রঙিন প্রকৃতিতে লেখক রিমি রুম্মান, তাঁর পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা
রঙিন প্রকৃতিতে লেখক রিমি রুম্মান, তাঁর পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা

কবি বলেছেন, চির সবুজের দেশ বাংলাদেশ। ষড়্ঋতুর সেই সবুজ দেশে জন্মেছি আমি। কিন্তু এই পাশ্চাত্যে এসে দেখেছি, এখানকার প্রকৃতি চার ঋতুতে সাজানো। স্প্রিং, সামার, অটাম, উইন্টার। প্রতিটি ঋতুই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ঋতুর যে বিবর্তন, দেশে থাকতে তা কখনো সেই অর্থে উপলব্ধি করা হয়নি। সবুজের বাইরেও যে প্রকৃতির আরও কত রং আছে! প্রকৃতির অন্তর্গত সেসব রঙের ছোঁয়া দেখেছি এই যুক্তরাষ্ট্রে এসে। এ যে হাজারটা ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া প্রকৃতি নয়। এ না চাইলেও সামনে এসে, রং ছড়িয়ে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা এক ঝলমলে উজ্জ্বল প্রকৃতি। এই যান্ত্রিক শহরে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলা মানুষগুলো প্রকৃতির প্রতিটি অধ্যায় তীব্রভাবে উপভোগ করে। এখানে অক্টোবর-নভেম্বরে বাহারি সব পাতার বর্ণিল সাজে ঝলমল করে উঠে শরৎ ঋতু। অর্থাৎ শরৎ ঋতুকেই এ দেশে অটাম কিংবা ‘ফল সিজন’ বলা হয়। বাংলায় বলে ‘পতন ঋতু’।

লাল-খয়েরি-হলুদ-কমলার অদ্ভুত এক অনুভূতির নাম ‘ফল সিজন’। এ সময়ে হাইওয়ে ধরে দুর্বার গতিতে ছুটে চলা গাড়ি থেকে সড়কের দুপাশে প্রকাণ্ড সব গাছের দিকে তাকালে আগুন লাগা বর্ণিল রং যে কাউকে নিয়ে যাবে অদ্ভুত এক ঘোরের জগতে। আর পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে যত দূর চোখ যায়, তাকালে মনে হবে গাছে গাছে হলি খেলা চলছে। কেউ আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। কিংবা মনে হবে শিল্পীর হাতে যত্নে আঁকা রঙিন ক্যানভাস। কিন্তু প্রকৃতির এই অনিন্দ্য রূপান্তর খুবই ক্ষণস্থায়ী।

ঝিরিঝিরি শীতল বৈরী বাতাস পাতাদের গান শোনাতে শোনাতে কখন যে মাটির দিকে টেনে নেয়! মাটিতে লুটোপুটি খায় বিবর্ণ ঝরাপাতা। স্তূপীকৃত হয়ে পুরু কার্পেটের মতো পড়ে থাকে শহরের সড়কজুড়ে। ম্যাপল কিংবা পাইন গাছের পাতা পড়ে থাকে কাঠের বেঞ্চিতে, রাস্তার দুই পাশে পার্ক করা গাড়িতে। কখনোবা ব্যস্ততম সড়কে ছুটে চলা গাড়ির চাকার সঙ্গে ছুটে যায় শুকনো পাতা উদাসী সুরে। কিছু দূর গিয়ে থমকে থাকে পিচঢালা পথের বাঁকে বাঁকে। তাদের মাড়িয়ে হেঁটে চলে মানুষের কোলাহল। চরাচরে কান পেতে ঝরাপাতার মর্মর ধ্বনি শোনার সময় নেই কারও। আমরা পাতায় পাতায় ভরে থাকা বাড়ির সামনের অংশটুকু ঝাঁট দিয়ে তুলে নিই তাদের। অবশিষ্টরা উদাসী বাতাসে পাক খেতে খেতে গড়াগড়ি খায় পথের আনাচে-কানাচে। যেন হৃদয়ের ভেতরে ঘূর্ণি পাতার মতো ঘুরে ঘুরে বলে যায়, এ বেলায় যাই তবে, ফের দেখা হবে, দেখা হবে...। ঝরাপাতার বিদায়ে চারদিকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে নিষ্পত্র কঙ্কালসার বৃক্ষরাজি। যেন হাহাকার করা বিষণ্ন সুন্দর প্রকৃতি। জানি, গ্রীষ্মের আগমনে আবার গাঢ় সবুজ পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে উঠবে বৃক্ষরাজি। ফুলে ফুলে ভরে উঠবে আঙিনা, পথ-ঘাট। তবুও।

বিজ্ঞাপন
default-image

যুক্তরাষ্ট্রে পাতা ঝরার দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর ‘হ্যালোউন ডে’ উৎসব হয়। একে আমি বলি ভৌতিক মুখোশের উৎসব। ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’র উৎসব। নভেম্বরের শুরুতেই শুরু হয় ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’র আমেজ। যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুটি উৎসবের একটি ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’। এটি একটি সর্বজনীন উৎসব। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মহাসমারোহে উদ্‌যাপন করা হয় দিনটি। অনেকটা আমাদের দেশের ঘরে ঘরে ফসল তোলার নবান্নের উৎসবের মতো। বিশ্ববিখ্যাত শপিং প্রতিষ্ঠান ‘মেসিস’ দিবসটিকে ঘিরে বর্ণাঢ্য প্যারেডের আয়োজন করে থাকে। বিভিন্ন জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র বিশালাকৃতির বেলুনে ফুলিয়ে, নানা রকম সাজসজ্জার ক্লাউন ও বাদক দল দিয়ে প্যারেডটিকে আকর্ষণীয় করা হয়। মানুষ অধীর আগ্রহে তা দেখতে সড়কের দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।

অবশ্য এই বিশেষ দিনটি উদ্‌যাপনে অন্যবারের ন্যায় বিশেষ কোনো তোড়জোড় নেই এবার। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সব জমকালো আয়োজনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে মহামারির কথা ভেবে। তবুও ভিন্ন আঙ্গিকে ঘরোয়াভাবে ছোট পরিসরে নিজেদের মতো করে দিনটি উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সব। নভেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবার দিনটি পালিত হয়ে থাকে। এর পেছনে জড়িয়ে আছে বিষাদময় এক ইতিহাস।

স্বাধীনভাবে ধর্ম চর্চায় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়া একদল মানুষ ১৬২০ সালে ইংল্যান্ড ছেড়ে ‘মে ফ্লাওয়ার’ নামক জাহাজে চড়ে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে রওনা দেন। কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের প্লিমিথ গ্রামে যাত্রাবিরতি করে জাহাজটি। কিন্তু অনাহারে, অর্ধাহারে, তীব্র শীতের প্রকোপে ১০২ জন নারী, পুরুষ, শিশু যাত্রীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৪ জন বেঁচেছিলেন। সেই দুর্দিনে প্লিমিথ গ্রামের আদিবাসীরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। তাদের শস্য চাষ করার প্রক্রিয়া, মাছ ধরার কৌশল ও ম্যাপল গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার পদ্ধতি শেখান। ফলে পরের বছর গ্রীষ্মে আশাতীত ফলন হয়।

আদিবাসী ও বহিরাগতরা মিলে একে অন্যকে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও এক ভূরিভোজের আয়োজন করেন। ময়ূরের মতো দেখতে টার্কি মসলা মাখিয়ে পুড়িয়ে তা দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে তারা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান তাদের বাঁচিয়ে রাখতে এবং আশাতীত ফলনের জন্য। এটিই ক্রমশ ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য, সবাই মিলে একত্রে খাওয়া-দাওয়া ও উৎসবের মাধ্যমে ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানানো। প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন প্রথম জাতীয় পর্যায়ে দিনটিকে স্বীকৃতি দেন ১৭৮৯ সালের ২৬ নভেম্বর। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দিনটিকে বার্ষিক ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন ১৯৬৩ সালে।

এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত আয়োজন হওয়ায় পাশ্চাত্যে বসবাসরত বাঙালিরাও দিনটি উদ্‌যাপন করে থাকেন। কেউ কেউ দিবসটিকে সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ হিসেবে উদ্‌যাপন করেন। আবার অনেকে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়পরিজনকে ধন্যবাদ জানানোর দিন ভাবেন। পাশ্চাত্যের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এ দেশের সংস্কৃতিকে নিজস্ব আঙ্গিকে তুলে ধরার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন অনেকে। যেহেতু এটি কোনোভাবেই ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, তাই আমরা এই দিনে বাড়িতে বন্ধু, আত্মীয়-পরিজন সবাই মিলে একত্রিত হই। হালাল টার্কি দেশীয় পদ্ধতিতে মসলা মাখিয়ে ওভেনে পুড়িয়ে রাতের খাবারের টেবিলে পরিবেশন করি। সঙ্গে থাকে ক্র্যানবেরি সস, পাম্পকিন পাই, মিষ্টি আলুর ক্যানডি, ম্যাশড পটেটো ও দেশীয় খাবার।

সবাই মিলে আনন্দের সঙ্গে সময় কাটানো ও খাওয়া–দাওয়া শেষে জীবনের প্রতিটি সাফল্যের জন্য আমাদের প্রতি অবারিত করুণা বর্ষণের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বন্ধুরা একে অন্যকে ধন্যবাদ জানাই সারা বছর বিপদে–আপদে পাশে থাকার জন্য। আত্মীয়-পরিজনহীন এই দূর দেশের শুরুর দিনগুলোতে যারা একটি চাকরি পেতে সহযোগিতা করেছিলেন কিংবা একটি বাসা পেতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যারা রাস্তাঘাট চিনিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি দিনটিতে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0