default-image

‘গ্রেহাউন্ড’ বাস থেকে বিশাল স্যুটকেসটা যখন টেনেহিঁচড়ে নামাচ্ছি, মাঝ বয়সী এক শুকনা পাতলা সাদা নারীর দিকে চোখ পড়ল। চোখে সানগ্লাস থাকলেও দিব্যি বোঝা যাচ্ছে তার দৃষ্টি আমার দিকেই। স্টেশনের ওয়েটিং এরিয়ার আশপাশে চোখ বুলিয়ে আর কাউকে অপেক্ষমাণ দেখতে পেলাম না। তার মানে সে-ই মার্জি, তার বাড়িতেই আগামী দুই সপ্তাহের জন্য অতিথি হতে যাচ্ছি।

হাসিমুখে এগিয়ে অভিবাদন জানালাম। টুকটাক কথা বলতে বলতে তার ট্রাকের দিকে এগোচ্ছি। খেয়াল করলাম, মুখে কিছু না বললেও সে কিন্তু ঠিকই আড়চোখে কয়েকবার স্যুটকেসটার দিকে তাকালেন। যেন সাইজ পরখ করছে।

ভারী স্যুটকেসটা ট্রাকের পেছনে ওঠাতে দুজনেরই হাত লাগাতে হবে। ট্রাকের কাছে পৌঁছে হেসে বললাম, ‘আসলে জানো তো, আমরা এশিয়ানরা যেখানেই যাই, সমস্ত জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে যাই।’ উত্তরে আলতো হেসে ও বলল, ‘তোমাকে বলেছিলাম সব ধরনের আবহাওয়ার উপযোগী পোশাক নিয়ে আসতে। তুমি তাই করেছ। আর তুমি তো জানো না কত দিন আমাদের সঙ্গে থাকতে যাচ্ছ।’

সত্যিই অনির্দিষ্টকালের জন্য নিরুদ্দেশ হতে চেয়েছিলাম মার্জির খামার বাড়িতে। প্রাথমিকভাবে ১৫ দিনের একটা পরিকল্পনা থাকলেও কথা ছিল, ভালো লেগে গেলে পুরো এপ্রিল মাস থেকে যেতে পারি। তা সাত দিনের বেশি আর নিরুদ্দেশ থাকা হলো কই? টানা বৃষ্টি এসে সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছে।

নিউইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, পেনসিলভানিয়ার সীমানা ঘেঁষা ছোট্ট শহর কর্ণিং। কর্ণিং আর পাশের শহর আলমিরার মাঝামাঝি পাহাড়ের ঢালের ওপর ২৫ একর জমিতে মার্জির খামারবাড়ি ‘ব্লু বার্ড ট্রেইল ফার্ম’, নির্বাসনের জন্য একেবারে আদর্শ জায়গা। শীতে ন্যাড়া হয়ে যাওয়া লম্বা লম্বা গাছ আর কয়েকটা গাঢ় সবুজ পাইনের সারির আগে পরে শুধু ধু ধু পাহাড়ি প্রান্তর। মাঝখানে একটি মাত্র বড় ঢালু রাস্তা। অনেক দূরে একটা গরুর খামার ও আরেকটা ঘোড়ার ফার্ম ছাড়া রাস্তার আশপাশের কয়েক মাইলের মধ্যে আর কিছু চোখে পড়েনি। এই নির্জন প্রান্তরেই ২০ বছর আগে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসে ঘর বাধে মার্জি আর তার স্বামী বিল। বিল পেশায় এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ার। কর্ণিং গ্লাস করপোরেশনে ভালো চাকরির সুবাদে এখানে চলে আসেন। কিন্তু মূল শহরে থাকার বদলে শহর থেকে ২০ মিনিট দূরে বসত গড়েন স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রী মার্জির মর্জিতে। কৃষি-পরিবারে বেড়ে ওঠা মার্জির শখ ছিল নিজের একটা কৃষি খামারের। শহরের ব্যয়বহুল জীবনযাত্রায় সঞ্চয়ের সুযোগ সীমিত। তাই স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নেন, লোকালয় থেকে দূরে সংসার পাতবেন। মাটি-কাদার মধ্যেই চার বাচ্চাকে মানুষ করবেন।

বিজ্ঞাপন

মার্জিদের ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। চার সন্তান বড় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নানা প্রান্তে চলে গেছে। বিল ও মার্জি দম্পতি এখন পুরোদস্তুর কৃষক। তাদের ফার্মে গত কয়েক বছরে নিউইয়র্কের সার্টিফায়েড অরগানিক ফার্মগুলোর উফ হোস্ট হিসেবে বেশ নাম কুড়িয়েছে। সে ভরসাতেই নিজের প্রথম উফিংয়ের অভিজ্ঞতা নিতে ব্লু বার্ড ট্রেইল ফার্ম বেছে নিয়েছি।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অপরচুনিটিস অন অরগানিক ফার্মস (উফ) মানে কোনো জৈব কৃষিভিত্তিক খামারে গিয়ে কাজ করার সুযোগ। সোজা বাংলায়, কোনো কৃষি খামারে কাজের বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার আনুষ্ঠানিক সুযোগ।

প্রকৃতিনির্ভর কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জৈব কৃষিভিত্তিক খামারগুলো একত্রিত হয়ে পরিচালনা করে চমৎকার এই কার্যক্রম। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো দেশের খামারে গিয়ে থেকে, প্রকৃতিবান্ধব বিকল্প জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়। বর্তমানে প্রায় ৫০ টিরও বেশি দেশে রয়েছে উফ নিবন্ধিত সংগঠন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় দুই হাজার খামার এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, এমনকি বাংলাদেশেও আছে তিনটি খামার।

সস্তায় ঘোরাঘুরির উপায় হিসেবে পশ্চিমা বিশ্বের তরুণদের মাঝে আগে থেকেই বেশ জনপ্রিয় উফিং। থাকা-খাওয়ার খরচের বালাই নেই, কৃষি কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন নেই। শুধু বয়স ১৮ হলেই পছন্দমতো খামারে যত দিন ইচ্ছা থাকার জন্য উফের ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করা যাবে। আবেদন করার আগে নিজের পূর্ণ বিবরণসহ উফের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিবন্ধন করতে হবে নামমাত্র মূল্যে। এ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি সহজ, জটিলতা শুরু হয় জুতসই হোস্ট খুঁজে বের করতে। একেক খামার একেক রকম, কোনোটা রকমারি সবজির তো কোনোটা ফুলের। কোনো খামারে খাবার বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়, কোনোটাতে ইন্টারনেট নেই আবার কোনোটায় স্বেচ্ছাসেবকদের থাকার জন্য আলাদা কোনো ঘর নেই। সেখানে নিজের তাঁবু নিয়ে যেতে হবে।

গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রায় এক শ খামারের প্রোফাইল ঘেঁটে ডজনখানেক খামারে যোগাযোগ করার প্রেক্ষিতে এ বছর মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্লু বার্ড ফার্মে ভলান্টিয়ার হওয়ার অনুমোদন পেলাম।

করোনাকালে রাজ্যের বাইরের অনেক ফার্মে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন আবশ্যক। তাই নিউইয়র্ক স্টেটের মধ্যেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষা কোনো ফার্ম খুঁজছিলাম, যার আশপাশে হাইকিং ট্রেইল আছে। ব্লু বার্ড ট্রেইল নাম দেখেই পছন্দ হয়েছিল।

গিয়ে দেখি আক্ষরিক অর্থেই ট্রেইলের দুই পাশজুড়ে খানিক পর পর পাখির জন্য তৈরি বাসা খুঁটি গেড়ে বসানো। এটা আসলে ইস্টার্ন ব্লু বার্ড সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বহু আগে চালু হওয়া উদ্যোগ। শুধু পাখির বাসা তৈরি করার মধ্যেই মার্জির উদ্যোগ সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য আঞ্চলিক পাখি, গাছ, ফুল চেনাতে বাচ্চাদের জন্য রয়েছে বিশেষ কার্যক্রম। স্থানীয় এলিমেন্টারি স্কুলগুলো থেকে বাচ্চারা আসে প্রকৃতি চিনতে। এক ঘণ্টা ফার্ম ঘুরে দেখার পর ছোট্ট ডোবার পাশে কাটা গাছের গুঁড়ির ওপর পা দুলিয়ে বসে বাচ্চারা ন্যাচারালিস্ট মনিকার সঙ্গে ক্লাস করতে। রকমারি ব্যাঙের ডাক, পাখির ডাকের পার্থক্য শেখানো হয়। চেনানো হয় ঝোপের মাঝে পাখির বাসা, বাসায় থাকা ডিম। ম্যাগনিফাইং গ্লাসের তলায় হরিণের পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়ে বাচ্চারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সামারে চলে পশু-পাখির ছবি আঁকা, টুকটাক কাঠ-কাপড়ের কাজ, ঘোড়ায় চড়া আর বাগান করার কার্যক্রম।

বাচ্চাদের শিক্ষামূলক কার্যক্রমে আমার সম্পৃক্ততা ছিল খুবই কম। আমার দায়িত্ব ছিল মূলত ঘোড়া, গাধা, ভেড়া, ছাগল, গিনি (বুনো টার্কি) ও খরগোশ প্রভৃতি প্রাণীদের খাওয়ানো, যত্ন-আত্তি করা। হাঁস-মুরগির খোপ পরিষ্কার করে ডিম সংগ্রহ করা, ধুয়ে প্যাকেট করা। শীতের শেষে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে আসন্ন সামারের নতুন বাগান করার জন্য/ফসল ফলানোর জন্য জমি প্রস্তুত করা। প্রথম প্রথম রেক দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে করতেই হাত, কোমর ব্যথা হয়ে যেত। তবু সারা দিন মাটি কুপিয়ে আপেল গাছের জন্য গর্ত খুঁড়েছি, রসুন, মাশরুমের বেড তৈরি করেছি। সন্ধ্যায় ফিরে এসে আবার নিজের খাবার নিজেকেই তৈরি করে খেতে হয়েছে।

আমার কাজের সঙ্গী ছিল রেচেল, আমার রুমমেট। ভলান্টিয়ার হিসেবে আমাকে দিনে ছয় ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয়নি। নয়টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কাজ, মাঝে লম্বা লাঞ্চ ব্রেক, তারপর আবার দুপুর থেকে বিকেলের শিফট। মার্জিকে দেখতাম ভোর থেকে সন্ধ্যা, কখনো রাত পর্যন্ত তৎপর। বিল চাকরি থেকে এখনো অবসর নেননি। তাই ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোয় ফার্মে সময় দিতে পারেন না। ফার্মের কাজ বিশেষ করে কাঠ কাটা, যাবতীয় মেরামত, সারাই উইকেন্ডে করেন।

মার্জি ও বিল বেশ অভিজাত রুচির মানুষ। রাতে পুরোনো কাঠের লণ্ঠনের টিমটিমে আলোয় প্রার্থনা সেরে এক সঙ্গে ডিনার সারা হয়। এটা এ বাড়ির রেওয়াজ। ২৫ মার্চ রাতে বিল ও মার্জির সঙ্গে প্রথম ডিনার করতে বসে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে যখন দেশের নাম নিলাম, ওরা জানাল, ছয় বছরের উফিংয়ে এই প্রথম বাংলাদেশ থেকে কাউকে পেয়েছে। বিল কর্মসূত্রে প্রথম জীবনে বেশ কিছুদিন ভারতে থেকেছে, অথচ পাশের দেশটার নাম শোনেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে দিনভর তুমুল ঝড়-বৃষ্টি হলো। বাইরে আজ আমাকে কাজ দেওয়া হয়নি। একলা ঘরে মোজার্টের সুরের সঙ্গে নিঃসঙ্গতা আর আক্ষেপ চেপে ধরল—কী দরকার ছিল স্বাধীনতা দিবসের দিনেই নিউইয়র্কে স্বদেশিদের সঙ্গে উৎসব আনন্দ ছেড়ে বিদেশিদের এই নিঝুম নিরালায় চলে আসার? বিকেলে ওয়াল্টার এলে বিষণ্নতা কাটল। ওয়াল্টার মার্জির পোষা কুকুর। ভীষণ মিশুক আর খেলার পাগল ওয়াল্টার আমার খামারবাসের পুরোটা সময় অকৃত্রিম বন্ধুত্ব নিয়ে পাশে ছিল।

শেষ দিন কর্ণিং ফিরে যাওয়ার পুরোটা রাস্তায় ট্রাকে ওয়াল্টার আমার কোলে বসেছিল। সদা স্বল্পভাষী, গম্ভীর স্বভাবের মার্জি বিদায়ের মুহূর্তে ফার্মের তৈরি এক কৌটা মধু হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঝট করে জড়িয়ে ধরল। কানে কানে বললাম, ‘ভালো থেকো।’ অস্ফুট স্বরে শুনতে পেলাম, ‘You are so lovely.’

বিজ্ঞাপন
সাজসজ্জা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন