(সপ্তম পর্ব)

ডেইলি টেলিগ্রাফ ৩০ মার্চ দুইটি প্রতিবেদন ছাপে, একটির মূল বিষয় তাদের নিজস্ব সংবাদদাতা, ‘সাইন ড্রিংয়ের’ সম্পর্কে, যিনি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ছাদে লুকিয়ে থেকে সেনাবাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় থেকে যান এবং পরে ঢাকা শহরে ঘুরে প্রতিবেদন সংগ্রহ করেন। তার সম্পর্কিত সংবাদটির শিরোনাম ছিল,‘টেলিগ্রাফ প্রতিবেদকের জাল থেকে পলায়ন’ [Telegraph reporter slips net]
সংবাদটিতে বলা হয়—পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে টেলিগ্রাফ সংবাদদাতা ২৭ বছর বয়সী সাইমন ড্রিং ৬ মার্চ ঢাকায় যান। ২৬ মার্চ সেনাবাহিনী যখন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তল্লাশি চালাচ্ছিল, তখন তিনি হোটেলের ছাদে লুকিয়ে থাকেন, তার সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ফটোগ্রাফার মাইকেল লরেন্টও পালিয়ে থাকতে সমর্থ হন। পরে তারা ঢাকা শহর ঘুরে সরাসরি প্রতিবেদন সংগ্রহ করেন। এটিই ছিল কোন বিদেশি সাংবাদিকের স্বচক্ষে দেখা প্রতিবেদন। ৪৮ ঘণ্টা পর সপ্তাহান্তে তিনি ঢাকা ত্যাগ করে ব্যাংককে যান এবং সেখান থেকে ডেইলি টেলিগ্রাফে যুদ্ধ, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের ভয়াবহ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
২৯ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফে তাদের সংবাদদাতা সাইমন ড্রিংয়ের ব্যাংকক থেকে পাঠান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ট্যাংক বিদ্রোহীদের পিষে দিল, ৭০০০ বধ; বাড়ি ভস্মীভূত’ [Tank crush revolt in Pakistan, 7000 slaughtered; Homes burned]
সাইমন ড্রিংয়ের নিজ চোখে দেখা অভিজ্ঞতার বিশাল এই প্রতিবেদনটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার নানা কাহিনিতে পরিপূর্ণ ছিল। প্রতিবেদনের প্রথম অংশটি বোল্ড ফন্টে ছাপান হয়, সংক্ষেপ এটি হলো—
‘দেবতা ও পাকিস্তানের সংহতি’র নামে, আজ ঢাকা পরিণত হলো পিষে দেওয়া এক ভয়ার্ত শহরে। পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম ও ঠান্ডা-মাথায় ছোড়া কামানের গোলা ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, বিশাল এলাকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের নির্মমভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
দেশের সামরিক সরকারের প্রধান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সবকিছু স্বাভাবিক আছে দাবি করলেও হাজার হাজার লোক শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। শহরের রাস্তাগুলো একেবারেই জনশূন্য এবং দেশের অন্যান্য স্থানে হত্যাকাণ্ড অব্যাহত আছে। কোন সন্দেহ নেই, সেনাবাহিনী ট্যাংকের সহায়তায় সব বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত প্রতিরোধ খুবই সামান্য ও অকার্যকর। তারপরও কোন প্ররোচনা ছাড়াই মানুষকে গুলি করা হচ্ছে এবং দালানগুলোকে নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী পূর্বাঞ্চলের সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে নিয়ন্ত্রণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই মুহূর্তে কী পরিমাণ নিরীহ মানুষ প্রাণ দিয়েছে তা বলা যাবে না, তবে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ধারণা করা হচ্ছে কমপক্ষে ১৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। যত ছাত্রকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে, যত মানুষকে বাজারে তাদের দোকানে হত্যা করা হয়েছে, মহিলা ও শিশুকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, রায়ের বাজার এলাকায় যত হিন্দুদের ঘর থেকে বের করে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে—এসব সেনাবাহিনীর তাণ্ডবের কিছুটা নমুনা মাত্র। এখন সারা শহরে ওড়ানো হয়েছে পাকিস্তানের পতাকা।
সেনাবাহিনীর কোন ক্ষতি হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি, তবে দুজন সৈন্য আহত ও একজন কর্মকর্তার নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এক্ষণের জন্য বাঙালি বিদ্রোহ থেমে গেছে বলে মনে হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে বলে জানা যায়। আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারাও গ্রেপ্তার হয়েছে। দুটি পত্রিকা যারা শেখ মুজিবকে সমর্থন করেছিল, তাদের অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতে আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল ছাত্ররা। ধারনা করা হচ্ছে, তিন ব্যাটালিয়ন সৈন্যকে এই কাজে ব্যবহার করা হয়। একটি আরমার, একটি আর্টিলারি ও একটি ইনফ্যান্ট্রি। রাত দশটার কিছু আগে তারা ব্যারাক থেকে বের হয়। ১১টার মধ্যে সেনাবাহিনী গুলি শুরু করে। যারা রাস্তায় গাছ, কংক্রিটের পাইপ, আসবাবপত্র, গাড়ি উল্টিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করেছিল, সেনাবাহিনীর প্রথম আঘাতটি তাদের ওপরই আসে। শেখ মুজিবকে টেলিফোনে কিছু একটা হচ্ছে বলে সাবধান করা হয়। কিন্তু তিনি তার বাড়ি ছেড়ে যেতে অস্বীকার করে বলেন, ‘যদি আমি পালিয়ে যাই, তবে তারা আমাকে পাওয়ার জন্য সারা ঢাকা শহর জ্বালিয়ে দেবে।’ তিনি তার এক সহকারীকে বলেন, যিনি গ্রেপ্তার এড়াতে পেরেছিলেন।

