বরফ গলে কখনো নদী হয় না। নদীর জন্ম হয় পাহাড়ি ঝরনা আর ভূমিকম্প থেকে। কখনো কখনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকেও নদীর জন্ম হতে পারে। বরফ গলে কী হয়? বরফ গলে পানি হয়, কখনো বা প্লাবন হয়। বরফ গলা সেই পানি অববাহিকা, নদী, নালা, খাল, বিল হয়ে আবার মিশে যায় সাগর-মহাসাগরে। যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ময়লা আবর্জনাকে ঠেলে দেয় সাগরের অতল গভীরে। ভুলে যায় বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার দহন আর মিশ্রণে দূষণের স্মৃতি। সাগরের অথই তরঙ্গরাশির সঙ্গে মিশে মেতে ওঠে অঢেল আনন্দে।
সাগরের বুক থেকে জলরাশির বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ সূর্যের তাপ আর বাতাসের তীব্র ঝাপটা। সূর্যের তাপ পানিকে স্ফুটনের প্ররোচনা দেয় আর বাতাসের ঝাপটা তাকে উড়ে নিয়ে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার তাড়না জোগায়। বায়ুমণ্ডলে উড়ে যাওয়ায় পর থেকেই শুরু হয়ে যায় দূষণের সঙ্গে মেলামেশা। সূর্যের তাপ একসময় সঙ্গ ছেড়ে দেয়, জলরাশিগুলো তাদের আপন পরিচয় নষ্ট করে জমা হতে শুরু করে বরফখণ্ড থেকে। এই বরফখণ্ডে পা পিছলে কারও হাড় ভাঙে, কারও স্নায়ুরোগ বেড়ে যায়। শক্ত বরফখণ্ডে ধাক্কা লেগে কতই না অনবদ্য সৃষ্টি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যের পরিণতিতে বরফখণ্ডে আবারও আঘাত হানে সূর্যের তাপ রশ্মি। বরফ গলে বেয়ে পড়ে ধরনীর বুকে। বিহ্বল হয়ে খুঁজে ফেরে আপন ঠিকানা, সাগরিকা মায়ের বুক। কিন্তু সবটুকু জলরাশি কী আর মায়ের বুকে ফিরে যেতে পারে? পারে না। নর্দমা, হ্রদ, ডোবা কিংবা পুকুরে আটকা পড়ে অপেক্ষা করতে হয় পুনর্জন্মের। অপেক্ষার প্রহরটা জুড়ে থাকে গ্লানিময় হতাশা আর বিতৃষ্ণা।
প্রতিটা মানুষের মস্তিষ্ক যেন একেকটা বরফ কল। মানবিক অভিমান আর সামাজিক দৈন্য সেই বরফ কলের চালিকাশক্তি। এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল তার নিজস্ব পরিবার। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি, বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে তাদের পরিবারের আকৃতি, প্রকৃতি এবং দায়িত্বশীল প্রতিজ্ঞা। যাদের পারিবারিক আশ্রয় থাকে না বা নষ্ট হয়ে যায় তারা হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়াটা অনিবার্য। অন্তত আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে এটাই সত্যি। আপনি মানেন বা না মানেন, কারও জন্ম যদি একটা সুনির্দিষ্ট পরিবারে হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তি নিঃসন্দেহে একজন ভাগ্যবান। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা জন্মের পর কোনো পারিবারিক পরিচয় নিতে পারেনি। কারও হয়তো কোনো উপায় ছিল না। কেউ হয়তো শৈশবেই হারিয়েছে তার পারিবারিক বন্ধন। তার মানে এই না যে তারা বেঁচে নেই বা তারা কেউ ভালো নেই। এর মানে এই না যে তাদের কোনো পরিবার দরকার নেই বা তারা তাদের নিজস্ব পরিবার চায় না কখনো। হ্যাঁ, পরিবারহীন, বন্ধনহীন ওই লোকগুলোও বেঁচে থাকে, সময় অসময়ে ভালোও থাকে। তারা কখনোই নিঃশেষ হয়ে যায় না। তবে তাদের যেমন কোনো পিছুটান থাকে না, ঠিক তেমনি তাদের খোঁজ নেওয়ারও কেউ থাকে না।
একটি পরিবারে সবারই কিছু দায় থাকে, কিছু কর্তব্য থাকে। আমাদের সমাজের খুব সাধারণ একটা পারিবারিক গঠন যদি আমরা চিন্তা করি; সেখানে স্বাভাবিকভাবে একজন মা, একজন বাবা এবং ভাই-বোন থাকে। খুব সাদাসিধা মধ্যবিত্ত একটা জীবনধারায় যেভাবে পরিবারগুলো চলে তাদের চিত্র প্রায় একই রকম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাবা বাইরে আয়-রোজগারের কাজ করেন আর মা সংসার চালান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মা দুজনকেই আয়-রোজগারে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। নব্বই দশকের শেষার্ধে এসে দ্বৈত আয়ের পরিবার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। যাই হোক, মূল বিষয়ে ফিরে আসি। একটা পরিবারকে যে রকম করে বাবা-মা দুজনে অনেক পরিশ্রম করে সাজান, গুছিয়ে রাখেন, ঠিক তেমনি পরিবারের সন্তানদেরও সেই সাজানো পরিমণ্ডল সঠিকভাবে ব্যবহার করা কিংবা কাজে লাগানোটাও একটা কর্তব্য। এটা শুধু প্রয়োজনের তাগিদে নয়, এতে প্রতিটা সন্তানের পারিবারিক দায় বলা যেতে পারে।
শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীতে যেকোনো প্রাণী একাকিত্ব নিয়ে ভালো থাকতে পারে না। মানুষ সৃষ্টির পরপরই তার সঙ্গীর প্রয়োজন বোধ করতে শুরু করেছিল। একাকিত্ব থেকে মুক্তিলাভের আশায় মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার তাগিদেই গড়ে তোলে পরিবার। কয়েকটা মৌলিক অঙ্গীকার নিয়েই মানুষ পরিবার গড়ে তোলে। এগুলো হলো (১) একাকিত্ব দূরীকরণ, (২) সুনির্দিষ্ট আশ্রয়স্থল নির্ণয়ন (৩) জৈবিক চাহিদা পূরণ (৪) সুস্থ বিনোদন (৫) বংশ বিস্তারের সঠিক পন্থা পরিচালন এবং (৬) পারিবারিক দায়িত্ব হস্তান্তরের সঠিক সমীকরণ। প্রথম তিনটা অঙ্গীকারের পূর্ণতা পেতে প্রাথমিকভাবে মা-বাবাই দায়িত্বশীল ভূমিকায় থাকেন। চতুর্থ এবং পঞ্চম অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মা-বাবা এবং সন্তান উভয় পক্ষেরই দায় জড়িত। ষষ্ঠ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায় মূলত সন্তানদের ওপরেই থাকে।
মা-বাবার নিরলস পরিশ্রমে সাজানো পারিবারিক পরিমণ্ডলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সন্তানকে অবশ্যই নিজেদের ব্যক্তিত্ব গঠন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা, ধর্মীয় এবং সামাজিক আচরণবিধির অনুশীলন, জাগতিক জ্ঞান আহরণ এবং সুস্থ-মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাশক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবে। যোগ্য হয়ে বেড়ে ওঠাটাই যেকোনো পরিবারের কাছে তার সন্তানদের সবচেয়ে বড় দায়।
এ ক্ষেত্রে প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ কিংবা আমেরিকানদের জীবনধারার সঙ্গে মিল না-ও থাকতে পারে। যারা নিজের মা-বাবার নিরলস পরিশ্রমে গড়ে তোলা পরিবারকে অভিযুক্ত করে স্বার্থপরতার দিকে পা বাড়ানোর চিন্তা ভাবনা করছেন তারা একবার চিন্তা করে দেখুন। অভিযুক্ত পরিবারের প্রতি কতটুকু দায় আপনি নিজে নিবারণ করেছেন; পারিবারিক পরিমণ্ডলের ন্যূনতম সুবিধাটুকু কাজে লাগিয়ে কতটুকু যোগ্য আপনি হতে পেরেছেন।
মনে রাখতে হবে, মানব জীবন সামুদ্রিক জলরাশি নয়। সাগরের বুক থেকে জলরাশির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং সাগরের বুকে ফিরে আসাটা প্রাকৃতিক নিয়ম এবং সামগ্রিক পরিমণ্ডলের প্রয়োজন আর পরিশোধনের কারণেই হয়ে থাকে। কিন্তু মানবজীবন নিয়ন্ত্রণের ভার মস্তিষ্ক নামক বরফ কলের ওপর ন্যস্ত। অন্যায়ভাবে সংসার ত্যাগ হয়তো আপনার ফিরে আসার রাস্তাটাকে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেবে। হয়তো বাকি জীবন কেটে যাবে। তবু পারিবারিক দায়টাকে সাদরে গ্রহণ করুন, ধৈর্যশীল হোন, পরিবারের পাশেই থাকুন; পারিবারিক পরিমণ্ডলের সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখুন, নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে পরিবারের সহায়তা নিন, সফলতার পেছনে না ছুটে জীবনটাকে সার্থক করে তুলুন।
ভালো থাকুন; ভালোবাসুন নিজেকে, নিজের পরিবারকে; প্রমাণ করুন নিজের যোগ্যতা এবং সার্থক হোক আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং মানবিক জীবন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0