ফিলিস্তিন এখন এক রক্তাক্ত প্রান্তর। ওপর থেকে পড়ছে বোমা, চারদিক থেকে আসছে গোলা, আকাশে ১৬০টি জঙ্গি বিমান হামলায় নেমেছে আর স্থলপথে ট্যাংক, কামান, আর্টিলারি ও গানবোট থেকে হচ্ছে হামলা। ইসরায়েলের নিক্ষিপ্ত গোলা ও বোমায় প্রতিদিন ফিলিস্তিনের রাতের আকাশ জ্বলে উঠছে।
আল-আকসা মসজিদে শবে-কদরের নামাজ পড়তে জড়ো হয়েছিলেন ফিলিস্তিনিরা, এ সময় হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এর প্রতিবাদে জুমাতুল বিদার নামাজে শরিক হন হাজারো ফিলিস্তিন মুসলিম। গত ১৪ মে থেকে ১৮ মে পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ২১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ শিশু ও ৩৬ জন নারী রয়েছেন। ঈদের দিনও ইসরায়েলি হামলা থেকে রেহাই পায়নি ফিলিস্তিনিরা। গাজা উপত্যকায় আটটি শরণার্থীশিবিরের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম শিবিরের নাম শাচি। এখানে ৮৫ হাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থীর বাস। এ শিবিরে হামলা চালিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। ইসরায়েল এ পর্যন্ত ৮০০ ফিলিস্তিনি স্থাপনায় হামলা করেছে। ইতিমধ্যে ১৫ হাজার ফিলিস্তিনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
ইসরায়েল তার অবৈধ বসতি বিস্তার এক মুহূর্তের জন্যও থামায়নি। ইসরায়েল তার সীমান্ত এদিকে নীল নদ, ওদিকে উজান নদী, আরেক দিকে ফোরাত নদী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মহা পরিকল্পনাও কখনো লুকায়নি। ইরাক, মিসর, সৌদি আরব, জর্ডান ও সিরীয় ভূ-খণ্ড দখল করে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করাই তাদের নিরুপায় পরিকল্পনা। নিরুপায়, কারণ আরব রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙে না ফেললে ইসরায়েল কখনো নিরাপদ হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনকে আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এ নিয়ে মুসলিম নেতারা চুপ থেকেছেন। এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাজায় বর্বর ইসরায়েলি হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে তিনি চিঠিও লিখেছেন এবং তাঁদের সংগ্রামে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
আজ যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বরতা চলছে তখন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো প্রকৃতপক্ষে নীরব। তাদের মধ্যে ইরান ও তুরস্ক এই বর্বরতার প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা আরব দেশ নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর অস্ট্রিয়া সফর বাতিল করেছেন কারণ অস্ট্রিয়ার সরকারি ভবনে ইসরায়েলি পতাকা তোলা হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তো ইসরায়েলকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিপীড়নে তুরস্ক চুপ থাকবে না বলে হুমকি দিয়েছেন। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম দেশ তুরস্ক।
ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ তাঁর কবিতায় লিখেছেন—
‘বিষণ্ন আমার দেশ আবার ফিরে আসবে।
উদিত হবে নতুন সকাল।’
দাবির তাতোর লিখেছেন—
‘প্রতিরোধ করো আমার জনগণ
ওদের প্রতিরোধ করো।’
মুক্ত ফিলিস্তিন পৃথিবীর বুকে একদিন দাঁড়াবেই, যার রাজধানী হবে জেরুজালেম। ফিলিস্তিনের ঐতিহ্য বহু পুরোনো। এই ফিলিস্তিনেই রয়েছে মুসলিমদের পবিত্র মসজিদ ‘আল আকসা’। জেরুজালেম মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের পবিত্র ভূমি।
২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে জল, স্থল ও আকাশ পথে ত্রিমুখী হামলা চালিয়ে ইসরায়েল গাজার ১৪ লাখ ফিলিস্তিনিকে অবরুদ্ধ করে যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, সেই হত্যাযজ্ঞে এবারের মতোই পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী নীরব সমর্থন জানিয়েছে। এক সময়ের ফিলিস্তিন জনগণের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক দেন দরবার হলেও সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই জায়গাতে আটকে আছে। এ ছাড়া এই কর্মকাণ্ডের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ‘নাভি পিল্লাই’ এক সময়ে প্রচণ্ড ক্ষোভের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন, ধনী দেশগুলো চায় না বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে শান্তি আসুক, সেখানকার মানুষদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হোক, আর সে কারণেই পৃথিবীতে যুদ্ধ বন্ধ হচ্ছে না।
দীর্ঘ সময় ধরেই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অনেক বর্বরতা চালানো হয়েছে। হামাসকে নির্মূলের কথা বলে ২০১৪ সালেও হামলা চালানো হয়েছিল। সে সময় প্রায় আড়াই হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করা যায়নি, হামাসকেও নির্মূল করা যায়নি। এতে, শুধু হিংসাই বাড়ছে। সারা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষের মতো আমরাও আশা করি, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের অবসান হওয়া প্রয়োজন।
এ জন্য আরব শাসকদের সঙ্গে নয় বরং আরব জনগণের সঙ্গে ফিলিস্তিনের সুদৃঢ় ঐক্য এবং সম্মিলিত প্রতিরোধই তাদের জয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে। জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।