২০০ ছাত্রকে হত্যা
কোনভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ছাত্রদের একজন বলেছে, যদিও আগেই ছাত্রদের সতর্ক করা হয়েছিল, তবুও ছাত্ররা ভেবেছিল তাদের হয়তো গ্রেপ্তার করা হবে।
আমেরিকার সরবরাহ করা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত এম ২৪ ট্যাংক নিয়ে মধ্যরাতের কিছু পরে সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চালায়। তারা ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির দখল নেয় এবং এখান থেকে নিকটবর্তী ছাত্রাবাসে গোলা ছোড়ার জন্য এটিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। হঠাৎ আক্রমণে ইকবাল হলে আটকে-পড়া প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হয়। সেনারা কক্ষে কক্ষে ঢুকে মেশিনগান দিয়ে গুলি চালায়। দুই দিন পরও লাশগুলো সেখানে পড়ে ছিল। কিছু লাশ বাইরে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে ছিল, কিছু লাশ পুকুরে ভাসছিল। একজন চিত্রকর ছাত্রকে ইজেলসহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তারা সাতজন শিক্ষককে হত্যা করে। একটি কোয়াটারে ১২ জন ছিল, সবাইকে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করে।
সেনারা কিছু লাশ সরিয়ে নিলেও প্রায় ৩০টির মতো রক্তাক্ত লাশ ইকবাল হলের করিডরে পড়ে ছিল। আরেকটি হলে হত্যাকাণ্ডের শিকার ছাত্রদের মৃতদেহগুলো তাড়াহুড়া করে সেনারা গণকবরে মাটি চাপা দেয় এবং তার ওপর দিয়ে ট্যাংক চালিয়ে তা সমান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়। রেললাইনের পাশে কমপক্ষে ২০০টি কুড়ে ঘরে আগুন দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে একটি বাজারে ঘুমন্ত মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়, দুইদিন পরও লাশগুলো চাদরে ঢাকা অবস্থায় পড়ে ছিল। একই এলাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে কামানের গোলা ছোড়া হয়, একটি মসজিদ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরে আক্রমণ
যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চলছিল, তখন একদল সৈন্য রাজারবাগে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের সদর দপ্তরে আক্রমণ চালায় যা ছিল শহরের অন্য প্রান্তে। প্রথমে ট্যাংক থেকে গোলা ছোঁড়া হয়, তারপর ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যদের ওপর নির্বিচারে গুলি ছোঁড়া হয়। কতজন মারা গিয়েছিল, ব্যারাকের অপর দিকে যারা থাকত তারাও বলতে পারেনি। ধারণা করা হচ্ছে, ১ হাজার ১০০ পুলিশ যারা সেখানে থাকত, তাদের অল্পসংখ্যকই পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
