default-image

সময়ের হাত ধরে চলে এল আরেকটি পয়লা বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ। একান্তই বাঙালির উৎসব। বাঙালি জাতি হিসেবে স্মৃতিকাতর জাতি। সবকিছুতেই অতীত ঐতিহ্য আর স্মৃতি হাতড়ে ফেরে। আর সে বাঙালি যদি প্রবাসী হয়, তবে তো কথাই নেই। গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের মতো এক কথায় আট বস্তা পয়লা বৈশাখের স্মৃতি এনে হাজির করবে।

একটা সময় ছিল, যখন প্রবাসীদের এই স্মৃতি কাতরতা নিয়ে পড়ে থাকতে হতো। এখন প্রবাসী বাঙালিদের সংখ্যা বেড়েছে। সময় পাল্টেছে। এখন প্রবাসীরাও তাদের সব সুখস্মৃতি আর আনন্দ উৎসবকে প্রবাসের মাটিতে আনন্দের সঙ্গে পালন করছে। সেই সব আয়োজন সব সময়ই যে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো, তা বলব না। বরং দুধের স্বাদ দই-মিষ্টিতেও মেটানোর মতোও হয়। সংগত কারণেই এসব আয়োজন আকারে ছোট হয়। তবে জৌলুশের কোনো অভাব থাকে না। পোশাকে–অলংকারে সাজসজ্জায় কোনো কমতি থাকে না।

প্রবাসীদের এসব বাঙালিয়ানা উৎসবের একটি বড় উদ্দেশ্যই থাকে পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাস–ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করানো। সেই কাজটি কতটা ফলপ্রসূ হয়, সেটা একটি বড় আলোচনার বিষয়। বিতর্কের বিষয়ও বটে। ইতিবাচক অর্থেই সে বিতর্ক হতে পারে। দেশে অভিজাত শ্রেণির মানুষের মাঝে যেমন চলনে–বলনে পোশাক–পরিচ্ছদে বিদেশিদের মতো হয়ে ওঠার এক উদগ্র বাসনা কাজ করে, তেমনি প্রবাসীরাও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে স্বদেশিয়ানাকে ধরে রাখতে চায়। বাংলা ভাষা শেখায়, বাঙালি ঐতিহ্যের নাচ-গান শেখায়। এসব প্রচেষ্টা কখনো কখনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়ায় পরিণত হয়। তখন ছেলেমেয়েরা কিছুটা হলেও দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা কি এ দেশে অন্য আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো বড় হবে নাকি অর্ধেক বাঙালি অর্ধেক বিদেশি হবে? বাবা-মায়ের সঙ্গে গাড়িতে বসে বাঙলা গান শুনবে নাকি ইংরেজি গান শুনবে? এই সমস্যা শুধু ছেলেমেয়েদের মধ্যে নয়, বাবা-মায়ের মধ্যেও কাজ করে। এর নাম আইডেনটিটি ক্রাইসিস বা পরিচয়ের সংকট।

বিজ্ঞাপন

বৈশাখী মেলায় গিয়েও দেখা যাবে, বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। কেউ গেম খেলছে, কেউ ইংরেজি গান শুনছে। এর অনেকটাই হয়তো সময়ের পরিবর্তন। দেশে-বিদেশে সবখানেই এই পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি এটিও সত্য, প্রবাসী ছেলেমেয়েরা এসব অনুষ্ঠানে ঠিক প্রাণের টান অনুভব করে না। তবু ঐতিহ্যের সঙ্গে, শেকড়ের সঙ্গে একটা পরিচয় ঘটে। তা ছাড়া, কিছু ছেলেমেয়ে এসব অনুষ্ঠানে বাঙালিয়ানা নাচ–গান পরিবেশন করে, ইংরেজি হরফে লিখে বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে। এ দেশে বড় হওয়া মেয়েরা অনেকে শাড়ি পরে, রঙিন চুড়ি পরে। ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে। আমাদের সেই প্রাপ্তিটুকুই অনেক আনন্দের, অনেক গর্বের।

নতুন করে কিছু পেতে চাইলে কিছু হারাতেও হয়। সে তো শুধু প্রবাসে নয়, দেশেও কি আমরা হারাইনি? পয়লা বৈশাখ তো ছিল আমাদের আবহমান বাঙলার গ্রামীণ উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তির শিবের গাজন, চড়ক পূজা শেষে পয়লা বৈশাখে ছিল কৃষকের লাঙল-জোয়াল, ধামা-কুলার মতো কৃষি সরঞ্জামাদি ধোয়ামোছা করা, ধান বোনার পার্বণ আর ব্যবসায়ীদের হালখাতার দিন। বৈশাখী মেলাও হতো, যার নাম ছিল আড়ং। যেখানে পাওয়া যেত হাতি-ঘোড়ার ছাঁচ, বাতাসা, খাগড়াই, বিন্নি ধানের খই। আর পাওয়া যেত ছোটদের আম কাটার ছুরি থেকে শুরু করে দা, বটি, লাঙলের ফালের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। বৈশাখী প্রভাতফেরি, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশ—এগুলো সংস্কৃতির নগরায়ণ। আমরা প্রবাসের নগর জীবনে সেই সংস্কৃতিরই অনুকরণ করি।

default-image

শেষে আমার যৌবনের একটি বৈশাখী স্মৃতির কথা বলি। সেবার রমনার বৈশাখী অনুষ্ঠান শেষ করে বেরোচ্ছি। বেরোনোর পথে প্রচণ্ড ভিড়ে পড়ে গেলাম। হঠাৎ অনুভব করলাম, কোনো একটি হাত আমার হাতকে শক্ত করে চেপে ধরেছে। বুঝলাম কোনো পুরুষের হাত নয়। তখনো আমার কোনো কোনো নারীর হাতে হাত রাখার অভিজ্ঞতা হয়নি। তাই কিছুটা অবাক হলাম। শিহরিত হলাম। তবে মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম, আমার হাত ধরে আছে। সে আমাকে খুব নির্ভরতার আশ্রয় মনে করেই শক্ত করে ধরে আছে। ভিড়ের তোড়ে কেউ কারও দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। এক সময় পার্কের ফটক পার হয়ে বাইরে ফুটপাতে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার উল্টোদিকে তখন ফকির আলমগীরের গান চলছে—‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’।

আমার, মানে আমাদের আশপাশে তখন ভিড় বেশ হালকা হয়ে গেছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি এক শাড়ি পরা যুবতী তখনো আমার হাত ধরে আছে। কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়। হঠাৎ চোখে চোখ পড়তেই আমার হাত ছেড়ে সে ছিটকে দূরে চলে গেল। আমি সামনের দিকে পা বাড়ালাম। যা আমার নয়, তার পেছনে ছুটে লাভ কি? বরং স্মৃতিটুকুই মধুর। এই দূর পরবাসে এখনো বৈশাখ এলেই সেই স্মৃতি মনে পড়ে। আর মনে মনে ভাবি, আমার স্বদেশ, আমার সংস্কৃতি; ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে-ক্ষণ, ও মোর ভালোবাসার ধন’।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন