ভিনদেশে আমাদের বৃক্ষপ্রেম

বিজ্ঞাপন
default-image

নিউইয়র্কের প্রকৃতিতে এখন আকাঙ্ক্ষার গ্রীষ্মকাল চলছে। সেদিন ছিল রোববার। বাইরে শিরশির আর্দ্র বাতাস। কয়েক দিনের খরতাপ আর তীব্র গরম শেষে হঠাৎ বজ্রবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পর রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে গেছে। প্রকৃতির রুক্ষ ভাব কমে গিয়ে শরতের শান্ত বাতায়নে নিউইয়র্কজুড়ে হিমেল ছোঁয়া স্নিগ্ধতা। জ্যাকি রবিনসন পার্কওয়ের বুক চিরে আমরা যাচ্ছি একজন রোমান্টিক মানুষের নিমন্ত্রণে। আমাদের মতো পার্কওয়ের ওপর দিয়ে আরও ছুটছে শত শত ঝকঝকে গাড়ি।

আঁকা–বাঁকা সরু রাস্তার দুদিকে সুবিস্তৃত সিমেট্রি। লতা-গুল্ম, পত্র-পল্লব আর গাছ-গাছালির মনোরম ছায়ায় কত সহস্র মানুষ কত যুগ ধরে ঘুমিয়ে আছেন কবরে! অজস্র সবুজের সমারোহে পার্ক লেনের দুই দিকের আকাশচুম্বী গাছের সতেজ পাতা শান্ত স্বরে দুলছে মসৃণ বাতাসের সঙ্গে। চারদিকে সবুজে আকীর্ণ সূর্যস্নাত রবিবাসরীয় মোহময় আবেশ।

এতক্ষণে কুইন্স এলাকা অতিক্রম করে পার্ক লেনের এক্সিট নিয়ে আমাদের চলন্ত হাইব্রিড ঢুকে পড়ল ব্রুকলিনে। সঙ্গে দুই বাংলার প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী বন্ধু সজ্জন মিতা সালাউদ্দীন আহমেদ। টিভিতে অনুষ্ঠান শুটিংয়ের কারণে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে একটু বিলম্ব হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের হালকা রোদের পরশ গায়ে লাগিয়ে লিবার্টি অ্যাভিনিউয়ে গাড়ি পার্ক করলাম। অতপর সেই চেনা স্টোরটির কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ক্রিং করে বেল বেজে উঠল। এটি একটি মিনি কসমেটিক মার্কেট ও প্রসিদ্ধ ফার্মেসি। অনেকটা সিবিএস ও রাইট এইডের আদলে সাজানো। প্রসাধনী ছাড়াও তাকে সাজানো হরেক রকম নিত্য প্রয়োজনীয় আইটেম, সার্জিক্যাল সরঞ্জাম আর পেছনে রয়েছে ফার্মেসি কাম অফিস।

একজন সুদর্শনা আমাদের স্বাগত জানিয়ে ব্যাকইয়ার্ডে নিয়ে গেলেন। সেখানে দেখি, আমাদের হোস্ট ইয়া বড় কড়াইয়ে ইলিশ ভাজি করছেন। সঙ্গে ফার্মেসির দুজন স্টাফ তাকে সাহায্য করছেন। প্রিয় রোমান্টিক মানুষটি তার স্বভাবসুলভ হাসিক সম্ভাষণে আমাদের স্বাগত জানালেন। ইতিপূর্বে আরও দুই/তিনবার আমার এখানে আসার সুযোগ হয়েছে। আগেরবার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ক্যাথরিন মাসুদ, কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গুলশান আরা ও ড. কাজী বেলাল ছিলেন। আজকের পরিবেশটা অন্যরকম, এবারও কয়েকজন অতিথি। মাথার ওপর হালকা ছাউনি। ভবনের পেছনের জায়গাজুড়ে রকমারি সবজিতে ছেয়ে আছে। কোনোটা টবে, আবার মাটিতেই অনেক গাছে ফলেছে নানা প্রকার ফলন। বাগানের সাজানো গাছের নিটোল ছায়ায় ডাইনিং টেবিলের দুদিকে পাতানো চেয়ারে বসে পছন্দের সবজি পেড়ে রান্না করে খাওয়ার সুব্যবস্থা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
একজন সুদর্শনা আমাদের স্বাগত জানিয়ে ব্যাকইয়ার্ডে নিয়ে গেলেন। সেখানে দেখি, আমাদের হোস্ট ইয়া বড় কড়াইয়ে ইলিশ ভাজি করছেন।

পেশায় তিনি ফার্মাসিস্ট, কিন্তু প্রবল সংস্কৃতিমনস্ক একজন ভোজনরসিক রোমান্টিক মানুষ। অবসরে মাঝে মাঝে রান্না করেন। একা একা না খেয়ে কাছের মানুষদের ডেকে প্রায়শই সময়কে উপভোগ করেন আনন্দের আতিশয্যে। হয়তো কখনো মিষ্টি ছায়ায় বসে বই পড়েন। গল্পে মেতে থাকেন। পাশের ঝরনাধারায় জল ও সবুজের ঘ্রাণ নিয়ে অবলোকন করেন, সূর্যরশ্মির আকাশ নীলিমা অথবা চঞ্চল বিহঙ্গ জীবন। আজকের আবহাওয়া বেশ ঝরঝরে। মেঘের ফাঁকে ঢলে পড়া সূর্যের চিলতি কিরণে পশ্চিমাকাশ ঈষৎ হরিদ্রাভ। মনে মনে ভাবি, এ তো কবিতায় প্লাবিত হওয়ার মত মোহনীয় নির্মল পরিবেশ।