একই সময় কিছু সৈন্য শেখ মুজিবের বাড়ি ঘেরাও করে। ১টার কিছু আগে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যেকোনো মুহূর্তে তিনি আক্রমণের আশঙ্কা করছেন। একজন প্রতিবেশী বলেন, রাত প্রায় ১টা ১০ মিনিটে একটি ট্যাংক, কয়েকটি ট্রাক ও জিপে সেনারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে তাঁর বসার দিকে যায়। একজন ইংরেজিতে চেঁচিয়ে শেখ মুজিবকে বেরিয়ে আসতে বলে। শেখ মুজিব উত্তর দেন ‘হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত, গুলি ছোড়ার দরকার নেই’। সেনা কর্মকর্তাটি তখন বাসার বাগানে ঢুকে বলে, ‘আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো’। তাঁর তিনজন ভৃত্য, একজন সহকারীসহ একজন দেহরক্ষীকে নির্মমভাবে পেটান হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয়।
রাত ২টা, তখনো শহরজুড়ে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের অদূরে ‘পিপল’ নামের পত্রিকার অফিসে আক্রমণ চালিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সকালের কিছু আগে গোলাগুলি থেমে আসে, রাস্তাঘাট একেবারে জনশূন্য হয়ে যায়, মাঝে মাঝে সেনাবোঝাই গাড়ি ছুটে চলেছে, মাঝে মাঝে কাকের ডাকের শব্দ আসছিল। আরও খারাপ পরিস্থিতি আসার তখনো বাকি ছিল। মাঝ দুপুরে কোনোরকম সতর্কীকরণ ছাড়াই সৈন্যরা পুরোনো ঢাকা ঘেরাও করে। ১১ ঘণ্টা ধরে তারা সেখানে অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড চালায়। ইংলিশ রোড, ফ্রেঞ্চ রোড, নয়াবাজার—কত কত অর্থ ছাড়া নাম, মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো। এই এলাকায় শেখ মুজিবের জোরালো সমর্থন ছিল।
সেনাদের আরেকটি বড় লক্ষ্য ছিল জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকা ইত্তেফাকের অফিস। আক্রমণ শুরু হলে প্রায় ৪০০ লোক এই পত্রিকা অফিসে আশ্রয় নেয়। ২৬ মার্চ বিকেল ৪টার দিকে ৪টি ট্যাংক পত্রিকা অফিসের সামনে আসে। সাড়ে চারটার দিকে অফিস ভবনটি অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়।
শনিবার সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। ম্যাজিকের মতো রাস্তায় মানুষ নেমে আসে, পায়ে হেঁটে, রিকশায়, গাড়িতে মানুষ দলে দলে শহর ছাড়তে থাকে।

[সংশোধনী: অসাবধানতাবশত ষষ্ঠ পর্বে বলা হয়েছিল, ঢাকা থেকে বহিষ্কৃত ৩৫ সাংবাদিকদের একজন ছিলেন ডেইলি টেলিগ্রাফের সংবাদদাতা সাইমন ড্রিং। প্রকৃত পক্ষে তিনি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পালাতে সক্ষম হন এবং ঢাকায় অবস্থান করেন। নিজ চোখে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা দেখে ৪৮ ঘণ্টা পর নিজ উদ্যোগে ঢাকা ত্যাগ করেন।]

লেখক: কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরি হলিস শাখার ম্যানেজার
ইমেইল: [email protected]
(চলবে)

বিজ্ঞাপন
উত্তর আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন