default-image

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নাম। এ মহামারি স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনকেও দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। মৃত্যুভীতি, অতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচেতনতা, সঙ্গনিরোধ, মাস্ক ব্যবহার প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত ও সামাজিক অনুষঙ্গ হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোতেও।

শরীরের রোগ, অসুখ সব সময়ই মনের ওপর প্রভাব ফেলে। আর সে অসুখ যদি মহামারির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তবে তাতে শুধু অসুস্থ হয়ে পড়া ছাড়াও স্বাভাবিকভাবেই নানা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি ধীরে ধীরে আমাদের পুরো সত্তা ও কর্মকাণ্ডকে দখল করেছে, যা অস্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলোয় করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে আলোচনা, ভিডিও, খবর ইত্যাদি আমাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করে চলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই উদ্বেগ ও ভীতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। সংক্রামক এই ভাইরাস নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তার কারণে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাতেও আসছে পরিবর্তন।

লকডাউন জারি হওয়ায় দাপ্তরিক কাজগুলো প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এর সুফল ও কুফল দুটোই বিদ্যমান। একদিকে প্রযুক্তিজ্ঞান যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে সামাজিক অবরোধের কারণে মানুষ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতির দরুন বেকার সংখ্যা বেড়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার প্রাদুর্ভাব দূর হলেও মানুষের মধ্যে এ অভ্যস্ততা থেকে যাওয়ার প্রকট সম্ভাবনা রয়েছে। পারিবারিক কিছু সম্পর্ক সঙ্গলাভের কারণে মজবুত হলেও কিছু সম্পর্কে ভাঙন অথবা সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাসের কারণে একে অন্যের সঙ্গে বিরোধেও জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেকেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। মৃত্যুজনিত নিয়ন্ত্রণহীন বিচ্ছিন্নতা শোকাবহ করে তুলেছে বহু পরিবারকে। সম্পর্কগুলোর মৌলিক এ পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন
default-image

এ পরিবর্তনে পরস্পরের মধ্যে চিন্তা-চেতনার ঐক্য খুব কমই দেখা যাচ্ছে। সব বয়সের মানুষ যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ব্যতীত জীবন এখন অকল্পনীয়। এ ক্ষেত্রে যন্ত্রমুখী ও জীবনমুখী সমাবর্তনের এ যুগে এ দুটি প্রত্যয়কে সমন্বয় করতে সচেষ্ট হতে হবে। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে মানসিক চাপ কমাতে সচেষ্ট হতে হবে। করোনাকালে ঘরে থাকাকে ‘বন্দিত্ব’ না ভেবে উপভোগ করতে হবে। নিজের জন্য সময় বের করে আত্মবিশ্লেষণ করা একটি আত্মোন্নয়ন প্রক্রিয়া। নিজের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে। একঘেয়েমি এড়াতে ও কাজে বৈচিত্র্য বজায় রাখতে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। সফলতার পূর্বশর্ত হচ্ছে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত কাজটি করা। করণীয় কাজগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে ক্রমানুসারে সম্পন্ন করতে পারলে দক্ষতা রপ্ত হবে।

সৃজনশীলতা একটি অন্যতম মৌলিক গুণ। সততা, দায়িত্বশীলতা, প্রতিশ্রুতিশীলতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। নিজের কাছে সততাই আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উৎস। সৎ মানুষ সহজেই মানুষের বিশ্বাস ও সম্মান অর্জন করতে পারে। মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণই সহানুভূতি লাভের পথ তৈরি করে। প্রত্যেক মানুষেরই চিন্তায় ভিন্নতা বিদ্যমান। স্বীয় চিন্তার সঙ্গে অন্যের চিন্তা সামঞ্জস্য না হলে, তা মেনে নিয়ে দ্বন্দ্বরোধ করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।

আত্মবিশ্বাস হলো সকল অর্জনের চাবিকাঠি। আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট বলেছেন, ‘সততা, সম্মান, নৈতিক বাধ্যবাধকতার পবিত্র দায়িত্ব, বিশ্বস্ততা ও নিঃস্বার্থ কাজই আত্মবিশ্বাসকে পুষ্টি দেয়। এগুলো ছাড়া এটি থাকে না।’

আত্মবিশ্বাস অর্থ নিজেকে চেনা, নিজের সৃজনশীলতার ওপর আস্থা রাখা, হীনম্মন্যতা দূর করে দৈনন্দিন ও প্রাত্যহিক জীবনে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করা। জীবনের ভালো সময়গুলো পরিবার ও বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গে অতিবাহিত করা ও কঠিন সময়গুলোতে পরিবার ও বন্ধুদের পরামর্শ নিয়ে নিজের জন্য স্থান তৈরি করতে হবে। নিজের মেধা দিয়ে অন্যের উপকার করা উচিত। কাজের ফাঁকে কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে থাকা, হাঁটাহাঁটি অথবা যোগ ব্যায়াম করলে কাজের প্রতি মনোযোগ আসবে। দপ্তরে বা বাড়িতে যেকোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়ে মেধা ও যোগ্যতাবলে তার মোকাবিলা করাই জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার উত্তম পন্থা। সমস্যা এড়িয়ে চলার অর্থ এর দ্বারা বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার শঙ্কাকে প্রশ্রয় দেওয়া।

ভুল মানুষের হতেই পারে। ভুল করা সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধীর উদ্ধৃতি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘অন্য মরণশীল সঙ্গীদের মতোই আমি এমন একজন ব্যক্তি, যার ভুল হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আমার এতটুকু মানবিকতা রয়েছে যে, আমি ভুল স্বীকার করে পরের পদক্ষেপটি তার প্রেক্ষাপটে শুধরে নিতে পারি।’

মহাত্মা গান্ধীর মতোই সর্বত্র নিজের ভুলগুলো শুধরে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে, যেন অতীতের ভুলগুলোর আর পুনরাবৃত্তি না হয়।

জীবনের পথচলায় নতুন অভিজ্ঞতা দক্ষতাকে বিকশিত করে, দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়। যেকোনো কাজকে ভালোবেসে তা উপভোগ করতে হবে। এক শ্রেণির মানুষ আছে, যাদের পরনিন্দা করে আত্মতৃপ্তি পাওয়াটা স্বভাব। এরা নিজেকে লোকসমাজে একজন ভালো মানুষ হিসেবে জাহির করে। এটা তাদের মজ্জাগত স্বভাব বললে অত্যুক্তি হবে না। এটি সমাজবিধ্বংসী একটি ব্যাধি। হীনম্মন্যতায় ভুগে অথবা স্বীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে বহু মানুষ এ মানসিক রোগে আক্রান্ত। এদের এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। পরচর্চা, গুজবে নিজেকে জড়িয়ে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করা উচিত নয়।

করোনাকালে আমরা এক নতুন উপলব্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এ উপলব্ধির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে সঙ্গতিপূর্ণ উপায়ে এ বিপৎকাল কাটিয়ে ওঠাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমাদের গ্রহণ করা উচিত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0