যুক্তরাষ্ট্র
কৃষ্ণাঙ্গরা কি হয়ে উঠবেন ফল নির্ধারক
যুক্তরাষ্ট্র এখনো শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর দেশ। বহু জাতি–গোষ্ঠী, বহু বর্ণের দেশ হিসেবে দেশটিকে চিহ্নিত করা হলেও দেশের রাজনীতিতে এখনো শ্বেতাঙ্গদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য। তবে সমাজজীবনে কৃষ্ণাঙ্গদের জনপ্রবাহ গুরুত্বে সঙ্গে বিবেচিত হয়। অবশ্য নির্বাচনের মাঠে এককভাবে কৃষ্ণাঙ্গরা ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অবস্থায় না থাকলেও বিভিন্ন রাজ্যে তাদের ভোট অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীর জয়–পরাজয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই নির্বাচন আসলেই এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ে হিসাব করতে হয়।
২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট যোগ্য ভোটারের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থান মাত্র ১৩ শতাংশ। মোট যোগ্য ভোটারদের ৬৭ শতাংশই শ্বেতাঙ্গ। ২০১৮ সালের নির্বাচনী তথ্য থেকে জানা গেছে। গত দুই বছরে এই পরিসংখ্যানের বড় কোন পরিবর্তন নেই।
তবে সম্প্রতি শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের সংখ্যা কমছে। কমার হার কোন কোন এলাকায় আশঙ্কাজনক। এরপরও কৃষ্ণাঙ্গ বা অন্য কোন জাতিগোষ্ঠী এককভাবে পুরো দেশের রাজনীতি পাল্টে দেওয়ার অবস্থায় নেই। শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা কমছে। আমেরিকায় হিসপানিকদের ব্যাপক অভিবাসন ঘটছে।
২০১৮ সাল থেকে এবারের নির্বাচনে তালিকাভুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সংখ্যা কিছু বেশি হলেও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কোন পর্যায়ে থাকবে, এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত দশটি রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপক বসবাস। ওসব রাজ্যের নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও ভোট দিলে নির্বাচনের ফলাফল পাল্টাতে পারে। পাল্টে দিতে পারে ইলেকটোরাল কলেজের হিসাবকেও।
কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এখন মিশ্র গাত্রবর্ণের সন্বিবেশ ঘটেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য মতে, আমেরিকার ১০ জন কৃষ্ণাঙ্গদের ছয়জনই মিশ্র কৃষ্ণাঙ্গ। এর অর্থ হচ্ছে, নিজেরা কৃষ্ণাঙ্গ বলে পরিচয় দিলেও তাদের জন্ম হয়েছে অন্য কোন বর্ণের মিশ্রণে। বাবা–মা দুজনই এ ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ নন। এর উজ্জ্বল উদাহরণ এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস। নিজেকে কৃষ্ণাঙ্গ বলে পরিচয় দিলেও তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয় মিশ্রণের মার্কিন। মিশ্র বর্ণের এসব কৃষ্ণাঙ্গের অনেককেই পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান নিতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি রাজ্যেই কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপক বসবাস। এদের ৬০ শতাংশই বাস করেন নিউইয়র্ক, নর্থ ক্যারোলাইনা, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, ইলিনয়, ম্যারিল্যান্ড, মিশিগান ও লুইজিয়ানাতে।
সম্প্রতি উইসকনসিনের মতো রাজ্যও কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপক স্থানান্তর ঘটেছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা এবং জর্জিয়া রাজ্যের প্রতিটিতে ২০ লাখের বেশি করে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বসবাস। এসব রাজ্যে এই জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নির্বাচনী মাঠকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভোটদানে বিমুখ কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার হার ভালো নয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রথম দফা নির্বাচনের সময় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের যেমন উপস্থিতি ছিল, পরে তা দেখা যায়নি। ‘সুইং স্টেট’ হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনায় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ব্যাপক ভোটদান এবারের নির্বাচনে প্রার্থীর জয়–পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ডেমোক্র্যাট দলের অবস্থান শক্ত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নানা মতে বিভক্ত হয়ে পড়া ডেমোক্র্যাটদের প্রতি কৃষ্ণাঙ্গদের পূর্ণ আস্থা নেই। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প মাত্র আট শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ ভোট পেয়েছিলেন। ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে ৮৯ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ ভোট পেয়েছিলেন।
২০০৮ ও ২০১২ সালের নির্বাচনে বারাক ওবামা ৯০ শতাংশের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ ভোট পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের হিসাব মতে, ৬৫ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ ভোট প্রদান করেছে। ২০১৬ সালে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটদানের হার নেমে আসে ৬০ শতাংশে।
কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ভোট না প্রদানের কারণে ২০১৭ সালে নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে মূল্য দিতে হয়েছে। উইসকনসিন, মিশিগান ও পেনসিলভানিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের এককাট্টা সমর্থন ২০১৬ সালের নির্বাচনকে পাল্টে দিতে পারত। কথাটি এবারের নির্বাচনের জন্যও সত্যি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ফ্লোরিডা, পেনসিলভানিয়া ও মিশিগানে ভোটারদের ১০ শতাংশের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ। ক্যারোলাইনার রাজ্য দুটিতে ২০ শতাংশ ও জর্জিয়ায় ৩০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার, যারা ওই সব রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফলকে পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আসছে নির্বাচনে এসব ভোটারের কত অংশ ভোট দেবে, এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের বিরক্তি ও অসন্তোষ রয়েছে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জো বাইডেনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গরা উদ্দীপ্ত, এমন কোন প্রমাণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
২৫ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত আড়াই হাজার বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। এতে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার আওয়াজ উঠেছে। মিনিয়াপোলিসে পুলিশের হাতে হত্যার শিকার জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলন একপর্যায়ে আর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে থাকেনি। অগ্রসর উদারনৈতিক নানা বর্ণের মানুষ সমাবেশে যোগ দিয়েছে।
ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী কমলা হ্যারিস কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে একটা যোগসূত্র হিসেবে কাজ করছেন। তবুও বলা যায়, বারাক ওবামাকে নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা ছিল—তা দেখা যাচ্ছে না। ডেমোক্র্যাটদের প্রাইমারিতে বার্নি স্যান্ডার্সের পক্ষে কৃষ্ণাঙ্গ যুব তরুণদের উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল। বার্নি নিজেও এখন মাঠে নেমেছেন। কমলা ও বার্নি স্যান্ডার্স ব্যাপকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের নিয়ে সভা সমাবেশ করছেন। জো বাইডেনের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের অনুপ্রাণিত করতে তাঁরা নানা প্রয়াস নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর মতো এবারের নির্বাচনও শেষ পর্যন্ত কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের মধ্যে চলে গেছে। নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়ার মতো রাজ্যে যেখানে প্রতিটি রাজ্যে ২০ লাখের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার, সেসব এলাকায় নির্বাচনী কোন উত্তাপই নেই। ঐতিহাসিকভাবে এসব রাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জয় প্রায় অবধারিত। তাই মিশিগান, ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোলাইনাসহ অন্যান্য সুইং স্টেটে কৃষ্ণাঙ্গদের উদ্দীপ্ত করার মরিয়া চেষ্টা চলছে। এই জনগোষ্ঠীকে ভোটকেন্দ্রে নিতে পারলে নির্বাচনে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি সুযোগ পাবে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী।
Also Read
-
সংক্রমণের ৮০ শতাংশই ভারতীয় ধরন, অজানা একটি ধরনও শনাক্ত
-
বাজেটে একধরনের ‘ভাঁওতাবাজি’ করা হয়েছে: মির্জা ফখরুল
-
আপনার জন্য যা থাকছে
-
অর্থমন্ত্রী কত নম্বর পেলেন?
-
আমরা কেবল দুর্নীতিবাজ নই, আমরা অদক্ষও