default-image

মানব জাতির মাঝে কল্যাণ আর শান্তির বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দুই হাজার বছর আগে ২৫ ডিসেম্বর জেরুজালেমের বেথলেহেমে জন্ম নেন মহাপুরুষ যিশুখ্রিস্ট। যিশুর শুভ জন্মের এই দিনটি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব—বড়দিন। এই বড়দিনের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ পয়েন্সেটিয়া। এটির শোভা আর আলোক সজ্জায় আলোকিত হয় বড়দিন। আর বাড়ায় আনন্দ।
বড়দিনের ফুল হিসেবে অত্যন্ত আদরণীয় পয়েন্সেটিয়া। কিন্তু ফুলের সংজ্ঞা অনুযায়ী পয়েন্সেটিয়াকে আসলে ফুল বলা যায় না। এর বৈজ্ঞানিক নাম Euphorbia pulcherrima. গুল্ম জাতীয় সপুষ্পক এই উদ্ভিদটির শীর্ষের পাতাগুলো ফোটোপিরিয়ডিজমের কারণে উজ্জ্বল লাল হয়; যাদের ব্র্যাক্ট বলা হয়। আর ব্র্যাক্টগুলো গুচ্ছাকারে থাকায় ও রঙিন হওয়ায় এদের পাপড়ির মতো দেখায়। ওই ব্র্যাক্টগুচ্ছের মাঝখানে ছোট ছোট তারার মতো জড়ো হয়ে থাকে হলুদ রঙের ফুল।
বড়দিনের সঙ্গে পয়েন্সেটিয়া সম্পৃক্ত হওয়ার কাহিনিটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। মেক্সিকোতে মারিয়া নামের মাতৃহারা ছোট এক মেয়ে দরিদ্র বাবার আদর্শ আর মানবিক শিক্ষায় বেড়ে উঠছিল। দীর্ঘদিন চাকরিহীন থাকার পর পেটের তাগিদে বড়দিনের ঠিক কয়েক দিন আগে বাবাকে চাকরি নিয়ে চলে যেতে হয়েছিল অন্য শহরে। তাই মারিয়ার বাবা তাকে প্রথমবারের মতো তার দিদিমার বাড়িতে পাঠালেন আর সঞ্চয়ের সব পয়সা দিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কিনে দিলেন বড়দিনের উপহার। দিনের শেষে দিদিমার বাড়িতে পৌঁছে সবার জন্য আনা উপহারগুলো বিতরণ করে দানের আনন্দে নির্ধন মারিয়া অনেক তৃপ্তিবোধ করল। বাক্সের সব উপহার দেওয়া শেষ হয়ে গেলে দিদিমা উৎকণ্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, “মারিয়া, যিশুর জন্য তুমি কী উপহার এনেছ?” অবাক হয়ে মারিয়া উত্তর দেয়, “যিশুর জন্য তো আমি কিছু আনিনি, দিদিমা।” দিদিমা বললেন, “আমাদের গ্রামে ক্রিসমাস ইভের পবিত্র রাতে সবাই গির্জায় গিয়ে যিশুকে উপহার দেয়।” এই প্রচলিত রীতির কথা শুনে বিষাদে ভরে গেল মারিয়ার মন। দিদিমা সরল শিশুর মনের ভাব বুঝতে পেরে তিনি যে বাদামের ঝুড়িটি উপহার হিসেবে যিশুর জন্য নেবেন বলে মনস্থির করেছেন সেখান থেকে কিছু বাদাম অন্য একটা ঝুড়িতে নিয়ে যিশুকে উপহার দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন মারিয়াকে। কিন্তু এতে মারিয়ার মন ভরল না। সে তার আদর্শবান পিতার কথা মনে করল -নিজস্ব কোনো জিনিস যদি ক্ষুদ্রও হয়, ভালোবাসার সঙ্গে দেওয়া সেই উপহারই সবচেয়ে মূল্যবান। ছোট্ট নিঃস্ব মারিয়া রাস্তার পাশ থেকে যত্ন করে কিছু আগাছা তুলে এনে দিদিমাকে বলল যে সে এগুলো উপহার হিসেবে যিশুকে দিতে চায়। দিদিমা একটি ঝলমলে সিল্কের কাপড় দিয়ে সুন্দর করে আগাছাগুলোকে বেঁধে উপহারযোগ্য করে দিলেন। গির্জায় একে একে সবাই তাদের মূল্যবান উপহার দেওয়ার পর মারিয়া শঙ্কিত পায়ে ধীরে ধীরে বেদির কাছে গিয়ে যিশুর মূর্তির সামনে কাপড়ে বাঁধা আগাছাগুলো রেখে সমর্পিত মনে বলল, “প্রভু, তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই আমার, আমি তোমার জন্য কিছুই আনতে পারিনি, ভালোবেসে শুধু এই আগাছা এনেছি, এটাই তুমি গ্রহণ কর।” গির্জার একজন কৌতূহলী ব্যক্তি কাপড়ের আবরণটা খুলে দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলে মারিয়া চোখ বন্ধ করে অশ্রুপাত করতে করতে করজোড়ে একমনে প্রভুকে ডাকতে লাগল, “রক্ষা কর, প্রভু”। নীরব গির্জা হঠাৎ সরব হয়ে উঠলে মারিয়া চোখ খুলে দেখে সেই আগাছাগুলো অনিন্দ্য সৌন্দর্যের উজ্জ্বল লাল রঙের ফুলে রূপান্তরিত হয়েছে। এত সুন্দর ফুল তারা কেউ কোনো দিন দেখেনি। শুদ্ধ প্রেম ও ভালোবাসার প্রতীক সেই অলৌকিক ফুলের অপরূপ শোভায় শোভিত হলো গির্জা। বিস্মিত মারিয়া আর দিদিমা সযত্নে রোপণ করল সেই গাছ মেক্সিকোর মাটিতে; যা আজ পয়েন্সেটিয়া বা “ফ্লাওয়ার অব দ্য হলি নাইট” নামে পরিচিত।
মেক্সিকোর পথের ধারে ফুটে থাকা বনফুল আজকের বড়দিনের অলংকার হওয়ার ইতিহাস অনেক পেছনের।
ইতিহাসের চাকা ঘুরালে দেখা যায় যে, মেক্সিকোর আদিবাসী এজটেকসরা আলংকারিক উদ্দেশ্যে পয়েন্সেটিয়া ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গে বস্ত্র, প্রসাধনী ও জ্বর নিরাময়ের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করত। আমেরিকাতে পয়েন্সেটিয়ার আগমন ঘটে ১৮২৫ সালে যখন জুয়েল রবার্ট পয়েন্সেট (১৭৭৯-১৮৯১) মেক্সিকোতে প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। অনুসন্ধিৎসু জুয়েল মেক্সিকোর গ্রামের পথে পথে খুঁজে বেড়াতেন নতুন আঞ্চলিক প্রজাতির উদ্ভিদ। তিনি একদিন পথের ধারে পেয়ে গেলেন রূপময়ী এই বনফুল আর মুগ্ধ হয়ে তুলে নিয়ে স্থান দিলেন দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গ্রিন হাউসে। জুয়েল এই বনফুলটির নামকরণের দায়িত্ব দেন উইলিয়াম প্রেসকট (১৭৯৬-১৮৫৯) নামের একজন মার্কিন ইতিহাসবিদ ও উদ্যানতত্ত্ববিদকে। উইলিয়াম তাঁর ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত “কনকোয়েস্ট অব মেক্সিকো” বইয়ে জুয়েল পদবির সঙ্গে মিল রেখে এই ফুলটির নাম দেন পয়েন্সেটিয়া। ১৮৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর জুয়েল পয়েন্সেট মারা যান এবং পয়েন্সেটিয়ায় তাঁর অবদানের জন্য এই দিনটিকে আমেরিকার জাতীয় পয়েন্সেটিয়া দিবস হিসেবে পালন করা হয়। অধিকন্তু, ২০০১ সালে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গ্রিনভিল শহরে বড়দিনের শোভাযাত্রার সূচনা হয় জুয়েলের প্রতিমূর্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে এলবার্ট একি ও তাঁর পুত্র পল একি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বিপুল আকারে লাল, গোলাপি, সাদা, হলুদ ও মিশ্রিত রঙসহ প্রায় একশত প্রজাতির পয়েন্সেটিয়া হাইব্রিড উৎপাদন করে এটির বাণিজ্যিকভাবে প্রচার ও প্রসার ঘটায়। সবচেয়ে বেশি চাষ এখানে হয় বলে ক্যালিফোর্নিয়াকে “দ্য পয়েন্সেটিয়া ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড” বলা হয়। মেক্সিকো এবং গুয়াতেমালাসহ অন্যান্য স্প্যানিশ ভাষাভাষী দেশগুলিতে পয়েন্সেটিয়া ‘ফ্লোরস দে নচে বুয়েন’ বা ‘ক্রিসমাস ইভ ফ্লাওয়ার’ নামে, স্পেনে ‘ফ্লোর ডি পাসকুয়া’ বা ‘ইস্টার ফুল’ নামে এবং হাঙ্গেরিতে ‘সান্তা ক্লোজ ফ্লাওয়ার’ নামে পরিচিত।
জগতে কোনো কিছুই তুচ্ছ নয়। ভালোবাসা, আদর-যত্নে এক বনফুল হয়ে যায় জনপ্রিয় পয়েন্সেটিয়া। লৌকিক আর অলৌকিকতার মহিমায় সেই পয়েন্সেটিয়া আজ বড়দিনের কিংবদন্তি। বড়দিনের পয়েন্সেটিয়া নিয়ে আসুক আনন্দ, নিয়ে আসুক শান্তির বার্তা। আর ছোট্ট মারিয়ার মতো নির্মল হোক আমাদের মন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0