তাঁর এই বাগানে শাক-সবজির মধ্যে মুলা/টমেটো, লাউশাক, লালশাক-পুঁইশাক, বেগুন-পালংশাক, লাউ, সিসিঙ্গা, ঢ্যাঁড়স, করলা, ডাঁটা, ঝিঙে, ঢ্যাঁড়স, বরবটি, লাউ, শিম, করলা, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, পটল, শসা ইত্যাদি। নয়নজুড়ানো বাগানে আরও আছে গুচ্ছ গুচ্ছ আপেল, পেয়ারা এবং মাচার ওপর থেকে ঝুলে পড়া থোকা থোকা সবুজ/কালো আঙুর ফলের নিপাট সৌন্দর্য। মনে পড়ে, দুবছর আগে আমার পছন্দের বৃক্ষপ্রেমী এই রোমান্টিক মানুষটির সঙ্গে বিরাট এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা নয়নাভিরাম ফলের বাগানের কথা। শহুরে তথা নাগরিক জীবনে দিন কাটালেও হয়তো বা নদীর জলধারা, ফল-ফুল, গাছ-গাছালি, সবুজে আকীর্ণ বন-বনানীতেই তার মনে স্বপ্ন বাসা বেঁধে আছে। ব্রুকলিনের অদূরে একটি বিরাটায়তন জায়গায় অনেক কিছুর মধ্যে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। মানুষটি অনেক গুণ সম্ভারের অধিকারী, তবে আজ তার রসনাবিলাসের যৎ-কিঞ্চিৎ বর্ণনাই এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

খাদ্যবিলাসে বাঙালি (বাংলাদেশি বাঙালি) সেরা। মজাদার খাবার কাকে বলে এবং কত প্রকার ও কী কী, তা বোধ হয় বাংলাদেশের মানুষ বেশি জানে। মজাদার খাবারের খোঁজে বাঙালি অনেক অসাধ্যসাধন করতে পারে। মজার খাবারের রেসিপির শেষ নেই। তবে আমি যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ, নিজের কথা বলার চেয়ে আমার প্রিয় জন্মভূমির মাটি, মানুষ তথা মাতৃ দেশকে হৃদয় মুকুরে রেখেই কথা বলি। ধরা যাক মাছ। একেক মাছের স্বাদ একেক রকম। বাঙালির কাছে সবচেয়ে মজাদার সেরা মাছ হচ্ছে ইলিশ। সেই সুবাদে ইলিশকে রাজা বলতে পারি, আবার রানিও বলতে পারি। সম্রাট অথবা সম্রাজ্ঞী।

ইলিশ মাছ যেমন চাঁদের মত চকচকে। দেখলে প্রাণ জুড়ে যায়। যেমন আদর করতে ইচ্ছে করে। তেমনই তার স্বাদ ও খুব তৃপ্তিদায়ক। যেকোনো তরকারির সঙ্গেই খাটে। খাদ্যবিলাসী বাঙালির মুখরোচক খাবার সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর অনেক রসালো লেখা আছে। এর মধ্যে ইলিশ মাছ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘বেহেশতে ইলিশ পাওয়া যাবে না। তাই আমি বেহেশতে যাব না।’ সাহিত্যে এমন রসাত্মক বর্ণনা বিরল। আয়োজকের আজকের মেন্যুতে ইলিশ মাছকে মুখ্য রেখে অন্যান্য তরকারির (ওপরে বর্ণিত শাকসবজি ছাড়াও) মলা ও গুড়া মাছ, চিংড়ি, চিকেন ও মজাদার গরুর মাংস। রান্নার সবকিছু শেষ করে অবশেষে মধ্যাহ্ন ভোজের পালা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্পকথার অলংকরণ। বিকেলের সূর্য থেকে মিষ্টি রোদ নেমে এসে আমাদের আড্ডায় রং মাখিয়ে যায়। এভাবেই বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু খাবার আমরা সবাই মজা করে খেলাম।

সত্যিই, স্মৃতির কেয়ারীতে জমে থাকা শৈশব থেকে শুরু করে, এই ইস্পাতকঠিন আমার প্রিয় সেই রোমান্টিক মানুষটি সবার কাছে পরিচিত একজন মানুষ। নিউইয়র্কে আমি তাকে মুগ্ধতার সঙ্গে যতবার দেখেছি, পুলকিত ও চমকিত হয়েছি। আমাদের চিলেকোঠায় তিনি মাত্র একবার এসেছিলেন। কিন্তু আমি তাঁর বাসভবনে সস্ত্রীক গিয়েছি। বাড়িটির মনোরম পরিবেশ খুব সুন্দর। সেখানেও তার রুচিবোধের স্পষ্ট ছাপ বিদ্যমান। ভাবি ও তাঁর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছি, অভিভূত হয়েছি। আমার সেই প্রিয় বৃক্ষপ্রেমী ভোজন রসিক রোমান্টিক মানুষটি হলেন, সৈয়দ টিপু সুলতান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন