প্রবাস জীবন অদ্ভুত, অন্যরকম। দূর থেকে এই জীবনকে বর্ণিল আর দুর্দান্ত চনমনে মনে হয়। কথাটির বাস্তবতা প্রবাসীরা বোঝেন। জীবনের স্বাভাবিক গন্তব্য, কর্মসূচি, স্বপ্ন আর গতিধারা দেশের মতোই, কিন্তু এখানে আছে নানা রকমের ছদ্মবেশ। আমরা সাধারণত প্রবাসীদের দেখতে পাই ফেসবুকের ছবিতে। তারা অদ্ভুত সুন্দর প্রকৃতি, কর্মচঞ্চল অ্যাভিনিউ যেখানে অনেক সাদা চামড়ার মানুষ শোভাবর্ধন করে বিচরণ করছে, অথবা বিদেশি কারও কাঁধে হাত রেখে ছবি তোলেন। সেগুলো দেশের চশমায় অত্যন্ত মনোহর।
আমেরিকায় ১০ বছর ধরে অবস্থান করছেন, বুক ভরা দেশের মায়া আর ভালোবাসা নিয়ে প্রবাসে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন সজল। তিনি বললেন, আমরা যখন মোবাইলে সেলফি তুলি বা ফেসবুকের জন্য ছবি তুলি তখন ব্যাকগ্রাউন্ডটা চিন্তা করি। বিদেশ বিদেশ ভাব, সুখ সুখ মুখভঙ্গি যেন ছবিতে থাকে সেটিও রাখতে চাই। কারণ, বিদেশে আমাদের মুখে স্বাভাবিক হাসি থাকে না। এখানে আমাদের কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে থাকে। আমরা বলি, বিদেশি সংস্কৃতি রপ্ত করার কারণেই এমনটি হচ্ছে অথবা শান্তিপ্রিয় উন্নত সমাজের শিষ্টাচারই এমন। আসলে বাঙালির নিজস্ব এক শক্তি আছে অন্তরজুড়ে। যে শক্তি বলে তারা হাঁক ছেড়ে একজনকে ডাকে, মুখে জোরে কথা বলে মনের জট খোলে। এই সমাজে সেটি নেই। এখানে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম কাঠামোর ভেতর মানুষকে বড় হতে বলা হয়। দেশের প্রচলিত নিয়ম আর আইন কাউকে উত্তেজিত হতে দিতে চায় না। যথাসম্ভব একটি ভদ্রতার লেবাসে জীবনকে আটকে রাখতে হয়। আমেরিকান সমাজের একজন ভদ্রলোক এত কঠিন, বাঁকা ও অভদ্র আচরণ করতে পারে, তা অনেক সময় স্বপ্নেও ভাবা যাবে না। এই আচরণের কারণ তারা প্রচলিত নিয়ম আর আইনকেই তাদের জীবন কাঠামোর রক্ষাকবচ ভাবে, তাই মানবিক বোধটুকুকে কখনো ডুবিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। তাই এখানে বিশ্বাস যেমন আছে, হামেশাই অবিশ্বাসও আছে।
যেমন আমেরিকায় অধিকাংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ক্রেতা যখন টাকা পরিশোধ করেন, তখন তা একটু পরীক্ষা করে দেখা হয়। কারণ, হরহামেশাই এখানে জাল টাকার শিকার হয় মানুষ। সেদিন আমার চোখের সামনে এক ভদ্রলোক এক দোকানদারকে এক শ ডলারের চারটি নোট দিলেন, তার মধ্যে একটি নোট জাল। ততক্ষণে ক্রেতা ভদ্রলোক চলে গেছেন। এসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মতোই হতাশ হওয়া ছাড়া তেমন কোনো উপায় নেই। তবে আমাদের দেশে আইন আর নিয়মের বাইরেও কিছু প্রতিষেধক মানুষের হাতে থাকার কারণে ছোটখাটো সংকট মানুষ নিজে নিজেই মোকাবিলা করে। হয় চিৎকার করে, না হয় লাঠি শাসিয়ে, না হয় মল্লযুদ্ধ বাঁধিয়ে। এগুলো বাঙালির নিজস্বতা। খুব বেশি ভদ্র্রতার লেবাসে থেকে সবকিছু খোয়ানোর চেয়ে অনেক সময় বাধ্য হতে হয় নিজের প্রতিবাদী, সাহসী কিংবা কুকুরকে মুগুর মারার মানসিকতা ধারণ করতে।
যা হোক, মার্কিন মুল্লুকে এসে বাঙালিদের দু-একজন অতি ধুরন্ধর, কৌশলী, সুযোগ সন্ধানীও হয়ে ওঠেন। কারণ এখানে সেই সুযোগটি আছে। কেউ কারও নিজস্ব জগতের ভেতর ঢুকতে চান না। তবে ‍যারা ধুরন্ধরের কঠিন কৌশলের শিকার হন বা কুপোকাত হন তারা হয় স্বভাব বশে, না হয় বাধ্য হয়েই এগুলো নিয়ে ময়নাতদন্তে নামেন। সেদিন এক প্রবাসী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। তিনি এ দেশে এসেছেন বছর দশেক আগে। বছর ছয়েক ট্যাক্সি চালিয়েছেন। তারপর একাধিক বাড়ি কিনেছেন, সেসব বাড়ি ভাড়া দিয়ে, দু-একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে বেশ চলছেন। কিন্তু তিনি এক বাঙালির হাতে ‘ধরা খেয়েছেন’। হয়তো ক্ষতির শিকার হওয়ার কারণেই পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিতে দিতে লোকটি কিছুটা অন্যরকম হয়ে গেছেন। তার বাড়িতে ভাড়া উঠেছিল চার সদস্যের একটি পরিবার। স্বামী–স্ত্রী আর দুই সন্তান। এই ভাড়াটে ভদ্র্রলোকও নিউইয়র্ক শহরে হলুদ ট্যাক্সি চালান। প্রথম মাসে বলেছেন, ভাই ভাড়ার টাকাটা দিতে একটু দেরি হচ্ছে। বাড়িওলা মনে করেছেন, এটি স্বাভাবিক একটি সংকট। দেরি হতেই পারে। কিন্তু দুই মাসেও যখন ভাড়া দিলেন না, তখন তিনি কয়েক দিন ঘুরে ঘুরে ভাড়াটের মুখোমুখি হলেন। ভাড়াটে নরম সুরে বললেন, ভাই আমি মহা ঝামেলায় পড়েছি, আমাকে একটু সময় দিন। এভাবে ছয় মাস কেটে যাওয়ার পর, বাড়িওলা একদিন তার বাসায় গিয়ে শোর চিৎকার করে বাড়ি ছাড়ার কথা জানিয়ে দিলেন। জবাবে লোকটি বললেন, ‘বাড়ি ছাড়ব না, যা পারেন তাই করেন’।
বাংলাদেশে এই বাক্যটি খুব বেশি অচেনা নয়, অনেক বাড়িওলাই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। আমার প্রয়াত সহকর্মী শহিদুল্লাহ টিটনের চট্টগ্রামের পৈতৃক সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা ভবনের ফ্ল্যাটে একজন ভাড়াটে টানা দেড়–দুই বছর এই একই কৌশলে অবস্থান করেছে। সে ভাড়াও দেবে না, বাসাও ছাড়বে না। থানা-পুলিশ করেও কোনো কাজ হয়নি। দেখা যায়, পুলিশ ওই ভাড়াটের পক্ষেই কাজ করে। এ ক্ষেত্রে বাড়িওলাদের পক্ষে তেমন কোনো আইন বা কড়াকড়ি কোনো প্রতিষেধক নেই। কিন্তু আমেরিকায় তা নয়, এখানে আইনের কাছে দ্বারস্থ হলে ঠিকঠাক সেবা পাওয়া যায়। বাড়িওলা ভদ্রলোক নিজে কিছুই না করতে পেরে প্রথম গেছেন সিটি দপ্তরে। সেখান থেকে ভাড়াটে বরাবর নোটিশ দিয়েছেন। তাতেও ভাড়াটে ভ্রুক্ষেপ করেনি। অবশেষে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। কোর্ট বাড়িওলা ও ভাড়াটে দুজনকেই ডেকে মুখোমুখি করে আদেশ দিয়েছেন, ২০ দিনের মধ্যে আদালতের মাধ্যমে ভাড়ার টাকা দিয়ে বাড়ি ছাড়তে হবে, তা না হলে তার জেল জরিমানা সবই হবে। লোকটির কাছ থেকে আদালত তাৎক্ষণিক কিছু টাকা আদায় করেও বাড়িওলাকে দিয়েছেন। ভাড়াটে ওই রাতেই সপরিবারে উধাও।
