বেত শিল্প ও শীতল পাটি

বিজ্ঞাপন
default-image

‘আসুক আসুক মেয়ের জামাই
কিছু চিন্তা নাইরে
আমার দরজায় বিছাই থইছি
কামরাঙা পাটি নারে;
পল্লিকবি জসিম উদ্দিন তাঁর নকশি কাঁথার মাঠ কাব্যগ্রন্থে কামরাঙা নামক শীতল পাটির বর্ণনা এভাবেই দিয়েছেন। আগের দিনে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন কাঁথা বা তোশকের ওপর মিহি বেতের নকশি করা এক ধরনের পাটি ব্যবহার হতো, তাতে গা-টা এলিয়ে দিলে শরীর বা মনে শীতল পরশ অনুভূত হতো। তাই বোধ হয় নাম দেওয়া হয়েছিল শীতল পাটি। শীতল পরশের পাশাপাশি বর্ণিল নকশা সবাইকে মুগ্ধ করে। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠে বর্ণিল ফুল, ফল, পশু–পাখি প্রিয়জনের অবয়ব এমনকি জ্যামিতিক গাণিতিক নকশাও। শীতল পাটির নকশায় জায়নামাজে ব্যবহৃত হয়েছে মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এ শীতল পাটিকে ঘিরে যুগে যুগে কত গান, কত কাব্য রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
প্রাচীনকাল থেকে সিলেটের বেত শিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ শিল্পীদের কারুকার্য খচিত শীতল পাটি বিশ্বজুড়ে গৌরবের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে বাংলাদেশকে। শীতল পাটির পুরোনো ঐতিহ্যকে আজও ধারণ করে চলছে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার কিছু গোষ্ঠী। স্থানীয় ভাষায় এই গোষ্ঠীকে পাটিয়ারা নামে অভিহিত করা হয়। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায়ও ব্যাপক হারে পাটি শিল্প গড়ে উঠেছে। বংশ পরম্পরায় তারা এ আদি পেশাকে লালন করে আসছে। পুরোনো যুগ হতে শীতল পাটির ব্যবহার ছিল ব্যাপক। কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে কনে সাজানোর আনুষঙ্গিকের সঙ্গে বর পক্ষকে একটা পাটিও দিতে হতো। এই পাটিতে কনেকে বসিয়ে সাজানোর রেওয়াজ ছিল। আবার কনে পক্ষ যখন বরের বাড়িতে আসবাবপত্র পাঠাত, সঙ্গে একটা শীতল পাটিও দেওয়া হতো। ১৯২০ সালে প্রকাশিত ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ নামক গ্রন্থে শীতল পাটি সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে বলা হয়; অন্যান্য শিল্পের মধ্যে শীতল পাটি একটি বিখ্যাত শিল্প। মুর্তা নামক এক প্রকার উদ্ভিদ থেকে বেত্র দ্বারা ইহা প্রস্তুত হয়। ইহা শীতল মসৃণ ও আরামদায়ক বলিয়া সর্বত্র আদৃত।
সিলেট ছাড়া বাংলাদেশের কোথাও উৎকৃষ্ট পাটি প্রস্তুত হইতে পারে না। প্রাচীন মোগল আমল থেকে সিলেটের পাটি আদৃত ছিল। পাটির গুণগত মান অনুযায়ী মূল্য নির্ধারিত হতো। ১০ আনা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি করা হতো। কখনওবা শীতল পাটি এক শ–দু শ টাকায় বিক্রি হতো বলে জানা যায়। কোথাও ২০-২৫ হাত লম্বা পাটি তৈরি হতো বলে জানা যায়। ১৮৭৬-৭৭ সালে সিলেট থেকে ৩ হাজার ৯২৭ টাকা মূল্যের পাটি বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে শীতল পাটি লন্ডনপ্রবাসী সিলেটীদের আনুকূল্যে বিলাস দ্রব্যসামগ্রী রূপে রপ্তানি পণ্য হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হয়। যে উদ্ভিদ থেকে শীতল পাটি তৈরি করা হয়, তার স্থানীয় নাম ‘মুর্তা’। স্থানভেদে একে মুসতাক; পাটি বেত; ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়। মুর্তা গাছ দেখতে চিকন বাঁশের মতো ঝোপ আকারে জন্মে।
মুর্তা গৃহস্থ বাড়ির স্যাঁতসেঁতে আঙিনায় অযত্নে অবহেলায় বেড়ে উঠে। পরবর্তীতে ব্যাপক আকারে বাণিজ্যিকভাবে মুর্তার চাষ হয়। পাটিকরেরা মুর্তা কেটে পানিতে দু-তিন দিন ভিজিয়ে রাখে। তারপর অতি যত্নে মুর্তার ছাল থেকে বেত তৈরি করেন। বেত যত সরু ও মসৃণ হবে, পাটি তত নরম ও মসৃণ হবে। বেত তৈরির পর একেকটি বিড়ার আকারে বাঁধাই হয়। পরে পছন্দসই রং ব্যবহার করে রঙিন নকশি পাটি তৈরি করা হয়। পাটির আবার প্রকারভেদ আছে। বড় বেতি দিয়ে যে পাটি বানানো হয়, স্থানীয় ভাষায় তা চাটি বা চাটাই নামে পরিচিত। সব আচার অনুষ্ঠানে বা লোক সমাগমে এই চাটিতে বসার ব্যবস্থা হয়। এ পাটি শিল্প সিলেট ছাড়াও বরিশাল, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে দেখা যায়। কিন্তু গুনে মানে সিলেটের শীতল পাটি অসাধারণ।
জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেসকো বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের শীতল পাটি বুননের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বের দরবারে সম্মান সূচক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। ইউনেসকোর ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অধিবেশনে বাংলাদেশ থেকে ৮ জন কুটির শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাতে সিলেটের দুজন পাটিয়ার অংশ নেন। তারা হচ্ছেন হিতেস চন্দ্র ও হরেন্দ্র কুমার দাস।
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বাউল গান, জামদানি বয়ন শিল্পকে ইউনেসকোর ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন