default-image

ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর মানবিক অনুভূতি। ভালোবাসা নিয়ে আছে শত শত গল্প, উপন্যাস, নাটক, পৌরাণিক উপাখ্যান। সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির প্রধান বিষয়বস্তু এই ভালোবাসা। ভালোবাসার জন্য মানুষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, এমনকি আত্মহননের পথও বেছে নেয়। কোন্দল, হত্যা, ঈর্ষা, মিলন-যুদ্ধ পৃথিবীতে কত কাহিনির সূত্রপাত এ ভালোবাসা থেকে। ভালোবাসা নিয়ে কবি, মনীষীদের করা উক্তির অভাব নেই। এই যেমন জন কিটস বলেছেন, ‘Two souls with but a single thought, two hearts that beat as one’, আর উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ার তো আরও নাছোড়বান্দা। তিনি বলছেন, ‘Love me or hate me, both are in my favor… If you love me, I’ll always be in your heart… If you hate me, I’ll always be in your mind.’ ১৪ ফেব্রুয়ারি এই ভালোবাসা বিনিময়ের দিন, ভালোবাসার ইশতেহারের দিন।
সারা বিশ্বে এই দিনে প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল পালন করে ভ্যালেন্টাইনস ডে। উৎসব ও আনন্দে মেতে নারী-পুরুষ ফুল, কার্ড, গিফট বিনিময়ের মাধ্যমে দিনটি স্মরণীয় করে রাখে। এ বিশেষ দিনটির উৎপত্তি সম্পর্কে নানাবিধ কাহিনি রয়েছে। এমনই এক তথ্যমতে, ভ্যালেন্টাইনস ডের উৎপত্তি ৬০০ বছর আগে ঘটেছিল। সে সময় এক প্যাগান সম্প্রদায় ‘লুপারসিলা’ নামে একটি উৎসব পালন করত। সেই উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল নারীদের বন্ধ্যত্ব দূর করা। শূকর, গরু কিংবা ছাগল উৎসর্গ করে তাদের রক্ত নারীদের গায়ে মাখিয়ে দেওয়া হতো উৎসবের দিন। পরে একটি বাক্সে সেসব নারীর নাম লিখে তাদের পুরুষ সঙ্গী বেছে নেওয়া হতো। ধারণা করা হয় সেই উৎসব থেকেই এসেছে আজকের ভ্যালেন্টাইন ডে।
অনেকের মতে, ভ্যালেন্টাইন ডের গোড়াপত্তন হয়েছিল আরও অনেক পরে। তৃতীয় শতাব্দীর দিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের ফাঁসির জের ধরে শুরু হয় এই দিবস। রোমান রাজা দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন গোপনে কিছু খ্রিষ্টানকে পালাতে সাহায্য করেন। পাশাপাশি কিছু খ্রিষ্টান যুগলকে বিয়েও দেন। আর এই ঘটনা জানতে পেরে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে হত্যার নির্দেশ দেন রাজা ক্লডিয়াস। পরে মৃত ভ্যালেন্টাইনের স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। প্রতি বছর এই দিনটিতে হাজার হাজার মানুষ তাদের ভালোবাসার মানুষকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লেখেন।
তবে মজার ব্যাপার হলো অনেকেই নিজের প্রিয় মানুষটির কাছে চিঠিটি না পাঠিয়ে পাঠান ইতালির ভেরোনাতে। শেক্‌সপিয়ারের কালজয়ী প্রেমের উপন্যাস ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-এর স্মরণে ভেরোনার এই স্থান জুলিয়েটের নামে উৎসর্গিত। সেখানে প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি হাজার হাজার চিঠি এসে জমা হয়। জুলিয়েট ক্লাবের কিছু স্বেচ্ছাসেবী প্রতিটি চিঠির উত্তর দেন যত্ন সহকারে। এমনকি প্রতি বছর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী চিঠিকে দেওয়া হয় ‘কারা গুইলেইটা’ (ডিয়ার জুলিয়েট) নামের একটি পুরস্কার।

default-image

ভ্যালেন্টাইন ডেতে প্রিয় মানুষটিকে চকলেটের বাক্স উপহার হিসেবে দেওয়ার প্রথাটি শুরু হয়েছিল উনিশ শতকে। রিচার্ড ক্যাডবেরি নামের এক তরুণ এই প্রথাটি শুরু করেন। বিখ্যাত চকলেট কোম্পানি ক্যাডবেরির প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ক্যাডবেরিই ভ্যালেন্টাইন ডেতে চকলেট গিফট দেওয়ার প্রচলন শুরু করেছিলেন। এর সঙ্গে ব্যবসায়িক লাভেরও একটি বিষয় জড়িত ছিল। ওই সময় থেকেই গিফট হিসেবে চকলেট দেওয়া একটি প্রথায় পরিণত হয়।
পৃথিবীর সর্বপ্রথম ভ্যালেন্টাইন কবিতা সম্পর্কে ইতিহাসবিদেরা বের করেছেন এক চমকপ্রদ তথ্য। প্রথম ভ্যালেন্টাইন কবিতাটি লেখা হয়েছিল এক জেলখানায়। এজিনকোর্টের যুদ্ধে ধরা পড়ে যখন জেলে দিনযাপন করছিলেন ডিউক অব অরলিয়েন্সখ্যাত চার্লস। ঠিক সেই সময়ে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রীর উদ্দেশ্যে কবিতাটি লেখেন তিনি। ২১ বছর বয়সী চার্লস অবশ্য কবিতাটি পড়ে স্ত্রীর অভিব্যক্তি কেমন ছিল, তা দেখতে পারেননি। কারণ, তিনি জেলেই ছিলেন টানা ২০ বছর। তবে সেই কবিতাটিকেই ধরা হয় সর্বপ্রথম ভ্যালেন্টাইন কবিতা হিসেবে।
ভালোবাসার সঙ্গে গ্রিক দেবতা কিউপিডের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাচীন গ্রিক মিথ অনুযায়ী কিউপিড হচ্ছেন ভালোবাসার দেবতা। তবে ইরোস নামে পরিচিত এই দেবতা ছিলেন আরেক গ্রিক দেবী আফ্রোদিতির ছেলে। নিজের সন্তানকে দুটি তীর দিয়েছিলেন আফ্রোদিতি। এর একটি ছিল ভালোবাসার প্রতীক, আরেকটি ঘৃণার। মিথ অনুযায়ী, ভালোবাসার তীর দ্বারা বিদ্ধ হলে আপনি কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভালোবাসার মায়ায় বাঁধা পড়বেন। তবে কিউপিডকে তার মা আফ্রোদিতি তীর দিয়েছিলেন আদতে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতে। কিন্তু এরপরও ভালোবাসা দিবসের মাসকট হিসেবে খ্যাতি পেয়ে যায় তীর হাতে শিশু কিউপিড। ভ্যালেন্টাইন ডে আক্ষরিক অর্থে মূলত প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা প্রকাশের দিন। তবে যেহেতু একজন মানুষের ভালোবাসার ব্যাপ্তি তার চারপাশের অসংখ্য প্রিয়জনকে ঘিরে আবর্তিত, তাই ভালোবাসা দিবসের সর্বজনীনতা ও গুরুত্ব অসীম।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0