default-image

সারা বিশ্বকে থমকে দিয়ে গত বছরের শুরুতে পুরো পৃথিবী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এই ভয়াবহ মহামারির ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পায়নি। লাখ লাখ মানুষের আক্রান্ত হওয়া ও অগণিত মানুষের মৃত্যুর মধ্যে আমিও দুবার করোনা সংক্রমিত হই।

বছরের শুরুতে মার্চ মাসের দিকে যখন প্রথম সংক্রমিত হই, তখন শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক ভয়টা বেশি ছিল। এমনিতেই পুরো নিউইয়র্ক নগর লকডাউন, তার ওপর এই রোগ সম্পর্কে ধারণা কম। এবং সর্বোপরি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপের কারণে সবার চিকিৎসার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা ভীতিকর অবস্থা। তখন প্রায়শই শুনতে পেতাম অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, আর তখন বুকে কাঁপন দেওয়ার সঙ্গে মনটা ভয়ে আঁতকে উঠত। এই বুঝি আশপাশের কোনো প্রতিবেশীর মৃত্যু। মৃতদেহগুলো নেওয়ার জন্যই এই গাড়িগুলো আসত এবং দ্রুতই নিয়ে যাওয়া হতো করোনার বিধি মেনে সমাহিত করার জন্য। এখনো সেই নিষ্ঠুর আর নির্মম দিনগুলোর কথা মনে পড়লে অন্তরাত্মা ভয়ে কেঁপে ওঠে, সারা শরীর কেমন যেন শিউরে ওঠে।

গত বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে লকডাউন শিথিল করা হয়। আমাকেও জীবিকার তাগিদে আবার ব্যবসা শুরু করতে হয়। আবার শুরু হয় আমার ব্যস্ত জীবন। পেশায় একজন কসমোটোলজিস্ট হওয়ায় গ্রাহকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে কাজ করতে হয়। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সব সময় মাস্ক মুখে দিয়ে বা নিয়মিত হাত স্যানিটাইজ করেও নিরাপদ থাকা যায় না। তাই সব সময়ই ভরসা ছিল, এই মহামারির বিনাশ বা দ্রুত সঠিক ভ্যাকসিনের আবিষ্কার।

বিজ্ঞাপন

মহামারি থেকে চূড়ান্ত পরিত্রাণের আশায় থাকতে থাকতেই শীতের আগমন। আর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় কোভিড-১৯–এর দ্বিতীয় ধাক্কা। আবার লকডাউন হবে হবে করেই বড়দিন আর থ্যাংকস গিভিংয়ের ব্যস্ততা পার করলাম। এরপর থেকেই পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম নববর্ষ নিয়ে। কাজের চাপ ছিল। ২৫ ডিসেম্বর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলাম। সকালের দিকে মাথা চক্কর দিল। ভেবেছিলাম অনেক কাজ করেছি, কয়দিন ঠিকমতো নিজেকে সময় দিতে পারিনি, তাই এমন হচ্ছে। অনেকটা সময় চেয়ারে বসেই পার করলাম। আবার যখন কাজ করতে গেলাম, তখন শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি। সারা শরীরে কেমন যেন ব্যথা অনুভব হচ্ছিল, হালকা সর্দি ও ঠান্ডা লাগা। সেদিন কোনো রকম শুয়ে-বসে দিন শেষ করলাম। রাতে বাসায় ফিরলাম। আর কোনো সমস্যা বোধ করলাম না। কিন্তু রাতে ঘুম হলো না। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। বিশেষত পিঠে। আমি ভাবলাম, বোধ হয় পিঠের ব্যথা। ব্যথানাশক ওষুধও খেলাম। তাই আর কাজে গেলাম না।

২৬ ডিসেম্বর দুপুরের পর হঠাৎ গায়ে জ্বর। এরই মধ্যে শরীরের ব্যথাটা বেড়েছে। সামান্য গলা ব্যথাও মনে হলো। তবে কাশি ছিল না। আমার স্বামীর সঙ্গে সমস্যাটা শেয়ার করলাম। বললাম, আমার শরীরটা খুব দুর্বল। হাত-পা নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে। জ্বরের জন্য সে আমাকে টাইনোনাল খাওয়াল। ঘণ্টাখানেক পর জ্বর চলে গেল। কিন্তু শরীর দুর্বল। বেশ একটা গুরুত্ব দিইনি। মনে জোর ছিল, তাই একদিনের ছুটি শেষ করে পরদিন ঠিকই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গেলাম। পেশার কারণে, কাজের টানে ছুটে গেলেও শরীর খুব একটা সায় দিচ্ছিল না। শরীর প্রচণ্ড ব্যথা, সর্দি আর হালকা কাশি। জ্বর না থাকলেও কেমন যেন অসহনীয় একটা পরিস্থিতি, বাধ্য হয়েই বাসায় ফিরে আসি। এরপর থেকেই সারাক্ষণ গরম পানি খাচ্ছি। কিন্তু পিপাসা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে আবার জ্বর জ্বর লাগছে, কিন্তু থার্মোমিটারে দেখি কোনো জ্বর নেই। শরীরের তাপমাত্রা ৯৭.৫ ডিগ্রি, তবু গায়ে ব্যথা বাড়ছে। কোনো খাবার খেতে ইচ্ছা করছিল না। চূড়ান্তভাবে যখন দেখলাম খাবারের স্বাদ–গন্ধ কিছুই পাচ্ছি না, তখন মনের ভেতর ভয় ঢুকে গেল।

