default-image

তোমরা মানব, বড় জাতি

আমি ক্ষুদ্র করোনা

আমায় বলো-মরণঘাতী

পারলে কিছু করো না!

এ যেন সৃষ্টির সেরা জীব মানব জাতির প্রতি করোনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া।

ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র এই অণুজীব কী তাণ্ডব না চালাচ্ছে! বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই, আমাদের প্রিয় শহর নিউইয়র্কের কথাই বলি-এই শহরের কী নামডাক! বিশ্বের রাজধানী। নির্ঘুম শহর। সবচেয়ে বড় সম্পদশালী শহর। সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য নিয়ে তার খ্যাতির সীমা নেই। এর আছে বিশাল নাগরিক উদ্যান-সেন্ট্রাল পার্ক। বর্ণিল নিয়ন আলোয় উদ্ভাসিত টাইম স্কয়ার। মঞ্চপাড়া ব্রডওয়ে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিল্পকলা জাদুঘর-মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট। টেলিভিশন স্টুডিও ভবন রকফেলার সেন্টার। অনবদ্য স্থাপত্যশৈলীর গ্রান্ডসেন্টার রেলস্টেশন। সংগীত ও অন্যান্য শিল্প পরিবেশন কেন্দ্র রেডিও সিটি মিউজিক হল। ম্যানহাটনের দৃষ্টিনন্দন আকাশচুম্বী অট্টালিকা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর জন্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি শুধু নিউইয়র্কই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি ও মূল্যবোধের প্রতীক। সেই অহংকারের নিউইয়র্ক, চিরসজীব নিউইয়র্কও করোনার তাণ্ডবে নিথর হয়ে পড়েছিল। রীতিমতো ভয়ংকর এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

করোনার ভয়াল প্রভাব এখনো কাটেনি। এই দেশ, ওই দেশ হয়ে পুরো বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত আঁধার! বড় ধরনের একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর মানবজাতি। অদৃশ্য এক অণুজীবের কারণে বিপর্যয়ের মুখোমুখি সভ্যতা। কোভিড-১৯–এর কারণে চলছে মহামারি। ইতিমধ্যে লাখ লাখ লোক এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে অগণিত মানুষ। বিশ্ব আজ প্রত্যক্ষ করছে আপাত চিকিৎসাহীন এই রোগের কাছে মানুষের অসহায় সমর্পণ। করোনার সর্বগ্রাসী আঘাতে আঘাতে আজ বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। প্রতিটি দেশের কাছে এটি একটি নতুন অভিজ্ঞতা। একদিকে চিকিৎসা নেই, অন্যদিকে রোগটির দ্রুত বিস্তার। স্বাভাবিকভাবে অদৃশ্য এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল ঠিক করতে গিয়ে প্রতিটি দেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তবে, কিছু কৌশলও আবিষ্কার করেছে মানুষ। লকডাউন বা হোম-আইসোলেশনে থেকেও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করা হচ্ছে, আদালতের কাজ চলছে। ঘরে বসে অফিস করছে, ক্লাস করছে, ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড চলছে, টেলিমেডিসিন দেওয়া হচ্ছে। করোনাভাইরাস প্রায় গোটা বিশ্বকে কবজা করার পর ভ্রমণের ইচ্ছা শুধু স্বপ্নই হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক দেশ তাদের নিজস্ব সীমান্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছে। দেশের মধ্যেও ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি দেখা গেছে। লকডাউনের ফলে প্রায় দুই শ কোটি মানুষকে কার্যত গৃহবন্দী থাকতে হয়েছে।

শুধু মানুষ নয়, প্রায় দুই তৃতীয়াংশ যাত্রীবাহী বিমান আকাশে উড়তে পারেনি। বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতও মারাত্মক ক্ষতির মুখ দেখেছে। এমন জরুরি পরিস্থিতিতে অনেক জনপ্রিয় শহর ও অঞ্চল বিনা মূল্যে ভার্চুয়াল ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। যেমন চীনের প্রাচীর বরাবর হাঁটার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পেরুর মাচুপিচু পর্বত নিজের মতো করে আবিষ্কার করা যাচ্ছে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ বসার ঘর থেকেই মঙ্গলগ্রহে টহল দিতে পারছেন। গোটা বিশ্বের দুই হাজার পাঁচ শ মিউজিয়াম নিজস্ব ভার্চুয়াল দরজা খুলে দিয়েছে।

করোনার কারণে অনেক শপিংমল বন্ধ থাকলেও কেনাকাটা বন্ধ নেই। বরং অনলাইনে কেনাকাটার হার আরও বেড়ে গেছে। অনেকেই লাইভে এসে শাড়ি-গয়নাসহ নানা পণ্য বিক্রি করছেন।

বিজ্ঞাপন

শিল্প-সাহিত্যের লোকজনও বসে নেই। তারা ভার্চুয়াল আড্ডায় যোগ দিচ্ছেন। লাইভ অনুষ্ঠান করছে। আবৃত্তি অনুষ্ঠান করছে। গান, নৃত্যসহ শিল্পকলার প্রতিটি কর্মই এখন ভার্চ্যুয়ালে সম্পাদিত হচ্ছে। উৎসব হচ্ছে, সম্মেলন হচ্ছে। বইমেলাও হচ্ছে ভার্চ্যুয়াল।

অনলাইন তথা ভার্চুয়ালের ব্যাপক চর্চার কারণে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন সাত সমুদ্র তেরো নদীর দূরত্বকেও আর কোনো দূরত্বই মনে হয় না! যেন একই কক্ষে পাশাপাশি বসে আলাপচারিতা।

অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, করোনা সংকট শেষ হওয়ার পরেও ভার্চুয়ালের এই প্রবণতা চালু থাকবে। ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছুই ভার্চ্যুয়াল উপায়ে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। এতে আর কিছু না হোক, অন্তত জলবায়ুর ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে।

মন্তব্য পড়ুন 0