default-image

ডিসেম্বর মাস আমাদের গৌরবের মাস। বিজয়ের মাস। বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে এই মাসটি, এই দিনটিকে স্মরণ করে। স্মরণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। একটি পতাকার জন্য, একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য যে অকুতোভয় বীররা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছিল এ বিজয়।

বিজয়ের চেতনা নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। স্বদেশে এবং বিদেশে প্রত্যেক বাঙালি মাসটিকে পালন করেন ভিন্ন ব্যঞ্জনায়। থাকে আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি। এ আনন্দ বিজয়ের, এ বেদনা দেশমাতৃকার জন্য স্বজন হারানোর!

১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার লেখক, সাংবাদিক এবং সুধীজনের আলাপ সংলাপে ছিল বিজয় দিবসের জয়গান। ছিল স্বজন হারানোর স্মৃতিচারণা।

আড্ডার শুরুতে উপস্থিত সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানান প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী। বাংলাদেশের পতাকা এবং বিজয়ের লাল-সবুজের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হলিডে সিজনের লাল-সবুজ রং যেন মিলেমিশে একাকার হয়েছিল উত্তর আমেরিকার মিলনায়তনে। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত আ্যাম্পায়ারস্টেট বিল্ডিংয়ের চূড়াটিও ডিসেম্বর মাসজুড়েই এই লাল-সবুজ আলোতে বর্ণিল হয়ে ওঠে। নগরী উদ্ভাসিত হয় উজ্জ্বল নয়নাভিরাম আলোতে। তাই ডিসেম্বর মাসটি উত্তর আমেরিকাজুড়েই নগরবাসীর জন্য যেন অভূতপূর্ব এক আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে। আনন্দটি সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

দেশের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসীদের মধ্যেও বাঙালি নারীরা আজ এগিয়ে যাচ্ছেন। স্বদেশকেও তাঁরা আলোকিত করছেন। নিউইয়র্কের এমন এক প্রবাসী নারী শায়লা আজিম। রিয়েল এস্টেট পেশায় দাপুটে নারী ব্যবসায়ী হিসেবেই নয়, প্রবাসী এই নগরজীবনের নিত্যদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোলাহলের চমৎকার পান্থজন শায়লা আজিম জানালেন নিজের কথা। নানা বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার কথা।

এ সপ্তাহের আড্ডার বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন রিয়েল স্টেট ব্যক্তিত্ব শায়লা আজীম। তিনি তাঁর বক্তব্যে নিজের জীবন, জীবিকা ও সমাজসেবার নানাদিক তুলে ধরেন। বিদেশের মাটিতে তাঁর জীবনসংগ্রাম, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার দুরূহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন উপস্থিত সুধীজনের সঙ্গে। জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে, তিনটি সন্তানকে বুকে আগলে ধরে কীভাবে পথ চলেছেন, তার একটি উজ্জ্বল এবং অনুকরণীয় চিত্র যেন ফুটে ওঠে তাঁর সাবলীল বর্ণনায়।

একজন অটিস্টিক শিশুর মা শায়লা আজীমের মুখে আমরা জানতে পারি ‘অটিজম সচেতনতা’র প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। বহুদিন আগে দেশ ছেড়ে এলেও শায়লা বাংলাদেশকে ভোলেননি। তাই নিভৃত পল্লির গরিব দেশবাসীর জন্য তাঁর মন কাঁদে। তিনি তাঁর যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই নিয়েই দাঁড়ান তাঁদের পাশে গিয়ে। যৌতুকের অভাবে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিলেন না, এমন অনেক মা-বাবার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। এভাবেই বেশ কয়েকজন মেয়ের বিয়ের খরচ বহন করেছেন শায়লা। পরে শায়লা আজীমের সৌজন্যে আর্লি ডিনারে যোগ দেন সমবেত লেখক সাংবাদিক এবং সুধীজন। ডিনার শেষে বিজয়ের আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সবুজের আদলে তৈরি কেক কেটে সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয়।

আড্ডা আলোচনার ফাঁকেই প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার এগিয়ে চলার কিছু কর্মসূচির কথা জানা গেল। আমেরিকায় স্বদেশি তরুণদের সংযোগ আর অগ্রযাত্রা নিয়ে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার নতুন সংযোজন নিয়ে কথা বলেন ইব্রাহীম চৌধুরী। প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার তরুণ শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত করে বেরোচ্ছে বিশেষ পাতা ‘উত্তরের পথে’। এ উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী সভা অনুষ্ঠিত হবে আগামী বৃহস্পতিবার। জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ প্লাজায় উত্তরের পথের উদ্বোধনী সভায় সন্ধ্যা ছয়টায় উপস্থিত হওয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন উত্তরের পাতার আয়োজক রাজুব ভৌমিক।

‘উত্তরের নকশার’ দুই বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৫ জানুয়ারি রোববার। বিকেল সাড়ে চারটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত জ্যাকসন হাইটসের জুইশ সেন্টারে। প্রথম আলো পরিবারের সবাইকে ৬০ দশকের সাজে সেজে আসার আহ্বান জানিয়েছেন উত্তরের নকশার পক্ষ থেকে মনিজা রহমান। সেদিন নারীদের জন্য থাকবে ষাটের দশকের তারকা নারীদের মতো সাজগোজের প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি ৬৫ বছরের বেশি বয়সের নারী-পুরুষের ফেসবুক ব্যবহার প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় ব্যবহারকারীরা সঠিক ইমো দিতে পারেন কি না, তা দেখা হবে। সব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য আকর্ষণীয় সব পুরস্কার থাকছে বলে জানানো হয়েছে।

২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে উত্তর আমেরিকা প্রথম আলোতে সংযোজিত হতে যাচ্ছে আরও একটি বিশেষ পাতা। ‘এক ঝুড়ি অণুগল্প’ নামে লেখক শেলী জামান খানের সম্পাদনায় এই বিশেষ পাতাটি সজ্জিত হবে বলে জানালেন আবাসিক সম্পাদক। নানা স্বাদের ছোট ছোট গল্পের সমাহার থাকবে এই পাতায়।

সূচনা বক্তব্যের পরে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে বিজয় দিবসকে স্মরণ করা হয়। স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানো হয় দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা, আহত ও শহীদ বীরদের প্রতি। বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত বিশ্বাস। তাঁর আলোচনা জুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতি। স্বজন, পরিচিতজন ও প্রিয়জন হারানোর আর্তি। কথা বলতে গিয়ে আজও এত বছর পরও তাঁর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওঠে। সজল হয় চোখ। প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান আলোচনা করেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে। এসব আলোচনায় আনন্দের মাঝেও উপস্থিত সবার মন বেদনাবিধুর হয়ে ওঠে। এ ছাড়াও কথা বলেন গেরিলাযোদ্ধা ফেরদৌস নাজমী, আইনজীবী ও কবি মুহাম্মদ বাবুল আলী, মানবাধিকার সংগঠক শহিদুল ইসলাম তালুকদারসহ আরও অনেকে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, শামীম জামান খান, মাকসুদা আহমেদ, মনিজা রহমান, সীমু আফরোজা, রোকেয়া দীপা, মাহবুবুর রহমান, রহমান মাহবুব, রূপা খানম, রওশন হাসান, ইশতিয়াক রূপু, নীরু এস নীরা, হেলিম আহমেদ, সাব্রি সাবেরীন, রওশন হক, সানজিদা উর্মী, মুহাম্মদ আলী বাবুল, সালেম সুলেরী, শায়লা আজীম, সুব্রত বিশ্বাস, বিপ্রেশ রায়, তোফায়েল চৌধুরী, মণীষা দত্ত তৃষা, রাজিয়া নাজমী, ফেরদৌস নাজমী, ড. বিলকিস দোলা, তাহরীনা পারভীন প্রীতি, রিমি রুম্মন প্রমুখ, রেশমা চৌধুরী, মনজুরুল হক, সানজীদা ঊর্মি, পাপী মনা প্রমুখ।

বিজয়ের এই আয়োজন শেষ হয় আরেকটি সুখবর পেয়ে। উত্তর আমেরিকার বাঙালিদের প্রিয়মুখ, গুণী মানুষ বিলকিস রহমানের মেধাবী কন্যা আবিবা ইমাম দ্যুতির হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রেস্টিজিয়াস একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাওয়ার খবরটি উপস্থিত সবাইকে আনন্দিত ও আবেগাপ্লুত করে তোলে।

দেশ এগিয়ে যাবে, আমরা এগিয়ে যাব, আমাদের সন্তানদের হাত ধরে আলোর পথে এগিয়ে যাবে বাঙালি—এমন আশাবাদ বারবার উচ্চারিত হয় প্রথম আলোর আড্ডা, আলাপ সংলাপ অনুষ্ঠানে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0