default-image

সংগীতশিল্পী সায়েরা সুলতানা রেজা। সংগীতাঙ্গনে তিনি সায়েরা রেজা নামে পরিচিত। ৩০ বছর ধরে সুরের সাধনা করছেন। কণ্ঠের বিশিষ্টতার জন্য তাঁর বন্দনা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে প্রথম আসার পরে টাইম টিভিতে সায়েরা রেজার একক সংগীত সন্ধ্যার সরাসরি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। তখন শিল্পীর নামের সঙ্গে সেভাবে পরিচিত ছিলাম না। তবে বাসায় ফিরেছিলাম একরাশ তৃপ্তি নিয়ে। স্টেজ প্রোগ্রাম, টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি নিয়মিত অ্যালবাম করেন তিনি। ‍সুখের অমিল (অগ্নিবীণা), এক নিশীথে (লেজারভিশন), আরবান ফোন (গানচিল) ইতিমধ্যে তাঁর অ্যালবাম বের করেছে। কিছুদিন আগে শো–টাইম মিউজিক প্রেজেন্টস নিউইয়র্ক নগরের কুইন্স প্যালেসে সায়েরা রেজার একক সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর আরও কিছু অর্জন আছে। সে সব নিয়ে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সঙ্গে কথা বলেন প্রতিভাবান এই সংগীতশিল্পী।

নিউইয়র্কে কবে এলেন?

সায়েরা রেজা: স্বামী জাতিসংঘ সদর দপ্তরে যোগ দেওয়ায় ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে পরিবারসহ নিউইয়র্কে আসা। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও পরে তাঁর উচ্চতর পদে পদোন্নতির ফলে থেকে যেতে হলো।

এখানকার জীবন কেমন লাগছে?

সায়েরা রেজা: আলহামদুলিল্লাহ। তবে একজন পেশাদার ও মূলধারার শিল্পী হিসেবে মাঝে মাঝে কিছুটা মন যে খারাপ হয় না, তা নয়। নিউইয়র্ক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে যথেষ্ট পরিমাণে শো করলেও এখানকার পরিসর তো আর বাংলাদেশের মতো নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে আমাদের কাজের সুযোগটা অনেক বেশি।

গানের পাশাপাশি এখানে কি করছেন?

সায়েরা রেজা: আমি গানের মানুষ। ৩০ বছর ধরে গান করছি। গানই আমার ধ্যান, জ্ঞান ও পেশা। তাই গানের বাইরে আর অন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করি না।

কি করতে চান ভবিষ্যতে?

সায়েরা রেজা: বাংলার সুফি ও ফোক গান অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এগুলোর সঙ্গে এখানকার গান ও মিউজিকের ফিউশন করা গেলে তা বাঙালির গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের দরবারে সগৌরবে বিচরণ করবে বলে আমি মনে করি। সে লক্ষ্যেই বেশ কিছুদিন ধরে চেষ্টা করছি, নিউইয়র্কের মূলধারার মিউজিশিয়ানদের নিয়ে একটা মানসম্মত ব্যান্ড করার। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মিটিংও হয়েছে। দেখি কত দুর কি হয়।

প্রকাশের অনেক মাধ্যম থাকতে আপনি কেন সংগীতকে বেছে নিলেন?

সায়েরা রেজা: শৈশব ও কৈশোরে একাধারে নাটক, সিনেমা, উপস্থাপনা ও গানসহ বেশ কয়েকটি মাধ্যমেই কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। তবে একটা সময়ে এসে বুঝতে পারলাম, গানটাই আমাকে বেশি টানছে। তাই অন্য সব ছেড়ে গানেই মনোযোগ দেওয়া।

বিজ্ঞাপন

জীবনে কি হতে চেয়েছিলেন?

সায়েরা রেজা: অবশ্যই সব সময় একজন আপাদমস্তক শিল্পী হতে চেয়েছি। কতটুকু হতে পেরেছি, তা আমার শ্রোতারাই ভালো বলতে পারবে।

কোনো অপ্রাপ্তি কি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়?

সায়েরা রেজা: প্রতিটি শিল্পীই বোধকরি চায়, অসংখ্য ভালো ভালো কাজ রেখে যেতে। কিন্তু স্বামীর পেশাগত সীমাবদ্ধতা (সেনাবাহিনীর চাকরি) এবং ক্যারিয়ারের বেশ কিছু সময় দেশের বাইরে থাকায় পেশাদার মাধ্যম থেকে বেশ কিছুটা সময় দূরে থাকতে হয়েছে। সে কারণে আমার মাঝে মধ্যেই মনে হয়, এ যাবৎ আমার আরও বেশি ভালো ভালো কাজ হতে পারত।

করোনাকালের জীবনযাপন নিয়ে বলেন?