আমার এক ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে র‍্যাপিড টেস্ট করে ১৫ মিনিটের মধ্যেই নিশ্চিত হলাম, আমি দ্বিতীয়বারের মতো করোনায় সংক্রমিত। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমার স্বামী কাবির আর দুই ছেলে ঋদ্ধি ও মুগ্ধকে ডেকে বললাম, আমার সঙ্গে দেখা বন্ধ। ওরা বেশ চিন্তিত, কিন্তু আমাকে বুঝতে দিচ্ছিল না। সেদিন বিকেল থেকেই মূলত আমি শ্বাসকষ্ট বোধ করছিলাম। তখন কাবির আমাকে নেবুলাইজ করিয়েছে, ইনহেলার দিয়েছে। শ্বাসকষ্ট হলেই বাসায় রাখা অক্সিমিটার (অক্সিজেনের মাত্রা মাপার যন্ত্র) দিয়ে তা বারবার চেক করছিলাম। ওই দিনগুলো মানসিকভাবে ভয়াবহ ভয়ের মধ্যে ছিলাম। কাবির আমাকে বোঝাচ্ছিল, এই ভয় থেকে যদি আমি বের হয়ে আসতে পারি, তবে আমি জয়ী। যেভাবে হোক, আমাকে জয়ী হতে হবে। সবচেয়ে ভয়ংকর সময় কেটেছে ২৭ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত, পাঁচ দিন। এই কয়টা দিন আমার শরীর দুর্বল, খাবারের গন্ধহীনতা, নিদ্রাহীনতা চরমভাবে ভুগিয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি শ্বাস-প্রশ্বাসে। মাঝে মাঝে মাথা ওপরের দিকে করে শুধুই আল্লাহকে ডেকেছি। পৃথিবীতে শ্বাসকষ্টের চেয়ে বড় কোনো কষ্ট আছে বলে আমার মনে হয়নি।

ব্যায়াম করেছি। কুসুম গরম পানিতে নিয়মিত গোসল করেছি। আর এই কয়দিন নিয়মিত খাবারগুলো অন্য সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে খেয়েছি। সঙ্গে প্রতিদিন দুটি করে ডিম, দুধ, ফল-ফলাদি খেয়েছি প্রচুর। তবে, আমি আমার একাকিত্বের সময়টাকে উপভোগ করার চেষ্টা করেছি। এ সময় অনেক পুরোনো দিনের সিনেমা, নাটক দেখেছি। কিছু লেখালেখির কাজ করেছি। অনেক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। সবাইকে বলেছি, আমি করোনা পজিটিভ, যাতে অন্যরা সাবধানে থাকে। প্রিয় মানুষের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময়ও কেঁদেছি হু হু করে। তবে মনোবল হারাইনি এক মুহূর্তের জন্যও। বারবার মনে হয়েছে, আমাকে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হবে। এই ভাইরাসকে পরাজিত করতেই হবে। তবে বারবার মন খারাপ হয়েছে পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য।

১ জানুয়ারি থেকে কাবিরও অসুস্থ হলো, সঙ্গে দুই ছেলে। তবে ওদের মধ্যে ওরকম কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। ঋদ্ধিকে করোনা পরীক্ষা করতে বললাম। সে বলল, ‘মা আমি পরীক্ষা করাব না। যেহেতু আমরা একসঙ্গে আছি, সুতরাং আমরা সবাই করোনা পজিটিভ। আমাদের করোনার সঙ্গে লড়াই করতে হবে।’ সব কষ্ট দূর করে ঋদ্ধ–মুগ্ধ সুস্থ হলো, আর আমিও।

দুবার সংক্রমিত হয়েও আমি ও আমার পরিবার সুস্থ হয়েছি। অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি। হয়তো অনেকে বলবে, ‘আমরা করোনা জয়ী পরিবার’। কিন্তু অনেকে এই মহামারির সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে গেছে, কত পরিবার হারিয়েছে তাদের আপনজন। স্বজন হারানোর বিষাদ নিয়েই বেঁচে আছে কতজন। তাই, সব সময়ই আশা করি, এই ভাইরাস থেকে সবাই সুরক্ষিত থাকুক। প্রাকৃতিক নিয়মে এই মহামারির বিনাশ বা সঠিক টিকার মাধ্যমে হোক এর শেষ। সব সময়ই স্বপ্ন দেখি, সুন্দর ও সুস্থ একটা পৃথিবীর, যেখানে সবকিছুই হয়ে উঠবে স্বাভাবিক আর ফিরে আসবে সেই চিরচেনা জনপদ।

বিজ্ঞাপন
সাজসজ্জা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন