বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

যুক্তরাষ্ট্রে পাতা ঝরার দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর ‘হ্যালোউন ডে’ উৎসব হয়। একে আমি বলি ভৌতিক মুখোশের উৎসব। ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’র উৎসব। নভেম্বরের শুরুতেই শুরু হয় ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’র আমেজ। যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুটি উৎসবের একটি ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’। এটি একটি সর্বজনীন উৎসব। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মহাসমারোহে উদ্‌যাপন করা হয় দিনটি। অনেকটা আমাদের দেশের ঘরে ঘরে ফসল তোলার নবান্নের উৎসবের মতো। বিশ্ববিখ্যাত শপিং প্রতিষ্ঠান ‘মেসিস’ দিবসটিকে ঘিরে বর্ণাঢ্য প্যারেডের আয়োজন করে থাকে। বিভিন্ন জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র বিশালাকৃতির বেলুনে ফুলিয়ে, নানা রকম সাজসজ্জার ক্লাউন ও বাদক দল দিয়ে প্যারেডটিকে আকর্ষণীয় করা হয়। মানুষ অধীর আগ্রহে তা দেখতে সড়কের দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।

অবশ্য এই বিশেষ দিনটি উদ্‌যাপনে অন্যবারের ন্যায় বিশেষ কোনো তোড়জোড় নেই এবার। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সব জমকালো আয়োজনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে মহামারির কথা ভেবে। তবুও ভিন্ন আঙ্গিকে ঘরোয়াভাবে ছোট পরিসরে নিজেদের মতো করে দিনটি উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সব। নভেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবার দিনটি পালিত হয়ে থাকে। এর পেছনে জড়িয়ে আছে বিষাদময় এক ইতিহাস।

স্বাধীনভাবে ধর্ম চর্চায় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়া একদল মানুষ ১৬২০ সালে ইংল্যান্ড ছেড়ে ‘মে ফ্লাওয়ার’ নামক জাহাজে চড়ে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে রওনা দেন। কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের প্লিমিথ গ্রামে যাত্রাবিরতি করে জাহাজটি। কিন্তু অনাহারে, অর্ধাহারে, তীব্র শীতের প্রকোপে ১০২ জন নারী, পুরুষ, শিশু যাত্রীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৪ জন বেঁচেছিলেন। সেই দুর্দিনে প্লিমিথ গ্রামের আদিবাসীরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। তাদের শস্য চাষ করার প্রক্রিয়া, মাছ ধরার কৌশল ও ম্যাপল গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার পদ্ধতি শেখান। ফলে পরের বছর গ্রীষ্মে আশাতীত ফলন হয়।

আদিবাসী ও বহিরাগতরা মিলে একে অন্যকে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও এক ভূরিভোজের আয়োজন করেন। ময়ূরের মতো দেখতে টার্কি মসলা মাখিয়ে পুড়িয়ে তা দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে তারা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান তাদের বাঁচিয়ে রাখতে এবং আশাতীত ফলনের জন্য। এটিই ক্রমশ ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য, সবাই মিলে একত্রে খাওয়া-দাওয়া ও উৎসবের মাধ্যমে ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানানো। প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন প্রথম জাতীয় পর্যায়ে দিনটিকে স্বীকৃতি দেন ১৭৮৯ সালের ২৬ নভেম্বর। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দিনটিকে বার্ষিক ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন ১৯৬৩ সালে।

এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত আয়োজন হওয়ায় পাশ্চাত্যে বসবাসরত বাঙালিরাও দিনটি উদ্‌যাপন করে থাকেন। কেউ কেউ দিবসটিকে সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ হিসেবে উদ্‌যাপন করেন। আবার অনেকে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়পরিজনকে ধন্যবাদ জানানোর দিন ভাবেন। পাশ্চাত্যের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এ দেশের সংস্কৃতিকে নিজস্ব আঙ্গিকে তুলে ধরার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন অনেকে। যেহেতু এটি কোনোভাবেই ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, তাই আমরা এই দিনে বাড়িতে বন্ধু, আত্মীয়-পরিজন সবাই মিলে একত্রিত হই। হালাল টার্কি দেশীয় পদ্ধতিতে মসলা মাখিয়ে ওভেনে পুড়িয়ে রাতের খাবারের টেবিলে পরিবেশন করি। সঙ্গে থাকে ক্র্যানবেরি সস, পাম্পকিন পাই, মিষ্টি আলুর ক্যানডি, ম্যাশড পটেটো ও দেশীয় খাবার।

সবাই মিলে আনন্দের সঙ্গে সময় কাটানো ও খাওয়া–দাওয়া শেষে জীবনের প্রতিটি সাফল্যের জন্য আমাদের প্রতি অবারিত করুণা বর্ষণের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বন্ধুরা একে অন্যকে ধন্যবাদ জানাই সারা বছর বিপদে–আপদে পাশে থাকার জন্য। আত্মীয়-পরিজনহীন এই দূর দেশের শুরুর দিনগুলোতে যারা একটি চাকরি পেতে সহযোগিতা করেছিলেন কিংবা একটি বাসা পেতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যারা রাস্তাঘাট চিনিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি দিনটিতে।

সাজসজ্জা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন