আমাদের খাবার, কেনাকাটা

আমি ঘরে সারা দিন কাজ করি। কী কাজ? এই তো ঝাড়া–মোছা। কৌটা, বাসন সাফ–সুতরো করা, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা। তারপরও নিজেকে অলস প্রকৃতির মনে হয়। আসলে আমি বিড়ালের মতো আরামপ্রিয় টাইপ মানুষ। কিন্তু বিদেশ বলে কথা। সব তো নিজেকেই করতে হয়। আমার ফলের ছবি দেখাই। সব সুন্দর করে কেটেকুটে তৈরি। বাজার থেকে পুরো আনারস অনেক দিন কিনে এনেছি, কিন্তু কাটতে গেলে হয় পাকেনি। তারপর দেখা গেল পচে গেছে। অথবা কিনে এনেছি, এটা ভালো ছিল না। যত বার কিনেছি, ততবারই পুরোটা ফেলে দিয়েছি। বলা যায়, আমার ৪/৫ ডলার মাটি। কী আর করা?

হাজার রকমের সুন্দর সুন্দর ফলের ভিড়ে চেনা ফল না খেলে কী হয়? কিছুই হয় না। কিন্তু আমাদের জিহ্বা হচ্ছেন এমন, সব সময় চেনা টেস্ট খোঁজে। মানে আমরা যার সঙ্গে পরিচিত সেটার প্রতি ইচ্ছা জাগে মনে। কারণ, অবচেতন মনে তা রেকর্ড করা। এ জন্য প্রিয়জনের হাতের খাবার আমরা খুঁজি। আমারও হয়তো সে জন্য মাঝে মধ্যে দেশি চেনা ফল খেতে ইচ্ছে হয়। যেমন বরই, আমড়া, কৎ বেল। কৎ বেল ভর্তা বাংলাদেশ থেকে প্যাক করা আসে। দেশি স্টোর থেকে আমি মাঝেমধ্যে কিনে এনে আয়েশ করে আরও মরিচ, সরিষার তেল, চিনি দিয়ে তারপর মেখে খাই।

কাঁটা ফল আমাদের এলাকায় আইডল বাস্কেট থেকে কিনে তেমন সুবিধার মনে হয়নি। ওটা মূলত মার্কিন হলেও স্প্যানিশ স্টোর। স্বজাতির মতো ওদের মধ্যেও কিছুটা ঘাপলা আছে। তবে প্রকৃত মার্কিন যেগুলো, সেগুলোর কাঁটা ফলগুলো একদম ফ্রেশ। এই আনারসের বক্স ৭ ডলার পড়েছে, মান খুব ভালো। যখন ইচ্ছে হয় এটাই কিনি। ডালিম এই প্রথম কিনলাম এবং এটারও দানা বের করা এক বিশাল কাজ। সবচেয়ে বাজে যা, তা হলো নখ কালো হয়ে যায়। আমি খুব খুশি এমন রেডি পেয়ে। এটার দাম ৫ দশমিক ৯৯ ডলার।

বিজ্ঞাপন

স্পিনাচ লিভস হলো আসলে আমাদের পালন শাক। ও হ্যাঁ, লন্ডনে স্পিনাচকে বলে স্প্যানিশ পাতা। আমি তো শুনে হাসতে হাসতে শেষ। আমার মেয়ে বলে ব্রিটিশ উচ্চারণের জন্য। পরিষ্কার করা থাকে, বক্স কিনি। মার্কিনরা সালাদে কাচা পাতা জাবর কেটে খান, কিন্তু আমি মাঝেমধ্যে দেশের মতো শাক রান্না করি। আবার কখনো অন্য সবজির সঙ্গে শুধু সামান্য লবণ আর অলিভ ওয়েল দিয়ে হালকা সেদ্ধ করি। এরিগুলা নামে একটা পাতা আছে, যা অনেকটা আমাদের শস্যপাতার মতো। এটা স্বাদে অনেকটা লাই বা ছোট শস্য শাকের মতো। আজ আমি এটি শাকের মতো করে ওপরে ভাজি মাছ দিয়েছি। খেতে অনেকটা লাই পাতার ভর্তার মতো হয়েছে।

রেড স্লিপার মাছ। আমেরিকান দোকান থেকে মাছ কিনি। কিন্তু বিদেশি মাছ সাধারণত সব চিনি না বলে যেকোনোটিই কিনি না। অনেক রকম মাছ পাওয়া যায়। স্যামন নেই বেশি। আজ এটির সঙ্গে রেড স্লিপার নিলাম। এটারও অনেক দাম। একটা ফিলেট ট্যাক্সসহ ১৩ ডলারের বেশি পড়েছে। খেতে স্যামন স্বাদ বা দেশে ও ভারতে সমুদ্র তীরে যেসব মাছ ভাজা পাওয়া যায়, অনেকটা সে রকম স্বাদ। হয়তো একই প্রজাতি। আজ স্যামনও কিনলাম এবং এটারও ১৩ ডলার দাম অথচ এই পিছগুলো আমি ১০/১১ ডলারে কিনেছি। দিন দিন দাম বাড়ছে। বিদেশি চাষের মাছেরও দাম কম।

ফ্রেশ টুনা দেখতে খুব সুন্দর। গোলাপি রং। খুব ছোট পিছ নেয় ১০ ডলার। ছটাক বা গ্রামে ওজন হবে। কিন্তু এ ছোট টুকরো শেষ হয় না, কারণ মেয়ে টুনা মাছের ফ্রেশ যেটা কিনি সেটা খেতে চায় না। আমি জানি না, কেন? রান্নার পর দেখেছি ফ্রেশ টুনা কেমন জানি গরুর গোশতের মতো শক্ত হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে আমি তাকে আবার টিনের তেলে ডোবা টুনার মতো নরম করে, ভাজি করে দিই। তবেই পয়সা হালাল হয়। আমারও এসব মাছ বেশি খেতে ইচ্ছে করে না। সব যায় বিড়ালের পেটে।

পাখির মতো এ বাড়ির আশপাশে বিড়াল কিছু আছে, যারা আমাকে দেখলে পরম মমতায় দৌড়ে আসে। দেশি মাছ বলে দেশি স্টোরে যা বিক্রি হয়, তা আসলে চাষের মাছ। কিন্তু ইলিশ খুব ভালো পাওয়া যায়। যদিও স্বাদে তারতম্য হয়। লোভী হয়ে কিনে নিয়ে আসি, কিন্তু সেটিও যায় বিড়ালের পেটে। আমার ঘরে অনেক কই মাছ, আবার দেশি ছোট মাছের কিছু বক্স আছে। কই পছন্দ। যত্ন করে রান্না করি। মসলা খেতে ভালো লাগে, তবে ভেতরটা মাটি মাটি।

default-image

আমি নিজে না খেলেও গোশত আইটেম মেয়ের জন্য নিয়মিত রান্না করি। মাঝেমধ্যে একটু খাই। যদিও সম্পূর্ণ ভেজিটারিয়ান হওয়ার মন্ত্র বহুবার গ্রহণ করেও অব্যাহত রাখতে পারিনি।

মাংস প্রসঙ্গ যখন আসল তখন আরেকটা কথা বলি। যুক্তরাষ্ট্রের স্টোরে অতীব সুন্দর করে রাখা। আপনি কোনো বাজে গন্ধ পাবেন না। দেখলেই কিনতে ইচ্ছে হবে। তবে হালাল–হারামের বিচারে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। এদের স্টোরে বরফ পড়ে আপনার হাতে ফ্রস্টবাইট মানে বরফের কামড়ে লাল দাগ পড়ে যাবে। আর দেশি স্টোরে তীব্র গরমেও রুম ঠান্ডা থাকে না। মাছ মাংসের গন্ধ ছড়ায়। তারপরও হালাল বলে আমরা পচা হলেও তাই হজম করি। খুঁতখুঁতে স্বভাব, তাই আমি আর্চার থেকে লাইভ চিকেন এক সঙ্গে দশটা নিয়ে আসি। মেয়ের বেশ কয়েক দিন চলে যায়। তবুও মাঝেমধ্যে তো যেতে হয় দেশি দোকানগুলোতে।

শুধু আমার বাচ্চা কেন, সব বাচ্চারা বাইরের খাবার পছন্দ করে। আমি মাঝেমধ্যে কিনি। ওই খানে প্রিমিয়াম, সাগর, ঘরোয়া, শামি কাবাব নামে অনেক রেস্টুরেন্ট, বলতে পারেন এক কথায় বাঙালি পাড়া। সাগর দেশি থেকে মোরগ পোলাও, আর কাচ্চি নিলাম। সঙ্গে শামি কাবাব ও বোরহানি বেশ একটা দেশি ভাব থাকে। ডিম ভুনা সুন্দর করে রাখা। দাম জিজ্ঞেস করলে বলল, গোটা ২ ডলার অথচ আড়াই তিন ডলারে মনে হয় ডজন মিলে। আমি অর্গানিকটা কিনি ৪-৫ ডলারের মধ্যে, তাই সঠিক দাম জানি না। তাই ডিম নিলাম না।

বিজ্ঞাপন

সাগর থেকে বেরিয়ে প্রিমিয়াম থেকে রান্না করা সবজি আর কেক নেব ভাবলাম। এদের আবার তরকারি খুব স্বাদ হয়। ঢোকার সময় কানে এল আর কী! অন্য দোকান থেকে বের হয়ে এক বাঙালি ভাই পুরো জাতিকে উদ্ধার করছেন। সঙ্গে সম্ভবত স্ত্রী। আমি অনেক কষ্ট হাসি চাপলাম। তবে তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের হলো, ‘আমল যায় না মরলে, খাইসলত যায় না ধুইলে’ জাতীয় অবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে কী হবে?

একটা উদাহরণ দিই, প্রিমিয়ামেও দেখি সব তরকারির সঙ্গে ডিম ভুনা রাখা। দাম জিজ্ঞেস করলে বলে ১ টা ১ ডলার। এখন বোঝেন অবস্থা, পাশাপাশি দুই দোকানে দামের তারতম্য ১ ডলার।

কাঁটা সবজির ফিরিস্তি দিতে গিয়ে অনেক কিছুই লেখা হয়ে গেল। যদিও খাবারদাবারের বাঙালি যজ্ঞ মানেই অনেক বিশাল কিছু। সব কী আর লেখা হয়? দেশের সঙ্গে বিদেশের তুলনা হয় না, কিন্তু দেশি দোকানের হয়। না চাইলেও ব্যবধান চোখে পড়ে, যদিও আমার লেখার মূল বিষয় সেটি নয়। সেটা লেখা শুরু করলে হয়তো আমরা নিজেরাই লজ্জায় মুখ লুকাতে পারব না।

মন্তব্য পড়ুন 0