সায়েরা রেজা: করোনা আমাদের পুরো লাইফ স্টাইলই বদলে দিল। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডার সব ওলট-পালট। কানাডাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে আমার বেশ কিছু কনফারেন্স শো ভেস্তে গেল। গানের মানুষ, গান ছাড়া থাকাটা নিশ্চয়ই সুখের নয়। তবে স্বস্তির ব্যাপার হলো, পরিবারের সবাইকে নিয়ে স্রষ্টার দয়ায় এখনো সুস্থ আছি।

আপনাকে সুফিবাদী শিল্পী বলা হয়, আপনি কি আধ্যাত্মিক সংগীতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

সায়েরা রেজা: সব ধরনের গান জানলেও লোকে বলে সুফি, মহাজনী ও ফোক ঘরানার গান নাকি আমার কণ্ঠে বেশি মানায়। আমি জানি, আমার ভোকাল টোনটি টিপিক্যাল নারী কণ্ঠের মতো নয়, একটু ঝাঁজালো ও হাস্কি—যা কিনা এ ধরনের গানের সঙ্গে বেশি যায়। এ ধরনের গানের সঙ্গে আমি কানেক্টও করতে পারি ভালো। তবে লক্ষ্য করে থাকবেন, সময়ের চাহিদা মাথায় রেখে, এ ধরনের গানকে আমি স্বকীয় ঢঙে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। এ জন্যই হয়তো মানুষ তা স্বাদরে গ্রহণ করে।

আপনার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট কি, যেটা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে?

সায়েরা রেজা: একজন কণ্ঠশিল্পীর পরিচয় তৈরি হয় তার মৌলিক গানে। টিভি, রেডিও এবং মঞ্চে ব্যস্ত থাকলেও ২০০৮ পর্যন্ত আমার কোনো মৌলিক গান ছিল না। সে বছর জি সিরিজের ব্যানারে বাপ্পা মজুমদারের সুর ও সংগীতে আমার প্রথম একক অ্যালবাম বাজারে আসে। সে অ্যালবামের ‘ধার ধারিনা পাড়াপড়শির, ধার ধারিনা কারও’ শিরোনামে প্রথম গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর আমার একাধিক অ্যালবাম ও গান জনপ্রিয় হলেও এ গানটির আবেদন আমার কাছে সব সময় অন্যরকম।

আপনার পরিবার সম্পর্কে জানাবেন…?

সায়েরা রেজা: আমার স্বামী ‘সোর্ড অব অনার’ খেতাবে ভূষিত একজন সেনা কর্মকর্তা। তিনি বর্তমানে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে কর্মরত আছেন। আমার ছেলে–মেয়ে দুজনেই উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করছে। এরা প্রত্যেকেই আমার গান ভালোবাসে এবং আমার শিল্পীসত্তাকে সম্মান করে।

কোন লেখক, কবি, বা শিল্পী আপনার সংগীত ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে?

সায়েরা রেজা: ফকির লালন শাহ, জালালুদ্দিন মোহাম্মদ রুমি, বুল্লেহ শাহ, শাহ আবদুল করিম ও বাউল রশিদ উদ্দিনের মতো মহাজনেরা আমার সংগীত ভাবনাকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে। তবে লালনের বাণীর গভীরতা আমাকে বেশি টানে।

নিউইয়র্কে বর্তমান যারা গান করছেন, তাদের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন করুন।

সায়েরা রেজা: নিউইয়র্কে বর্তমানে যারা গান করছেন, তাদের অনেকেরই মেধা ও গলা যথেষ্ট ভালো। এ দুটির সঙ্গে সংগীত বিষয়ক শিক্ষা ও নিয়মিত সাধনা যোগ হলে তো কথাই নেই। তবে মজার বিষয় হলো, শিল্পী যেমন আছে তেমনি নিজেকে তৈরি করার আগেই শিল্পী পরিচিতি পেতে আগ্রহীদের সংখ্যাও কম নয়। আরেকটা কথা, পারস্পরিক সম্মানবোধের পাশাপাশি একজন সত্যিকারের শিল্পীর ব্যক্তিত্বটা শিল্পীসুলভ হওয়াটা খুব জরুরি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0