এরপর ওই বাড়িওলা কয়েক মাস ভাড়াটের কোনো পাত্তা পাননি। একরাতে রাস্তায় হলুদ ট্যাক্সিতে তার দেখা মিলেছিল। লোকটি পুরোনো বাড়িওলাকে দেখে, ট্যাক্সি টান দিয়ে পালিয়ে গেছে। বাড়িওলা তার ট্যাক্সির নম্বরটি নিয়ে টিসিএল অফিসে গিয়ে লোকটির বর্তমান বাসারও খোঁজ পেয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে লোকটি আরেকজন ভুক্তভোগী বাঙালির সন্ধান পান। তিনি বলেন, লোকটি তার বাসায় উঠেছে, প্রথম দুই মাস ভাড়া দিলেও এখন চার মাসের ভাড়া বাকি। লোকটি নানা অজুহাতে ভাড়া না দিয়ে দিব্যি সময় পার করে দিচ্ছেন। সিটি কাউন্সিল, কোর্ট—সবাইকে নাকাল করে ছেড়েছেন। শেষমেশ ওই ধুরন্ধর লোকটি নিয়েছেন এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। তিনি সিটি মেয়র থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের দপ্তর পর্যন্ত চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠির কপিও উদ্ধার করেছেন ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী বাড়িওলা।
চিঠিতে লোকটি লিখেছে, ‘আমি মুসলিম, তাই আমাদের কেউ বাসায় রাখতে চায় না। আমি স্ত্রী–সন্তান নিয়ে এই আমেরিকায় বড় অসহায়।’ চিঠিতে তার অনেক বিপদ–আপদের কথাও লিখেছেন। জানিয়েছেন, তাকে একের পর এক বাড়ি থেকে উৎখাতের কারণে, তার সমূহ ক্ষতি হয়েছে। যাই হোক, বিচারপ্রার্থী লোকটি এখন ধুরন্ধর ভাড়াটে দেশি ভাইয়ের এই বিবরণ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময়ে ব্যয় করেন। আমরা কয়েকজন তার কথা শোনার কিছু পর লোকটি বেরিয়ে বাঙালিদের আরেকটি আসরে দাঁড়ালেন, সেখানেও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি বললেন। কেউ কেউ বললেন, প্রবাসে এসেও বাঙালির অভিযোগ দায়েরের মানসিকতা যায়নি। লোকটি চাইলেই পুরোনো ভাড়াটের এসব বিষয়গুলো বাদ দিয়ে প্রতিদিন দু-এক ঘণ্টা বেশি কাজ করলে আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারতেন। অনেকেই ক্ষমা করতে জানেন না। প্রতিশোধ, পরচর্চার ভেতরে সময় কাটাতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দেশ ছেড়ে এলেও দেশের ভূত তারা এভাবে লালন করেন। দেশে যেমন কিছু ধুরন্ধর মানুষ নানা কৌশল, মিথ্যাচার আর অজুহাতে একের পর এক অন্যায় করে বেড়ায়—এ দেশে এসেও তাদের অনেকেই ওই কৌশল ভুলতে পারে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0