যুদ্ধশিশু উপাখ্যান

বিশ্বের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যেকোনো জাতিকে দমন বা নির্মূল করার জন্য দুটি কর্ম একসঙ্গে করা হয়েছে, গণহত্যা এবং অপরটি ধর্ষণ। ১৯৯৩ সালে আমার কর্মস্থল ছিল ম্যানহাটনের এক রেস্টুরেন্ট। প্রতি রোববারের কাস্টমার ছিলেন মিস ক্যাথি ও তাঁর চার সন্তান। ওরিয়েন্টাল চেহারার তিন মেয়ে আর এক ছেলেকে দেখে মনে সর্বদাই প্রশ্ন জাগত, শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নারীর গর্ভের এই চার সন্তান হতেই পারে না। কিন্তু কৌতূহলটা নিয়ম মাফিক চেপে যেতাম নিরন্তর।

মেনু হাতে নিয়ে চারজনে যার যার পছন্দমতো খাবারের অর্ডার দিত। চারজনের অর্ডার করা হলে মিস ক্যাথি অর্ডার করতেন নিজের মতো। প্রতি রোববার এমনটি হতো স্বাভাবিক নিয়মে। একদিন ঘটনাচক্রে জানতে পারলাম, ওরা যুদ্ধ শিশু। মিস ক্যাথি ওদের দত্তক নিয়েছেন। ক্যাথির মহানুভবতায় মুগ্ধ হলাম। তাঁকে আপ্যায়িত করলাম এক গ্লাস হাউস ককটেল দিয়ে। মিস ক্যাথি খুবই প্রাণিত হলেন।

একাত্তরের যুদ্ধশিশু নিয়ে অনেক কথা হলো মিস ক্যাথির সঙ্গে। তিনি নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলেন। আমার মনে তোলপাড় হলো, বাংলাদেশের একাত্তর–পরবর্তী যুদ্ধশিশুদের কথা। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের অজানা দিকগুলোর কথা। প্রচণ্ড নিনাদে কাঁপুনি দিল বুকের ভেতর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি নারীদের ওপর বর্বরোচিত নির্দয়তার কাহিনি। একাত্তরে বাংলাদেশে এই ধর্ষণ ও নির্যাতন ছিল সুপরিকল্পিত। তারা বাঙালিদের ধর্ষণের মাধ্যমে চেয়েছিল এক নতুন জাতির জন্ম দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করে দিতে। যাতে বাঙালি আর কোনো দিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি এক পাকিস্তানি জেনারেল একাত্তরের ঘটনা নিয়ে আত্মকথনে লিখেছেন, একাত্তরের ১০ এপ্রিল এক সভায় জেনারেল নিয়াজি বাঙালিদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে উর্দুতে বলেন, ‘মে এ্যা হারামজাদে কো নাসাল বদল দেয়েগা, অ্যা মুজে কিয়া সমজতে হায়।’ (অর্থাৎ আমি এই হারামজাদা জাতির চেহারা বদলে দেব, তারা আমাকে কি মনে করে)।

নিয়াজীর ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের চেহারা বদলের সুযোগ লুফে নেয়। আর এর সহজ রাস্তা ছিল বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করা। প্রতিহিংসার এক অমানুষিক ছাপ তারা রেখে গিয়েছিল বাংলার ধর্ষিত নারীদের ওপর। এর সঙ্গেই যুক্ত হলো যুদ্ধশিশুর বিষয়টি। কানাডীয় ইউনিসেফের চেয়ারম্যান যুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে দুবার বাংলাদেশে আসার পর তাঁর প্রতিবেদনে ১০ হাজার যুদ্ধ শিশুর উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশ থেকে কানাডায় যুদ্ধশিশুদের দুঃসাহসিক অভিযান ও দত্তক গ্রহীতা মা–বাবার আনন্দ–বেদনা এবং কানাডায় বেড়ে ওঠা যুদ্ধশিশুদের নিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বিশ্বে অনেক অমানবিকতার কারণে অনেক জিজ্ঞাসা জাগাতে সক্ষম হচ্ছে। কাম্য ছিল একুশ শতকের বিপর্যস্ত মানুষের মনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণের আশাবাদ জাগাবে। হাজার বছরের ঘুণে ধরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাংলাদেশের সমাজে সেই অবাঞ্ছিত শিশুদের কোলে তুলে না নিলেও বেশ কিছু কানাডীয় পরিবার সেই সংকটময় মুহূর্তে এগিয়ে এসে সেই অবহেলিত শিশুদের কোলে তুলে নিয়েছিলেন।

কানাডার সংবাদপত্রগুলোতে এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যাতে কানাডার জনগণসহ বিশ্বে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং এতে বেশি বেশি মানুষ এগিয়ে আসে এসব ভাগ্যাহত শিশুদের দত্তক নিতে। সমাজকর্মী ড. নীলিমা ইব্রাহীমসহ তৎকালীন অনেক সমাজকর্মীর ভাষ্যমতে, অনেক জন্মদাত্রী মায়েরা চাননি তাদের সন্তানকে অন্যের হাতে তুলে দিতে। করেছেন কান্নাকাটি, পরে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে মায়ের অজান্তেই শিশুটিকে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন মা–বাবার হাতে।

পরে কানাডাসহ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডসসহ অনেক দেশই এগিয়ে আসে এসব শিশুর দায়িত্ব নিতে। অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হল্ট অ্যাডপসন প্রোগ্রাম এবং ইনক অ্যান্ড টেরেদেস হোমস নামক দুটি প্রতিষ্ঠানও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।

এসব শিশু বিদেশের বৃহত্তর পরিবেশে বড় হয়েছে, গড়ে তুলেছে তাদের জীবন। কিন্তু তারা জানে তাদের জন্মের ইতিহাস। তারা জানে তাদের ধর্ষিত মায়েদের করুণ কাহিনি ও তাদের অভিশপ্ত জীবনের অলিখিত ইতিহাস। সুদূর বিদেশের মাটিতে বড় হয়ে তারা নিজেদের ব্যাপারে কতটুকু সচেতন। কোনো সংস্কৃতিতে তারা আকৃষ্ট। কী তাদের আত্মপরিচয়। তারা পাকিস্তানি নাকি বাংলাদেশি? নাকি কানাডীয়? তাদের আত্মপরিচয় কীভাবে দেবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ৫০ বছর পর এই প্রথম বিশ্বজুড়ে মানুষ হয়তো জানতে পেরেছে, কানাডায় এই যুদ্ধ শিশুদের কথা এবং তাদের পোষ্য হিসেবে নেওয়ার পর কী ঘটেছে, তার কাহিনি। এ সময়ে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম মরিয়া হয়ে প্রকৃত ইতিহাস খুঁজছে, যুদ্ধ শিশুবিষয়ক যে একটা ঐতিহাসিক শূন্যতা রয়ে গেছে, এই শূন্যতা তারা পূরণ করতে চায়।

বিজ্ঞাপন

১৯৭২ সালে যারা ছিলেন শিশু, আজ তারা পরিণত বয়সে এসে খুঁজে ফিরছেন তাদের শিকড়ের সন্ধান। বারবার ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে, খুঁজে পেতে চেয়েছেন তাদের জন্মদাত্রী মা ও স্বজনদের। সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারমাধ্যমে উঠে এসেছে তাদের কথা। এমনই একজন কোহিনূর। নরওয়েতে বেড়ে উঠেছেন তার পালক বাবা–মায়ের আশ্রয়ে। আজ তিনি সে দেশের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী হিসেবে বেশ পরিচিত। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, তিনি একজন যুদ্ধ শিশু। ২০১১ সালে গিয়েছিলেন মাতৃভূমিতে। তিনি জানান, নরওয়েতে তাঁর মতো আরও শ খানেক যুদ্ধশিশু আছে। এই শিশুদের খবর কেউ জানে না। অথচ বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্ম প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ তারাও। এই দেশের মাটির প্রতিটি কণায়, বাতাসে, এই লালসবুজের পাতাকায় তারও অধিকার ছিল, সেই অধিকার কি কেড়ে নেওয়া হয়নি? কিন্তু কার অপরাধে? এই বৈষম্যের বিষফোড়া কারা জিইয়ে রেখেছে? ধর্ষিতা মায়েদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়ে জাতি যেন দায়মুক্ত হয়েছে। এই বিষয়টি ভীষণ লজ্জার, ভীষণ কষ্টের। আমাদের এই প্রজন্ম, আমাদের অনেক আবেগ আছে ঠিকই। কিন্তু আমরা কয়জন বীরাঙ্গনা, যুদ্ধশিশু সম্পর্কে সঠিকভাবে জানি, সঠিকভাবে তাদের হৃদয়ে ধারণ করি।

তাদের প্রতি সহানুভূতি ও তাদের রক্ষা করতে না পারা ছিল জাতির অসহায়ত্বের লজ্জা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের সামরিক পতিতালয়ে কোরীয় ও ফিলিপিনো নারীরা দীর্ঘ ৫০ বছর পর তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য জাপান সরকারকে বাধ্য করেছিল। বাংলাদেশ কবে পাকিস্তানকে বলতে পারবে, লাখ লাখ নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের জন্য তোমাদের ক্ষমা চাইতে হবে। প্রতিটি বাঙালির মনে এই কথাটির অনুরণন হচ্ছে, কিন্তু রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকে আছে সেই অপমানের আলেখ্য।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন