default-image

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল ঋতুর। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিতেই সকালের মিষ্টি রোদ এসে সোজা ঢুকে পড়ল ঘরের ভিতর। মনে হচ্ছিল সূর্যটা যেন ঋতুর ঘুম ভাঙারই অপেক্ষা করছিল। লম্বা করে একটা নিশ্বাস নিয়ে ঋতু বলল, ‘তাহলে আমি সত্যিই এসে গেছি?’
গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে ঋতু বেরিয়ে পড়ে তার অতি পরিচিত সেই পথে, যে পথে হাঁটতে হাঁটতে সে বড় হয়েছে। উপরে স্বচ্ছ নীল আকাশ। আর নিচে চা গাছের সবুজ গালিচা। পাহাড়ি লাল মাটির আঁকাবাঁকা সরু পথ চলে গেছে বহু দূরে। এক পাশে লেবু, অন্য পাশে আনরস বাগান। কিছু দূরে বিস্তৃত কমলার বাগান। অপরুপ দৃশ্য! উঁচু-নিচু টিলাগুলো যেন উঁকি দিয়ে দেখছে সেই সৌন্দর্য। যেদিকে চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। ঝর্ণার কলকল শব্দ, নগ্ন পায়ে ঋতু ছুটছে তো ছুটছেই। এ যে তার অতি পরিচিত পথ। আজ তাকে কেউ আর আটকাতে পারবে না। কেউ না..!
এক দিন এই চা বাগানেই ছিল ঋতুর রাজত্ব। হড়বড়িয়ে কথা বলা চঞ্চল বালিকা ঋতু আজ অনেকটাই শান্ত সুবোধ। পাহাড়ি উঁচু–নিচু এলাকায় জন্ম নেওয়া মেয়েটি ছিল সহজ সরল। কিন্তু জীবনের উঁচু–নিচু পথ তাকে কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে বহুবার।
একবার ঋতুর বাবার বন্ধুর ছেলে সৌমিক কিছুদিনের জন্য এসেছিল এই চা বাগানে। প্রকৃতির প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে ঋতুর প্রেমেও পড়ে যায় সে। ঋতুও তাকে মনে মনে পছন্দ করত। কিন্তু সেই প্রেম অপ্রকাশিত থেকে যায়। চা বাগানের সতেজ পাতার সঙ্গে ঋতুর ভালোবাসা মাখা অসাধারণ এক কাপ চা সৌমিকের মনে দোলা দিয়েছিল। তাই হয়তো ঋতুর নাম দিয়েছিল চায়ের দেশের মেয়ে।
সৌমিক বলল, ‘এই যে চায়ের দেশের মেয়ে, সব সময় কি এত নিস্তব্ধতা ভালো লাগে আপনার?’
–আমার যে সন্ধ্যা হলেই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ও ঘিরে আসা নিস্তব্ধতা ছাড়া ভালো লাগে না। কোলাহলের মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পাই না।
প্রায়ই ঋতুর কাছে বেনামি চিঠি আসত। চিঠিতে শুধু লেখা থাকত, ‘ভালোবাসি তোমায় ওগো চায়ের দেশের মেয়ে।’ ঋতু বুঝত এটা সৌমিকের কাজ। কিন্তু কখনো বুঝতে দেয়নি তাকে।
হঠাৎ এক বিলেতি সাহেব এসেছিল এই দেশে পাত্রী খুঁজতে এবং পেয়েও গেলেন সুশ্রী বুদ্ধিমতী পাত্রী ঋতুকে। ঋতুর তখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি। সবেমাত্র এইচএসসি পাস করেছে। ঋতুর বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘এমন পাত্র কয়জনের ভাগ্যে জোটে!’
ছেলে বিলেতে ব্যবসা করে, আর তাদের পরিবারে সবাই ওখানেই থাকে। ঋতু কৌতূহলবসত জিজ্ঞেস করেছিল মাকে, ‘আচ্ছা মা ওদের পরিবারের সবাই যদি ওখানেই থাকে, তাহলে ও এই দেশে বিয়ে করতে এসেছে কেন? ওখানে কি পাত্রী ছিল না বিলেতি বাবুর জন্য?’ তখন ঋতুর মা গর্বে নাক ফুলিয়ে বলেছিলেন, ‘বুঝলিরে মা দেশপ্রেম! নিজের দেশের মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেতে চায়।’
আসলে দেশ প্রেম ছিল না। নরম কাদামাটিকে খুব সহজেই নিজের ইচ্ছেমতো আকার দেওয়া যায়। সেই আকাঙ্ক্ষায় বিয়ে করেছিল ঋতুকে। কিন্তু লোকটি বুঝতে পারেনি পাহাড়ি লাল মাটি অনেক শক্ত হয়। সহজে যেমন–তেমন আকার দেওয়া যায় না। কমবয়সী সুন্দরী বউকে লগ্নি করতে চেয়েছিলেন ব্যবসায়। ঋতুর অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাভির নিচে স্বচ্ছ মসলিন শাড়ি পরিয়ে শরীরের ভাঁজ দেখিয়ে ঋতুকে পেশ করেছিলেন বিজনেস বলরুমে। যে মেয়েটি চায়ের ঘ্রাণ নাকে নিয়ে বড় হয়েছে, তার হাতে রঙিন নেশার পানি তুলে দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন শেয়ালের খাঁচায়। আলো–আঁধারির ভেতর টুংটাং কাচের শব্দ পতিদেব মুখের ভেতর জোর করে পুরে দিয়েছিল জঘন্য সেই পানীয়। ঋতুর পেটের ভেতরটা গুলিয়ে আসছিল। বমি করেছিল খুব। তারপর কিছু আর মনে নেই ঋতুর।
চোখ খুলে দেখল জানালার পর্দাটা সরানো। বাইরে বরফের স্তূপ। অথচ ঘরের ভেতর একদম স্বাভাবিক তাপমাত্রা। তার স্বামী চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছে। সামনে কফির মগে ধোঁয়া উড়ছে। কফির মগটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিয়েই ঋতুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গুড মর্নিং বেবি, আর ইউ ওকে?’ কাছে এসে ঋতুর হাতটা ধরে বললেন, ‘আমাকে তো ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে গত রাতে। তুমি এতটা নাজুক, আমি তো ভাবতেই পারিনি। আচ্ছা তোমাকে এক মগ কফি বানিয়ে দিই?’
ঋতু বলল, ‘না, আমি চা খাব।’ শরীরটা ভীষণ ব্যথা করছে ঋতুর। বাথরুমে গিয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই ভয়ে আঁতকে উঠল ঋতু। চোখের নিচটা ফোলা ফোলা ঠোঁটের এবং চিবুকের কাছে কেমন রক্ত জমাট বেঁধে লাল হয়ে আছে। চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকে ঋতু কিন্তু কিছুতেই সেই রক্তের জমাট ভাঙে না। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকে দেখে টেবিলে রাখা সাদা মগে চায়ের ধোঁয়া উড়ছে। ঋতুর স্বামী টাইয়ের নট বাঁধতে বাঁধতে বললেন, ‘অর্গানিক টি খেয়ে দেখো, শরীর একদম ঝরঝরে হয়ে যাবে। আমি অফিসে যাচ্ছি। রাতে আবার ডিনার পর্টি আছে। রেডি থাকবে কিন্তু। টেক কেয়ার মাই লাভ।’ বলেই বের হয়ে গেলেন তার বর।
ঋতু চোখ বন্ধ করে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে তার মন চলে যায় জন্মস্থান সেই চায়ের দেশ সিলেটে। একবার ট্রেনে করে ঢাকা থেকে সিলেটে যাওয়ার সময় ঋতু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ট্রেন শ্রীমঙ্গলের কাছে আসতেই ঘুম ভেঙে যায়। জিজ্ঞেস করে বাবাকে, ‘আমরা কি শ্রীমঙ্গলের কাছে চলে এসেছি?’ বাবা বলেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু তুই কী করে বুঝলি?’ ঋতু বলেছিল, ‘এক অদ্ভুত পাহাড়ি বুনো ঘ্রাণ আর চায়ের সতেজ পাতার সংমিশ্রণ আমার নাকে এসে লাগে। আমি চোখ বন্ধ করেও বলে দিতে পারি বুঝলে বাবা।’ বাবা হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘পাগলি মেয়ে আমার।’
আজ ভীষণ সৌমিকের কথা মনে পড়ছে তার। কারণ, পাহাড়ি বুনো সেই ঘ্রাণ তাকে খুব টানছে। চলে যেতে ইচ্ছে করছে পাহাড়ের অলিগলি পথ ধরে বহু দূরে খাসিয়া মণিপুরিদের সেই পানের বরজে অথবা লেবু বাগানে গিয়ে কচি লেবু পাতার ঘ্রাণ নিতে! চায়ের মগে চুমুক দিত দিতে এসব ভাবতে থাকে ঋতু। নিজের অজান্তেই বলে ওঠে, ‘আমি কেন বিলেতে এলাম? আচ্ছা সৌমিক কি আমাকে এখনো চিঠি লেখে?’
হঠাৎ ফোনের রিং বাজতে থাকে। ‘হ্যালো’, বলতেই ওপাশ থেকে এক ভদ্রমহিলার কণ্ঠ ভেসে এল, ‘যদি বাঁচতে চাও, তাহলে পালিয়ে যাও।’ ঋতু স্তম্ভিত হয়ে যায়! কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কে বলছেন? আর এসব কী বলছেন?’
–আমাকে চিনবে না তুমি। যা বলছি, তোমার ভালোর জন্য বলছি। আমি তোমার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। আমার আগেও তার আরেকটা স্ত্রী ছিল। সে একজন ভদ্র মুখোশের আড়ালে বিক্রিত রুচির মানুষ। এত দিনে নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছ? বাকিটা বুঝতে গেলে তোমার জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমি তোমার বড় বোনের মতো। তাই তোমার ভালোর জন্য বলছি।
ঋতু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে এবং কাঁদতে শুরু করে। তারপর তার সঙ্গে হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলো একে একে সব বলতে শুরু করে। তখন ভদ্রমহিলা বলেন, ‘আমি এত দিন তার সব খারাপ কাজের প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। এখন আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
–আপনি আমাকে সাহায্য করেন প্লিজ। আমি মুক্তি চাই ওর কাছ থেকে।
বহু কষ্টে মুক্তি মিলেছিল ঋতুর। কিন্তু জীবনের এই ক্ষতগুলো কি মুছে যাবে কোনো দিন? ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে ঋতু এসব ভাবছিল আর ঝর্ণার স্রোতে মনের কষ্টগুলোকে ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘এক কাপ চা হবে?’ পেছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে সৌমিক! মুচকি হেসে সৌমিক বলল, ‘ওগো চায়ের দেশের মেয়ে, আমি সারাটা জীবন আপনার হাতের চা পান করতে চাই। রাজি আছেন তো?’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0