বিজ্ঞাপন

দুর্দিন কাটিয়ে আকাশে নতুন সূর্য দেখছি, এমন সময় জানতে পারলাম প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরীর লেখা করোনাকালীন উপাখ্যান ‘মহামারি করোনা: ডেটলাইন নিউইয়র্ক’ নামে বইটি নিয়ে প্রেস কনফারেন্স ও লেখক আড্ডার কথা। এই আড্ডা বসবে নিউইয়র্ক থেকে দূরে ওয়াশিংটন ডিসি, মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়ায়। সেখানে অবস্থানরত সাহিত্যপ্রেমী ও সাংবাদিকেরা স্বাগত জানাবেন আমাদের।

খবরটা শুনেই কিছুক্ষণ চুপ হয়ে বসে থাকলাম। আনন্দের সঙ্গে একটু ভয়ও লাগছে। প্রায় দেড় বছর পর বাসা থেকে দূরে যাব, তাই সাহস পাচ্ছিলাম না। সব দুশ্চিন্তা উড়িয়ে যখন যাওয়ার জন্য সপরিবারে প্রস্তুত হলাম, তখন মনের মধ্যে আনন্দ রাখার জায়গা কম হয়ে পড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সপরিবারে যেতে পারিনি।

আমার যাওয়ার ব্যবস্থা হলো চার নারীর সঙ্গে এক গাড়িতে। যাদের দুজনকে খুব ভালো করেই চিনি। একজন শেলী জামান খান অন্যজন ভায়লা সালিনা লিজা। আরেকজন যাবেন জানি, তবে তিনি কে সেই চিন্তা থেকেই গেল। চিন্তা অবশ্য আমার জন্য হলো না, হলো অচেনা সেই নারীর জন্য। এত লং জার্নিতে তিনি আমাদের তিনজনের সঙ্গে থাকতে পারবেন কিনা নেই ভেবে। ভয় অবশ্য আরেকটা ছিল এইচ বি রিতাকে নিয়ে। শারীরিক কারণে তাঁর চলাফেরা নিয়ে আলাদা নজরদারি রাখেন ইব্রাহীম চৌধুরী। আমাদের নিত্যদিনের নানা কোলাহলে এইচ বি রিতাকে নিয়ে আলাদা মনযোগ থাকে। রিতাকে গাড়ির সিটে বসিয়ে নিতে না পারলেও আমার মনের সিটে বসিয়ে নিয়ে সঙ্গে রাখব, এমন কথা মনে খেলা করতে লাগল।

৪ জুন। মেঘ আর রোদে গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা নিউইয়র্কে। প্রথমে শেলী জামান খানের বাসায় গেলাম। লিজা আসলে মহা আনন্দে চেপে বসলাম তাঁর গাড়িতে। লিজা রওনা হলো রহস্যময় চতুর্থ নারীকে নেওয়ার জন্য। অবশেষে সেই নারীর দেখা পেলাম। ভেবেছিলাম শাড়ি পরা, একটু ভালো স্বাস্থ্যের চোখে চশমা পরা গম্ভীর কেউ হবে। যা ভাবি জীবনে তার উল্টো প্রতিফলন বেশি হয় আমার। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমার চিন্তার ঠিক উল্টো একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে। প্যান্ট আর টপস পরে হাসিখুশি একটা মেয়ে। প্রথম দেখায় ভালো লেগে গেল। তাঁর নাম শাহানা ইয়াসমিন।

এবার রওনা হব ভার্জিনিয়া মেরিল্যান্ডের পথে। এর মধ্যেই শুনলাম লিজা নেমেছে চা খেতে। না হলে ওর গাড়ি চালাতে কষ্ট হবে। আমি কিছুটা জোর করেই নামলাম। নানা ঝক্কি করে চা খেয়ে ফের যাত্রা শুরু হলো। গাড়ির আয়নায় তখন নিজেকে দেখার চেষ্টা করিনি। দেখলে কিছুটা বুঝতে পারতাম, কতটা ভিতু আমাকে লাগছিল। লিজা কিছুক্ষণ চালায় আর আমাকে বলে, তুই ভয় পাস না, আমি খারাপ চালাই না। হঠাৎ যা ঘটল তাতে আমার হার্ট অ্যাটাক যে হয়নি সেও কম ভাগ্যের কথা না। এমন বৃষ্টি নামল যে, চোখের সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছে গাড়ি নিয়ে সুইমিং পুলে ঝাঁপ দিচ্ছি। এবার মুখে ঝুলে থাকা সব হাসি বিলীন হয়ে গেল। লিজাকে বললাম, গাড়ি কোথাও দাঁড় করিয়ে রাখতে। বৃষ্টি কমলে রওনা দেওয়া নিরাপদ হবে।

