতে পাঁচপদের রান্না হতো। ছেলে–বুড়ো সবাই সেদিন ওই পাঁচপদ খেতে হবে, এটিই পারিবারিক নিয়ম।

বর্তমানে এই পারিবারিক ভোজন সংস্কৃতি অভিবাসী জীবনেও আমাদের সংসারে টিকিয়ে রেখেছি। নিউইয়র্কে আমাদের পরিবারে এমনকি এখানে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা আমাদের সন্তান জনম-গুঞ্জরীর বাংলা খাবারই প্রিয়। আমার বিশ্বাস ভাষা ও খাবার সংস্কৃতি যদি হারিয়ে যায়, তবে আমরা গৌরবের বাঙালিত্বকেই হারাব। তাই, যত পারি বাংলা খাবার আমাদের পারিবারিক চর্চা। কাঁচাকলা ভর্তা, মাষকলাই, সরষে ইলিশ, লাবড়া, গুঁড়া মাছের চচ্চড়ি, শুঁটকি, লাউয়ের শওকত, লাল শাক, লাউ শাক, আলু ভাজি ইত্যাদি আমাদের চার সদস্য পরিবারের প্রতিদিনের সবারই প্রিয় খাবার।

বলে রাখি, আগে শখে রান্না করতাম। আর এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে ছুটি অথবা নিউইয়র্ক ব্যস্ত জীবনে। এই রান্না যদি শিল্প হয়, আর সে শিল্পের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু হলো আমার মা। তিনি আমাকে হয়তো রান্না শেখায়নি, কিন্তু পারিবারিক কৃষ্টিতে দূর থেকে দেখে দেখেই মায়ের হাতের রান্না শিখেছি। পৃথিবীর সব সন্তানের মতোই আমারও প্রিয় খাবার মায়ের হাতের রান্না। সেই রান্নার মধ্যে আমি যেগুলো খেতে বেশি পছন্দ করি এবং নিয়মিত রান্না করি, তারই পাঁচপদ আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম—

বিজ্ঞাপন
default-image

একসম্বারী সরষে ইলিশ

উপকরণ: একটি ১০০০/১২০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ, ১ চামচ করে হলুদ-মরিচ-ধনে- জিরার গুঁড়া, সয়াবিন তেল, লবণ, ১০টি কাঁচা মরিচ, ২ চামচ সরিষা বাটা।

প্রণালি: প্রায় ৫ ঘণ্টা মাছটি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে লবণ ও লেবু দিয়ে জল মিশিয়ে পরিষ্কার করে নিই। এরপর লবণ, তেল, গুঁড়াগুলো মিশিয়ে তেল গরম হলে শুধু কয়েকটি জিরা দিয়ে মাছগুলো ভাঁজতে থাকব। ভাজা হয়ে গেলে সামান্য জল মিশিয় দেব, যখন ঝোল ঘন হয়ে আসবে, তখন সরিষা বাটা দিয়ে কাঁচা মরিচ দিয়ে ৫ মিনিট হালকা তাপ দিয়ে নামিয়ে আনলেই হয়ে যাবে ‘একসম্বারী সর্ষে ইলিশ’।

মলা মাছের চচ্চড়ি

default-image

উপকরণ: পরিমাণমতো মলা মাছ, ২টি পেঁয়াজ, ৫/৬টি কাঁচামরিচ, ২টি আলু, ছোট একটি মুলা, ২০০ গ্রাম শিম, ১ চামচ করে হলুদ-ধনে-শুকনা মরিচ-জিরা গুঁড়া, লবণ, সয়াবিন তেল।

প্রণালি: বরফ মাছের প্যাকেট প্রায় ৪ ঘণ্টা সাধারণ তাপমাত্রায় রেখে দিয়ে লেবু ও লবণ দিয়ে পরিষ্কার করে নিই। লবণ ও হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে ৫ মিনিট ভেজে নেব। এরপর মাছগুলো আলাদা করে ওই গরম তেলে ১ চা চামচ জিরা, ১টি শুকনা মরিচ, তেজপাতা দিয়ে সম্ভার দিয়ে আলু কুচি, পেঁয়াজকুচি, শিম ও মুলা কুচি মিশিয়ে কম তাপে ১৫ মিনিটের মতো রান্না করে মলা মাছ ছেড়ে দেব, তারপর আস্ত কাঁচামরিচ, ধনেপাতা দিয়ে নামিয়ে আনলে হয়ে গেল ‘মলা মাছের চচ্চড়ি।’

বিজ্ঞাপন
default-image

সরষে কাঁচকলা ভর্তা

উপকরণ: ২টি কাঁচকলা, ৮টি কাঁচা মরিচ, এক চা চামচ আদা, ২ চামচ সরিষা, সরিষা তেল, ৩টি শুকনা মরিচ, ২ ডাটা ধনেপাতা, ১টি পেঁয়াজ।

প্রণালি: প্রথমে প্রতিটি কাঁচকলা দুই ভাগ করে গরম জলে ৩০ মিনিটের মতো সিদ্ধ করি। একটি পাত্রে হালকা গরম অবস্থায় কলার খোসা খুলে তারপর পেঁয়াজকুচি, ধনিয়াকুচি, তেলে ভাজা শুকনা মরিচ হাত দিয়ে ম্যাশ করে পরিমাণ মতো সরিষার তেল দিয়ে কলাটি মিশিয়ে নেব। এরপর ৮টি কাঁচামরিচ, ২ চামচ লাল সরিষা ব্লেন্ডারে মিহি করে কলা ম্যাশের সঙ্গে মিশিয়ে নিলে হয়ে যাবে সরষে কাঁচকলা ভর্তা।

সবজি মাশের ডাল

default-image

উপকরণ: ৪০০ গ্রাম মাষকলাই, লাউ, মুলা, শিম। ১০/১২টি কাঁচামরিচ, হলুদ-মরিচ-ধনে-জিরা গুঁড়া, পাঁচফোড়ন, আদা, ২টি শুকনা মরিচ, আদা কুচি।

প্রণালি: পরিমাণমতো তাপে ডাল প্রায় ৬০/৭০ মিনিট জালে সিদ্ধ হলে মুলা, লাউ, শিম সাইজ মতো কেটে ছেড়ে দিয়ে তারপর ১০/১৫ মিনিট জাল দিয়ে আদা, ২টি শুকনা মরিচ দিয়ে পাঁচফোড়ন দিয়ে নামিয়ে আনলেই হয়ে যাবে মজাদার ‘সবজি ভাজা মাশের ডাল’।

লাবড়া

default-image

উপকরণ: পরিমাণমতো ১৫/২০ ধরনের সবজি যেমন বেগুন, শিম, কাঁচকলা, আলু, মুলা, ফুলকপি, গাঁজর, ওলকপি, কলার থোড়, ফুল, ডাটা, মিষ্টি লাউ ইত্যাদি। হলুদ-ধনে-জিরা-শুকনা মরিচ গুঁড়া, তেল, লবণ, মৌরি, সরিষা।

রন্ধনপ্রণালি: বড় কড়াইয়ে পরিমাণমতো সয়াবিন তেল গরম হলে শুকনা মরিচ, আদা সম্ভার দিয়ে সবজি ছেড়ে দেব। এক ঘণ্টা কম জালে রান্না হলে মৌরি বাটা, সরিষা বাটা মিশিয়ে নামিয়ে আনলেই ‘লাবড়া’ হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
সাজসজ্জা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন