সাহিদার শরীর দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে। রাতে ঘুম খুব কমে গেছে। ঘুমালেও দুঃস্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যেই গোঙানির মতো অদ্ভুত শব্দ করে। মনে হতে থাকে কেউ যেন তার বুকের ওপর উঠে বসে আছে। প্রচণ্ড চাপ লাগে। একটু পড়েই নীরব কান্নায় বুক ভেসে যায়। তীব্র কষ্ট হয়। মনে হয় এই বুঝি মরে যাবে। অনেক কিছু আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু পারে না। সবকিছু ধরা ছোঁয়ার বাইরে লাগে। শরীর কেমন শূন্য মনে হয়। অথচ কেউ তা টের পায় না। এমনকি পাশে শুয়ে থাকা তার স্বামী দেলোয়ারও না। পরে ব্যাপারটা বলতে চাইলেও বোঝাতে পারে না। কেউ তার যন্ত্রণা বুঝতে চায় না।
অনেক দিন থেকেই সাহিদা তার স্বামীকে সমস্যার কথাটা বলার চেষ্টা করছে। তবে দেলোয়ার গুরুত্ব দিতে চায় না। শ্বশুর শাশুড়িও শোনার পর ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেনি। তাঁরা বলছেন, বউয়ের ওপর জ্বিনের আছর আছে। কী যে অশান্তি লাগছে সাহিদার, বলে বোঝাতে পারছে না। নিজেও কয়েকবার ভেবেছে, কেন এমনটা হয়! এই কষ্টের নাম কী! কোনো উত্তর পায় না। তবে একদিন দেলোয়ার ভাবে, এভাবে না থেকে বরং সাহিদাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। যদিও আত্মীয়স্বজনের মত হচ্ছে, ‘একটা ওঝা ডেকে আনো। ভূত ছাড়াও’। সবার কথাবার্তা কী যে অমানবিক লাগে সাহিদার কাছে, কষ্টে বুক ফেটে যায়।
জীবন যন্ত্রণায় সাহিদা যখন কাতর, তখন দেলোয়ার নিদেনপক্ষে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে রাজি হলো। তাতে সাহিদা কিছুটা আশার আলো পেলেও, শান্তি পাবে এ নিয়ে খুব একটা নিশ্চিত হতে পারল না।

দুই.
অফিসে ছুটি নিয়ে সাহিদাকে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে এসেছে দেলোয়ার। এই মুহূর্তে তারা ডাক্তার হাশিম উদ্দিনের চেম্বারে বসে আছে। একটু ঝুঁকে এসে ডাক্তার জানতে চাইলেন, ‘কী হচ্ছে আপনার?’
রাতের বেলা ঘুম ভেঙে যায়-সাহিদার উত্তর।
-‘ব্যস, এটুকুই’? ডাক্তার হাশিমের প্রশ্ন।
-‘না এটুকুই না। তখন মনে হতে থাকে শরীরের ওপর ভারী কেউ চাপ দিয়ে আছে। শরীরের ওপর চড়ে বসেছে। এতটাই ভারী যে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়। আমি ভয় পাই।’
-‘আপনি কি নিশ্চিত কেউ একজন আপনার শরীরের ওপর চেপে বসে থাকে?’
-‘হ্যাঁ, নিশ্চিত।’
-‘সে দেলোয়ার, মানে আপনার স্বামী নয় তো? ভেবে বলেন।’
-‘না, আমার স্বামী নয়। অন্য কেউ। কারণ আমার স্বামী তখনো আমার পাশে শুয়ে থাকে। আমি বুঝতে পারি।’
-‘হুমম…অন্ধকার ঘরে কে আপনার ওপর চেপে বসবে! তিনি কি নারী, নাকি পুরুষ?’ একের পর এক প্রশ্ন করে যান ডাক্তার হাশিম।
-‘নারী নাকি পুরুষ, অন্ধকারে বুঝতে পারি না। পুরুষের মতোই তো লাগে।’
-‘আপনি আপনার স্বামীকে তখন ডাকেন না কেন?’
-‘ডাকা তো দূরের কথা, অনেক চেষ্টা করে কেবল গোঙানির মতো শব্দ বের হয়। ভয়ে বুক ধড়ফড় করে ওঠে। মনে হয়, এই বোধ হয় দম আটকে মরে যাব।’
এবার ডাক্তার দেলোয়ারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কিছু টের পান?’
দেলোয়ার মাথা নাড়ে, ‘না টের পাই না। তবে একপর্যায়ে যখন সাহিদা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসে, তখন সে আমাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ভয় পায়। পানি খেতে চায়। বলে কেউ একজন তার শরীরের ওপর উঠে বসেছিল। কিন্তু আমি কিছু দেখতে পাই না।’ -এটুকু বলে থামে দেলোয়ার। সাহিদার দিকে তাকায়। স্বামীর চোখে তাকাতে পারে না সে। মাটির দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকে। সরল সোজা মেয়েটা জটিলতা বোঝে না। অথচ তাকে নিয়ে সবাইকে কী ঝক্কিই না পোহাতে হচ্ছে! ভেবে ভেবে লজ্জা পায় সে।
দেলোয়ার আবারও বলতে শুরু করে, ‘সাহিদা ভয় পায় বলে মাঝে মাঝে বাতিয়ে জ্বালিয়েও রাখি। কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারি না। অবস্থা এমন হয়েছে যে সাহিদা এখন ঘুমানোর জন্য বিছানায় যেতেই ভয় পায়।’ একটানা কথাগুলো বলার পর থামে দেলোয়ার।
ডাক্তার হাশিম বলেন, ‘আমি আপাতত কিছু ঘুমের ওষুধ লিখে দিচ্ছি। তার ভালো করে ঘুমানো দরকার। এ ছাড়া আমার মনে হয় আপনি তাকে একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞকে দেখান। ডাক্তার কামরুল হাসান আমার বন্ধু। আমি ওকে বলে দিচ্ছি।’
দেলোয়ারের মুখটা মলিন হয়ে যায়। ‘শেষমেশ পাগলের ডাক্তারের কাছে স্ত্রীকে নিয়ে যেতে হবে। এই ছিল কপালে!’ -মনে মনে ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।
ডাক্তার হাশিম বললেন, ‘অনেক কারণেই এমন সমস্যা হতে পারে। কামরুল ভালো বলতে পারবে।’
সাহিদা কিছু ভাবতে পারে না। দেলোয়ারও চুপ করে থাকে। তার প্রচণ্ড খারাপ লাগছে।
-কিছু ভাবছেন?
দেলোয়ার বলে, ‘পাগলের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। অবস্থা কি তেমনই?’
এবার ডাক্তার কিছুটা ধমক দিয়ে ওঠেন, ‘দেখুন একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে আপনি অদ্ভুত কথা বলছেন। শরীরের যেমন সমস্যা হতে পারে। সেটা হতে পারে মনেরও। এ ছাড়া তার যে সমস্যা, সেটা মানসিক নাও হতে পারে। গোটা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিন। ডাক্তারের কাছে যান, ভালো হবে।’
মুখটা অন্ধকার করেই ডাক্তারের রুম থেকে বের হয়ে এল দেলোয়ার। পিছু পিছু এল সাহিদাও। তার কিছু বলার নেই। কেননা এই পৃথিবীতে তাকে বোঝার মতো কোনো লোক নেই। বাবা ছিল, তাও গত বছর মারা গেছে। দু’একজন ছেলেবেলার বান্ধবী, কে কোথায় জানা নেই। চার দেয়ালে বাধা তার জীবন। খুব বেশি কিছু তাই চাওয়ার নেই। দেলোয়ার যেটুকু করছে, তাতেই সে খুশি। তবে এই মুহূর্তে দেলোয়ারের জন্য খুব খারাপ লাগছে। সে কিছু বলতে পারছে না। চোখ গড়িয়ে দুই এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। বোবা কান্না।

তিন.
ডাক্তারের মুখোমুখি বসে আছে দেলোয়ার আর সাহিদা। কামরুল হাসানকে একেবারেই চিন্তিত মনে হচ্ছে না। বরং ঘটনাটিকে খুবই সামান্য বলে মনে করছেন তিনি। অথচ বিষয়টাকে অনেক বড় করে ভাবা হচ্ছে। এতে করে সাহিদা ঘাবড়ে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পথে। মনের বাঘে মেয়েটাকে খেয়ে ফেলছে। এটাই তার মতামত। এই মতামত কিছুক্ষণ আগেই দেলোয়ার-সাহিদা দম্পতিকে জানিয়ে দিয়েছেন ডাক্তার। কিন্তু তাতে অবশ্য দুজনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজেদের ভাবনায় কোনো পরিবর্তনও দেখা গেল না। দূর হলো না মনের গভীরে জমে থাকা মেঘ। দেলোয়ার ভাবছে তার স্ত্রী ‘পাগল’ হয়ে গেছে। সাহিদা ভাবছে, ‘এ জীবন রেখে কী হবে’। চরম বিষণ্নতায় পেয়ে বসেছে দুজনকে।
ডাক্তার কামরুল হাসান বললেন, ‘কফি খাবেন আপনারা?’
দুজনেই মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয়, ‘না’।
-‘এতটা ঘাবড়ে গেছেন কেন? তার সমস্যা খুবই সামান্য। কিন্তু বোঝার ভুলে এটা অসামান্য হয়ে গেছে।’
দেলোয়ার অবশ্য এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। সাহিদা নির্বিকার।
-একে সাধারণত লোকে বলে ‘বোবায় ধরা’। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় এই সমস্যাটিকে বলা হয়, স্লিপ প্যারালাইসিস বা ঘুমের মধ্যে পক্ষাঘাত। কিছু সময়ের জন্য কথা বলা বা নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলা। বুঝতে পারছেন?
দেলোয়ার কিছু বলল না। সাহিদার দিকে তাকাল। তবে মনে হলো এবার কিছুটা বুঝতে পারছে। তার মনের ভেতরে একটু একটু শক্তি ফিরে আসছে। আর যাই হোক, স্ত্রী তাহলে ‘পাগল’ না। এক ধরনের অদ্ভুত গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় সে ডাক্তারের সামনে ঝুঁকে এল। ‘স্যার, তাহলে সমস্যাটা মানসিক নয়।’
-‘শুনুন, এক ধরনের কুসংস্কার রয়েছে, এমনকি অনেকে বিশ্বাস করেন তাদের ভূতে ঠেসে ধরে রাখে। মোটেও তা নয়। ভূতের তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, একেবারে মানুষের শোয়ার ঘরে ঢুকে হামলা চালাবে!’
দেলোয়ার-সাহিদা খাবে না বললেও একজন লোক এসে তিন কাপ কফি টেবিলে রাখল। ডাক্তার হাসান বললেন, ‘ঘটনা জটিল কিছু নয়, কফি নিন।’
দুজনে কফির কাপ হাতে তুলে নিল। মৃদু হেসে ডাক্তার হাসানও কফির কাপ হাতে নিয়ে চুমুক বসালেন তাতে। বললেন, ‘এটি আসলে ঘুম এবং জাগরণের মাঝামাঝি একটি স্নায়ুজনিত সমস্যা। ঘুমের এই পর্যায়টিকে বলা হয় র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট বা র‍্যাম। এটি ঘুমের এমন একটি পর্যায় যখন মস্তিষ্ক খুব অ্যাকটিভ থাকে। এই পর্যায়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু শরীরের আর কোনো পেশি কাজ করে না। তখন মস্তিষ্ক সচল থাকলেও, কখনো কখনো শরীরকে অসাড় মনে হয়। আর এই সময়ে কেউ যদি ভয়ের স্বপ্ন দেখে, পুরো বিষয়টি ভৌতিক মনে হয়। বোঝা গেছে বিষয়টা?’
-‘কিন্তু ডাক্তার সাহেব এটি সাহিদার বেলায় প্রায়ই কেন ঘটছে। যে বোবায় ধরার কথা বললেন, সেটার কথা আমিও শুনেছি। কিন্তু এত ঘন ঘন কেন ঘটবে? আপনি নিশ্চিত বিষয়টা তাই?’ -দেলোয়ারের কণ্ঠে উদ্বেগ।
ডাক্তার বললেন, ‘যেকোনো বয়সেই এই স্লিপ প্যারালাইসিস হতে পারে। ইয়াংদের ক্ষেত্রে বেশি হয়। এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। মানুষের যতটুকু ঘুম দরকার, সেটা না হলে এমন হয়। কখনো দেখবেন ছেড়ে ছেড়ে ঘুম হয়। কেউ যদি অসময়ে ঘুমায়, সেটাও কিন্তু ভালো না। অনেকে ড্রাগ নেয়। তাদের ক্ষেত্রেও হতে পারে। পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে এটি হতে পারে।’
দেলোয়ারের মুখ থেকে দুঃখ ভাব কিছুটা যেন কমল। তবে স্ত্রীর অসুস্থতা নিয়ে ভাবনা গেল না। ‘ডাক্তার সাহেব, এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় কী তাহলে?’
-‘দেখুন রাতে অন্তত ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। ঘুম যেন গভীর হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিদিন রাতে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ভালো। ওঠার অভ্যাসটাও সেভাবে করতে হবে। ঘুমের সময় ঘরকে আরামদায়ক করার চেষ্টা করতে হবে।’ -ডাক্তার হাসান সাহিদার দিকে তাকিয়ে এসব কথা বললেন। জানতে চাইলেন, ‘বিষয়টা কি বুঝতে পারছেন?’
সাহিদা ছোট্ট করে উত্তর দেয়, ‘বুঝতে চেষ্টা করছি।’
-‘আপনার কি এখনো ভয় করছে?’
-‘হ্যাঁ করছে।’
-‘ভয়ের কোনো কারণ নেই। আপনি কেবল মন দিয়ে শুনুন কী করতে হবে। এরপরও যদি দেখেন সমস্যাটি এখনো যায়নি, তাহলে আবার আসবেন।’
এবার ডাক্তারের কথায় কোনো জবাব দেয় না সাহিদা। তবে দেলোয়ার জানতে চায়, ‘ঘুমটা ভালো করার জন্য কী করতে হবে?’
ডাক্তার হাসান জবাব দেন, ‘দেখুন ঘুমের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ওষুধ তো দেওয়াই যায়। সেটা কিন্তু কোনো সমাধান নয়।’
-‘আপনি কী কোনো পরামর্শ দিতে পারেন’-আবার জানতে চায় দেলোয়ার।
ডাক্তার বললেন, ‘ঘরে যেন খুব বেশি আলো কিংবা ঘুটঘুটে অন্ধকার না থাকে। কোলাহল মুক্ত হতে হবে। তাপমাত্রাও থাকতে হবে সহনীয়। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভারী খাবার, চা কফি খাওয়া যাবে না।’
দেলোয়ার মাথা নাড়ে। সাহিদার ভয় এতে কিছুতেই কমে না। কেননা সে বুঝতে পারে না তার সমস্যাটা এতটাই সহজ কিনা। আস্তে করে জানতে চায়, এরপরও যদি সমস্যাটা থেকে যায়, তাহলে?
-‘তাহলে কোনো স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে। আমার মনে হচ্ছে না এটি মানসিক। এরপরও তেমন কিছু দেখলে, সেটা নিয়েও কাজ করা যাবে। ভাববেন না।’
দেলোয়ার আর সাহিদা উঠে দাঁড়ায়। নিজেদের মধ্যে তাকায়। কোনো কথা বলে না। সাহিদার চোখে মুখে অদ্ভুত এক রহস্যময়তা তখন ভর করল। তার তাকানোর ভঙ্গিতে ভিন্ন কিছু একটা দেখল দেলোয়ার। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। কিছু বলতে পারল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন বেরিয়ে গেল ডাক্তারের চেম্বার থেকে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0