লিজা আমার কথা শোনে না। সে তার গতিতে গাড়ি নিয়ে ভীষণ সুন্দর করে সামনে এগোতে লাগল। লিজার হাত যে শুধু লেখায় ভালো এমন নয়, টের পেলাম গাড়ি চালাতেও হাত তার শক্ত। কিছুটা পথ পেরোলেই বৃষ্টি থেমে আসে। যেমন করে করোনার তাণ্ডব পেরিয়ে আবার জনপদ বেরিয়ে আসছে। লিজার ড্রাইভিং নিয়ে ভয়ও কেটে গিয়েছিল। যেমন করোনার ভয় এখন আমাদের আর তাড়া করে না। সহনীয় হয়ে উঠেছে। লিজা খুব সুন্দর করেই নিয়ে গিয়েছিল আমাদের গন্তব্য স্প্রিংফিল্ড, ভার্জিনিয়ার উইনগেট উইন্ডহাম হোটেলে।

সেখানে আমরাসহ প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার লেখক-সাংবাদিকের ১৪ সদস্যের একটি দল। পাঁচটি রুম বুকিং করা ছিল আমাদের জন্য। ২০৯ নম্বর রুমের চাবি পেলাম থাকার জন্য। এই রুমেই সবাই এক সঙ্গে গানে গল্পে আর খাবারে অনেকটা সময় কাটিয়ে সবাই যে যার রুমে চলে গেলেন। থেকে গেলাম আমি, রওশন হক ও ইব্রাহীম চৌধুরীর স্ত্রী ফ্লোরা।

পরদিন সকালে নাশতা করে ওয়াশিংটন ডিসির দিকে রওনা দিই। ক্যাপিটল হিল ও মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ঘুরে এসে দাঁড়ালাম হোয়াইট হাউসের সামনে। সাদা রঙের একটা ভবন।

যুদ্ধ আমাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। অতীতের নানা যুদ্ধে আমরা দেখেছি, যুদ্ধের ভয়ংকর পরিণতি। সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ যুদ্ধ চায় না, তারা চায় শান্তি। বিশ্বে শান্তিকামী মানুষদের মধ্যে ফিলিপ একজন। ফিলিপ তাঁর প্ল্যাকার্ডে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ এ আবেদন নিয়ে হোয়াইট হাউসের সামনে একটি তাঁবুর সামনে বসে আছেন।

হোয়াইট হাউসের আশপাশে গ্রীষ্মের পল্লবিত পুষ্প, ফুল আর কড়া রোদে অশান্ত জনতার ত্রস্ত চলার ফাঁকে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছিল কবি মহাদেব সাহার কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো—

‘কত দিন কোথাও ফোটে না ফুল, দেখি শুধু

অস্ত্রের উল্লাস

দেখি মার্চপাস্ট, লেফট রাইট, কুচকাওয়াজ;

স্বর্ণচাঁপার বদলে দেখি মাথা উঁচু করে আছে হেলমেট

ফুলের কুঁড়ির কোনো চিহ্ন নেই, গাছের আড়ালে থেকে

উঁকি দেয় চকচকে নল,

যেখানে ফুটত ঠিক জুঁই, বেলি, রঙিন গোলাপ

এখন সেখানে দেখি শোভা পাচ্ছে বারুদ ও বুলেট।’

হোয়াইট হাউসের সামনে এসে অনেক কিছুই মনে পড়ে। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া মিনিয়াপোলিসে পুলিশি অত্যাচারে এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলো, তার আঁচ এসে পড়েছিল হোয়াইট হাউসে। ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্টের নিবাসের সামনে রীতিমতো জনতা-পুলিশ খণ্ডযুদ্ধ হয়েছে। পরিস্থিতি জটিল দেখে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে মাটির নিচে বাংকারে অল্প সময়ের জন্য আশ্রয় নিতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। মানুষের অধিকারের লড়াই এভাবেই উজ্জীবিত হয়। মিনিয়াপোলিসে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড এভাবেই বৈষম্য আর বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

হোয়াইট হাউসের সামনে আগেও এসেছি কয়েকবার। তবে এবারের ভালো লাগাটা যেন ছিল ভিন্ন। ওয়াশিংটন মনুমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার কিংকে স্মরণ করি আমরা। মানুষের মুক্তির ফরিয়াদের সঙ্গে আজও উচ্চারিত হয় মহাত্মা গান্ধীর নাম, উচ্চারিত হয় মার্টিন লুথার কিংয়ের নাম।

দিনের ক্লান্তি নিয়ে আমরা জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছালাম। এখানকার একটি মিলনায়তনে লেখক-সাংবাদিকদের আড্ডা আলোচনার আয়োজন। অনেকটা আচমকাই উপস্থিত হলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর প্রতীক সৈয়দ মঈন উদ্দিন। তিনি একটা কথাই বললেন, ‘আমরা আমাদের সময়ের কাজটি করেছি। আপনারা আপনাদের সময়ের কাজ করে পতাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবেন।’ চোখ বুঝে টের পাচ্ছিলাম, যে পতাকা মানুষের অধিকার ধারণ করে উড্ডীন হয়। মানুষের অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনায় এ পতাকা ম্লান হয়। সে পতাকা বাংলাদেশের হোক আর হোক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হোক।

উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত একদল অগ্রসর মানুষের মহামারি পেরোনো সময়ের আড্ডা আলোচনায় আবার জীবনের জয়গানের কথাই উঠে আসে। একজন বীর প্রতীকের উজ্জীবনী বার্তায় মানুষের চলমানের লড়াই করার বার্তাই দিয়ে যায়। ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য মানবের চিরন্তন এ লড়াই।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন