default-image

‘ঘরে থাকতে কয় ঝড় তুফানে নয় ভয়, আর ক্ষয় মরা আর জরা সামলে চল তরা’! ‘বাংলাদেশের বাংলা ঢোলে আবার তোরা উঠবি বলে’-আমারই কবিতার পঙ্ক্তিমালা। মনে তখন ঝংকার তুলে উৎসবে পার্বণে নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা, অভ্যাস সব মিলিয়ে কবিতায় আশ্রয় নিত এমনি কথামালা। এখন যেন ধূসর আর আবছা ভবিষ্যৎ! আগামীকালের কথা নাম না জানা পাখির ঠোঁটে রঙিন খামে কেউ একজন লিখে পাঠাক-‘সব ঠিক হয়ে গেছে, আর কোনো মৃত্যু নেই, আর কোনো ভয় নেই, সবাইকে শুভ নববর্ষ ২০২১’।

আমাদের বৈশাখ! আমাদের পয়লা বৈশাখ! বাংলা মাসের প্রথম দিনটি জাতীয়ভাবে উৎসবের দিন। পয়লা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সঙ্গে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোক উৎসব হিসেবে বিবেচিত।

গ্রেগরিয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল অথবা ১৫ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ পালিত হয়। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই এই তারিখ নিয়ে মিল রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গৃহীত। পৃথিবীর সব প্রান্তের বাঙালির মনে বাঙালির উৎসবের প্রাণ এই পয়লা বৈশাখ! বিদেশের মাটিতে অনেক বছর পরেও এই উৎসবের টান কমেনি এতটুকু। তাইতো প্রতি বার বৈশাখ এলেই আয়োজন চলে নিজেকে সাজাবার, পরিবারের সবার জন্য নতুন কাপড়, ঘর সাজানো, বাঙালিয়ানায় রান্না আর খাবারের চলে বিশেষ আয়োজন। প্রবাসে সংগঠনগুলো বৈশাখী আয়োজন করে, যাতে থাকে বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরার প্রয়াস, মেলা আর খাবারের আকর্ষণ বাঙালিকে ঘরের বাইরেও উৎসবে মাতিয়ে রাখে। একে অন্যের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ‘শুভ নববর্ষ’ বলায় থাকে আন্তরিক রিক্ততা। বৈশাখের কত শ্লোক, ছড়া মনের ঘরে কড়া নাড়ে।

বিজ্ঞাপন

‘ইলিশ মাছের ৩০ কাটা বোয়াল মাছের দাঁড়ি, বৈশাখ মাসের ১ তারিখে আইসো আমার বাড়ি’, ‘ছেলে হলে পাঞ্জাবি, মেয়ে হলে শাড়ি, করব বরণ বন্ধু তোমায় আইসো আমার বাড়ি’, ‘শুধু বৈশাখ এলেই মাথায় আসে বাংলার চেনা কথাকলি’।

আজকে এই মুহূর্তে সবই আনন্দের স্মৃতিচারণ বৈশাখকে ঘিরে। ২০১৯ সালের করোনা মহামারি আমাদের এই পথ চলায় থামিয়ে দিয়েছে, পিছিয়ে দিয়েছে—তা বলব না। বরং মানুষ কী করে অগ্রযাত্রায় নিজেদের অবদান রেখে চলেছে তা এখন ইতিহাস হওয়ার অপেক্ষায়। পুরোনো ভুলে নতুনের জয়গান গাওয়াই তো জীবন, নতুনকে আহ্বান করার মধ্যে বরণ করার মধ্য দিয়েই আমাদের এগিয়ে চলা। এবারের বৈশাখ উদ্‌যাপনে বিশেষ আয়োজন না থাকলেও ঘরের মানুষকে নিয়ে খুবই সামান্য হলেও নতুন বাংলা বছরকে বরণ করব প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে মিষ্টি মুখ করে। আমার রান্নায় থাকবে ভাত, ইলিশ মাছ, বেগুন ভর্তা, করল্লা ভাজি, মিক্সড সবজি ভাজি, ডাল, চিকেন সমুচা আর নাশতায় পরোটা, ডিম ভাজি। পরনে থাকবে ঢাকাই শাড়ি।

সৃষ্টিকর্তা আমাদের পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে দিন, মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা—এই হোক আমাদের একমাত্র প্রার্থনা। এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক, যাক, যাক। এসো, এসো এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো। নিজের বাসগৃহ, অফিস আদালত, স্কুল-কলেজ, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার সব পরিবেশে নিজেদের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখব। কাজ শেষে হাত ধোয়ার অভ্যাস করব। মুখে মাস্ক পরব। করোনার টিকা অবশই নেব।

মন্তব্য করুন