একটি ভ্যাকসিনের অপেক্ষা

বিজ্ঞাপন
default-image

সারা বিশ্ব আজ উন্মুখ হয়ে আছে বিজ্ঞানীদের দিকে। কখন দেখা যাবে একটি সফল গবেষণার ফলাফল? কখন শোনা যাবে—‘আর ভয় নেই, আমরা করোনাকে জয় করেছি, ভ্যাকসিন এসে গেছে। শিগগিরই পৌঁছে যাবে আপনার নিকটস্থ হাসপাতালে!’ আসলে এই একটি ভ্যাকসিনের জন্য বিশ্ববাসীর এই যে অধীর অপেক্ষা, তার কারণ কিন্তু শুধু ‘মৃত্যুভয়’ নয়, বরং নিকট অতীতে একটি ‘যাপিত সাধারণ জীবন’ ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আমরা সবাই চাই ‘ভরে থাকুক আমার মুঠো’। কিন্তু সব সময় সবকিছু কি আর মুঠোয় ভরে রাখা যায়? এই ভ্যাকসিনের ব্যাপারটিও সে রকম। আমরা ভাবছি, এই বুঝি ভ্যাকসিন এল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা, আমাদের আশা ও কল্পনার জগৎ থেকে অনেকটাই দূরে।

একটি ভ্যাকসিন সহজলভ্য করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত, গবেষণা ও পলিসি লেভেলে যে ধাপগুলো পার হতে হয়, তাতে কমপক্ষে ২০ বছর সময় লেগে যায়। ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের ভ্যাকসিন রিসার্চ সেন্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর বার্নি গ্রাহাম বলেন, ‘আমি ২০ বছরের নিচে কোনো ভ্যাকসিন বের করতে দেখিনি। হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের জন্য ২৬ বছর, রোটাভাইরাসের জন্য ২৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমরা নবজাতকের ইনফেকশাস ডিজিজের জন্য দায়ী রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাসের ভ্যাকসিন বের করার জন্য ৫০ বছর ধরে চেষ্টা করছি...। যদিও গ্রাহামের গ্রুপটি দ্রুত ভ্যাকসিন বের করার জন্য ২০১৩ সালে আরও ভালো অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করেছে, তবুও এটি এখনো টেস্টিং পর্যায়েই রয়ে গেছে। করোনা ভ্যাকসিনের জন্য যদি বেশ কিছু ধাপ বাদ দিয়ে দ্রুত সমাধানের চেষ্টাও করা হয়, তবু ভ্যাকসিনটি কার্যকর করতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। যত তাড়াতাড়ি আমরা এই কঠিন বাস্তবতা মেনে নেব, তত আপনার, আমার, বিশ্ববাসীর জন্য মঙ্গলজনক।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

কেন এত সময় লাগবে একটি ভ্যাকসিন আমাদের হাতে আসতে?

একটি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর সরকারের নীতি নির্ধারকদের কাছে প্রমাণ করতে হয়, ভ্যাকসিনটি ‘কার্যকর’ ও ‘নিরাপদ’! সে জন্যই এতকাল ক্ষেপণ। অন্যান্য মেডিসিন আবিষ্কারের মতো ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পরও প্রথমে অন্য প্রাণীর ওপরে পরীক্ষা চালানো হয়, তারপর তিনটি পর্যায়ে মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা হয়। প্রথমত, কতটুকু পরিমাণে ভ্যাকসিন দেওয়া প্রয়োজন তা নির্ধারণ করতে একদল সুস্বাস্থ্যের অধিকারী স্বেচ্ছাসেবীর ওপর প্রয়োগ করে একটি প্রাথমিক ধারণা লাভ করা হয়।

দ্বিতীয়ত, ভ্যাকসিনের সঠিক ডোজ আর সেফটি নিশ্চিত করতে অপেক্ষাকৃত বড় দলে প্রয়োগ করে দেখা হয়। এতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়। সবকিছু যদি ঠিকঠাক মতো চলে, তখন একটি অনেক বড় গ্রুপ ও একটি নিয়ন্ত্রিত গ্রুপে টেস্ট করা হয়। এই দ্বিতীয় পর্যায়টিতেই গবেষকেরা ভ্যাকসিনটির ডোজ ও সেফটি নিশ্চিত করেন বিধায় বড় দলটিকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় এবং কন্ট্রোল্ড গ্রুপটিতে ভ্যাকসিন না দিয়ে তুলনা করে দেখা হয়, সত্যি সত্যিই এটি ভাইরাস রোধ করতে সক্ষম হচ্ছে কিনা।

তৃতীয়ত, ভ্যাকসিন নির্ধারণের এটিই সবচেয়ে সময় সাপেক্ষ ধাপ। এ পর্যায়ে গবেষকদের অপেক্ষা করতে হয় ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা স্বাভাবিকভাবে ভাইরাসটিতে এক্সপোজ্ড হচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তৃতি এই ধাপটির জন্য ‘শাপে বর’ হলে হতেও পারে! আমরা অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ভ্যাকসিন পেয়ে যেতেও পারি। তবে অতীতের বিভিন্ন ভ্যাকসিন গবেষণার সময়কালের ইতিহাস হতাশাব্যঞ্জকই বটে। ভ্যাকসিন বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াটিও সময় সাপেক্ষ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলো ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত না হলে বড় ধরনের বিনিয়োগে যেতে চায় না। সুতরাং এ পর্যায়েও বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্কের লজিস্টিক এক্সপার্ট ব্রুস লি’র মতে, একটি ভ্যাকসিনকে ম্যাজিকের মতো দ্রুত, মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। এখানে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনের একটা প্রক্রিয়া কাজ করে। উৎপাদনকারী থেকে ভ্যাকসিনেশন সাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশ কিছু ধাপ পেরোতেই হয়।

তবে আশার কথা, ‘সার্স’ ও ‘মার্স’ ভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে ২০০৩ ও ২০১২ সাল থেকে গবেষণার কারণে বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই এই কোভিড–১৯ টাইপের ভাইরাসের জন্য কী ধরনের ভ্যাকসিন প্রয়োজন, তা আগে থেকেই কিছুটা জানতে পেরেছিল। তাই অতি দ্রুত তারা কোভিড–১৯–এর ভ্যাকসিন টেস্টিংয়ের কাজটি এগিয়ে নিতে পেরেছে। ১০০ জনের ওপর ভ্যাকসিন ক্যানডিডেটের কাজ ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত। মার্কিন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এ বছরের শেষ নাগাদ তারা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেতে পারবে বলে ধারণা করছে। কিন্তু গ্রাহামের মতে, ৯০ শতাংশ ভ্যাকসিন টেস্টিং এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এসেই ব্যর্থ হয়! আর অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ বলছেন, এ বছরে ভ্যাকসিন ট্রায়ালে যাওয়ার টার্গেট অতি কল্পনারই শামিল। তাদের মতে ২০২১ সালের বসন্তের আগে এ প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব নয়।

কিন্তু তত দিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঝরে যাবে বহু প্রাণ। স্টেজ ২/৩ গ্লোবাল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে এনওয়াইইউ ল্যাগুনে হেলথ সেন্টারে। জনস হপকিন্স মেডিসিন রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানীরাও নিরলস কাজ করছেন। জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ পাবলিক হেলথ রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক ড. আরতুরো ক্যাসাদিভালের নেতৃত্বে শিগগিরই দুটি বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দিয়ে একটি ভ্যাকসিন পুরো মহামারি নিয়ন্ত্রণে কোনো সমাধান হতে পারে না। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গ্লোবাল হেলথ গ্রুপের পরিচালক রিচার্ড ফিচেমের মতে, একটি ভ্যাকসিন এসে সারা বিশ্বে মহামারি সিচুয়েশন থেকে আমাদের উদ্ধার করবে, এটি নিঃসন্দেহে একটি বিপজ্জনক অনুমান।

যুক্তরাজ্য সরকারের ভ্যাকসিন টাস্কফোর্সের চেয়ার কেট বিংহামও একই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বলেছেন, ‘যে ভ্যাকসিনের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি, এটি কোনো সিলভার বুলেট নয় যে এক ঝট্কায় সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’ অতীত ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, শুধু ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় না থেকে বরং রোগের জটিলতা কমিয়ে মৃত্যুহার কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে ব্যাপারেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভ্যাকসিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মডার্না অ্যান্ড ফিজার ও তাদের পার্টনার বায়ো অ্যান্ড টেক্ মিলে বেশ বৃহৎ পরিসরে শেষ ধাপের পরীক্ষা চালিয়েছে। তারা আশাবাদী, একটি লাইফ টাইম ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারবে। অ্যাস্ট্রো জেনেকা ও ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডও যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে তাদের শেষ ধাপের পরীক্ষা শেষ করেছে। জনসন অ্যান্ড জনসন এবং নোভাভাক্স তাদের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষ করতে চলেছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু অন্যান্য স্টাডি বলছে, একটি সিঙ্গেল ট্রিটমেন্ট টোটাল ইমিউনিটি তৈরি করতে কখনোই সক্ষম নয়।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমের প্রতিবেদন বলছে, আমাদের এখন প্রয়োজন বিহেভিয়ারাল ও ড্রাগ বেসড ইন্টারভেনশনের একটি প্যাকেজ, যা জীবন বাঁচাতে ও ভবিষ্যত সংকটের জন্য আমাদের প্রস্তুত করে তুলবে।

আজ হোক, কাল হোক একটি ভ্যাকসিন হয়তো আমরা পেয়েই যাব। কিন্তু আমরা কি আবার আমাদের সেই আগের জীবন ফিরে পাব? বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা কি কাটিয়ে উঠতে পারব? বাসে, ট্রেনে স্বাভাবিক হতে পারব? যে সামাজিক দূরত্বের চর্চা আমরা করছি, এই দূরত্ব কি সহজে ঘুচবে? মহামারির এই সময়ে যে ট্রমার মধ্য দিয়ে আমরা গেছি, সেই ক্ষত কি শুকাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের আশা যেন কোনোভাবেই অতি কল্পনা প্রসূত না হয়। এই অধীর অপেক্ষা যেন হতাশায় পরিণত না হয়। আমরা যেন এখন থেকেই ভবিষ্যতের আরেকটি সংকটের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি।

কবি গুরুর ভাষায়, ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও দাও প্রাণ। তব ভুবনে, তব ভুবনে মোরে আরও আরও আরও দাও স্থান।’

লেখক: অ্যাডজাংক্ট লেকচারার,

ডিপার্টমেন্ট অফ আর্থ অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস, ইয়র্ক কলেজ/ কিউনি, নিউইয়র্ক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন